
রাত দূপুরে হাসপাতল গুড়িয়ে দেয়া, মাঝ রাতে কোন অফিসে উঠে ভাঙ্গচুর করা, তদন্তের নামে চুড়ান্ত প্রার্থীদের বাদ দিয়ে দেয়া, ফুটপাতে দাড়িয়ে থাকা মানুষকে গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যা করা, কোনটাই আইনসিদ্ধ হয়। তাই সাধারণ মানুষ যদি প্রশ্নতুলে আজ আইনের শাসন কোথায়? তা হলে তাদেরকে দোষ দেয়া যাবে না বৈ কি!
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আইনের শাসন কোনো নতুন শব্দ নয়। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরেই গণতন্ত্র, আইনের শাসন, জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকারের কথা বলে এসেছে।
বিএনপির ২০২৬ সালের নির্বাচনী ঘোষণাতেও আইনের শাসন, জবাবদিহি ও দুর্নীতি দমনকে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। তারেক রহমান নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না এবং দুর্নীতির ক্ষেত্রে পরিচয় বিবেচনা না করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই শব্দগুলোকি শুধুই কাগজে কলমে সুন্দর না কি বাস্তবতা কিছু আছে তাই এখন দেখার বিষয়। গত ৪ দিনের বাংলাদেশের দিকে তাকালে একটি প্রশ্ন তো করাই যায়, চার দিকে এতো বিশৃঙ্খলা কেনো? এখানে কি আইন-কানুন বলে কিছু নেই? না কি সবাই আইনের উর্দ্ধে?
রাজধানীর মিরপুরে দেশের একটি পরিচিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার রাতের আঁধারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দুই শতাধিক মানুষ সেখানে প্রবেশ করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির স্থাপনা ভাঙচুর করেছে, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য সামগ্রী লুট করেছে এবং পরে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে স্থাপনার অংশবিশেষ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সরকারি টিকা ও স্বাস্থ্যসামগ্রীও লুট হওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে; আদালত তাদের কারাগারে পাঠিয়েছেন।
আরও উদ্বেগের বিষয়, পুলিশের বিরুদ্ধেও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। শাহ আলী থানার ওসি স্বীকার করেছেন যে হামলার সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। কেন হামলা থামানো হলো না কিংবা ঘটনাস্থল থেকেই কেন কাউকে আটক করা হয়নি—তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা এখনো স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্তও শুরু হয়েছে।
তাহলে প্রশ্নটা খুবই সরল—আইনের শাসন কোথায়?
জমি নিয়ে বিরোধ থাকতে পারে। মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের দাবি থাকতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে জমি ব্যবহার করছে কি না, সেটিও আদালত কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু কোনো জমি নিয়ে বিরোধ থাকলেই কি রাতের আঁধারে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলার অধিকার কেউ পেয়ে যায়?
উত্তর নিশ্চয়ই ‘হ্যাঁ’ হতে পারে না।
কারণ রাষ্ট্রে আইন থাকার অর্থই হলো—বিরোধের নিষ্পত্তি আইন অনুযায়ী হবে। শক্তিশালী পক্ষ নিজের শক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবে না। অর্থ, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা পেশিশক্তি কোনো নাগরিকের অধিকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তির অধিকারের বিকল্প হতে পারে না।
মিরপুরের ঘটনা তাই কেবল একটি ভবন ভাঙার ঘটনা নয়। এটি একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—আইনের জায়গা কি ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে প্রভাবশালী মানুষের শক্তি?
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। বিএনপি প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে। এখন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব পরীক্ষা।
কারণ বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় আইনের শাসনের কথা বলা সহজ। ক্ষমতায় থাকার সময় সেই একই নীতি নিজের দলের লোকজন, সমর্থক, প্রশাসন এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রয়োগ করা—সেটিই আসল পরীক্ষা।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম কারিগর খালেদা জিয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বিএনপির ভাষ্যে, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে তার নেতৃত্ব দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ে ঘেরা। তিনি রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের অবস্থান থেকে সরে যাননি। যে দলের রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্লোগান ছিল গণতন্ত্র ও আইনের শাসন, সেই দল রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বাস্তবে রাষ্ট্রের আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা কার্যকর রাখতে পারছে? এই প্রশ্নটি এখন বিএনপির জন্যও প্রাসঙ্গিক।
মিরপুরের ঘটনা একা নয়। গত কয়েক দিনে রাজধানীতে আরও কয়েকটি ঘটনা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার দীর্ঘদিন ধরে মিরপুর এলাকায় মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ১৯৭৬ সাল থেকে সরকারি চুক্তির মাধ্যমে সেখানে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
অন্যদিকে জমিটির মালিকানা নিয়ে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর পক্ষ থেকেও দাবি রয়েছে। অর্থাৎ এখানে একটি সম্পত্তি বিরোধ রয়েছে—যার নিষ্পত্তির আইনগত পথও রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, সেই আইনি পথের পরিবর্তে কয়েকশ মানুষ গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ভাঙচুর করেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যদি জমিটি অন্য কারও হয়ও, তবে সেই জমিতে থাকা একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙার অনুমতি তাদের কে দিল?
মিরপুরের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীর ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা সামনে এসেছে।
সালমানের অভিযোগ ছিল, চাঁদা না দেওয়ার কারণে হামলা হয়েছে। তবে পুলিশ পরে বলেছে, স্টুডিওটি মূল লক্ষ্য ছিল না এবং ঘটনাটির পেছনে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে; চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে—এমন দাবিও পুলিশ নাকচ করেছে। তিনজনকে আটক করা হয়েছে। অর্থাৎ এই ঘটনার প্রকৃত কারণও এখনো তদন্তাধীন।
এখানেও প্রশ্ন একই— একটি সম্পত্তি বা ব্যবসায়িক বিরোধ থাকলে তার সমাধান কি ভাঙচুরের মাধ্যমে হবে? যদি কোনো পক্ষের অভিযোগ থাকে, মামলা করার সুযোগ আছে। আদালতে যাওয়ার সুযোগ আছে। প্রশাসনের কাছে যাওয়ার সুযোগ আছে। তাহলে কেন পেশিশক্তি?
আরেকটি ঘটনা আরও গভীর সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন সামনে এনেছে। ২২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোমেটিক জোনের একটি ফুটপাতে বিশ্রাম নেওয়া নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসানকে একটি দ্রুতগতির প্রাইভেট কার চাপা দেয়। পরে হাসপাতালে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ঘটনায় ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে আদালতে হাজির করা হয় এবং আদালত তাকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এরপর অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবী আলমগীর হোসাইন জানান, নিহতের পরিবারের সঙ্গে ৯ লাখ টাকার সমঝোতা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকেও সমঝোতার কথা নিশ্চিত করা হলেও তারা অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করেনি। তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেছেন, এই সমঝোতা তদন্তকে প্রভাবিত করবে না।
এখানেও প্রশ্ন আছে। একজন নির্মাণশ্রমিকের জীবন কি কেবল একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সমাধানযোগ্য? আইনের দৃষ্টিতে বিষয়টি অবশ্যই তার চেয়ে জটিল। কারণ ব্যক্তিগত সমঝোতা থাকলেও ফৌজদারি দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না—ঘটনার প্রকৃতি, প্রযোজ্য আইন এবং আদালতের সিদ্ধান্তই এখানে নির্ধারক।
কিন্তু সামাজিক বাস্তবতার প্রশ্নটি থেকেই যায়— আইনের কাছে একজন শ্রমিকের জীবন এবং একজন ক্ষমতাবান পরিবারের সন্তানের দায় কি একইভাবে বিবেচিত হবে? এই প্রশ্নের উত্তর কেবল আদালতের রায়েই নয়, রাষ্ট্রের আচরণেও দৃশ্যমান হওয়া দরকার।
আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তখনই, যখন অভিযুক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী প্রভাবশালী। একজন সাধারণ মানুষ অপরাধ করলে তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একই আইন যদি প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক কর্মী, অর্থবান ব্যবসায়ী কিংবা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষের ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন নাগরিকের মনে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়।
রাষ্ট্রের শক্তি পুলিশের হাতে থাকা অস্ত্রে নয়। রাষ্ট্রের শক্তি আদালতের ভবনে নয়। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি হলো—আইন সবার জন্য সমান। যে ব্যক্তি দুর্বল, তার জন্যও আইন আছে। যে ব্যক্তি ক্ষমতাবান, তার বিরুদ্ধেও আইন আছে। যে ব্যক্তি সরকারের সমর্থক, তার বিরুদ্ধেও আইন আছে। যে ব্যক্তি বিরোধী দলের, তার ক্ষেত্রেও একই আইন। এই সমতার জায়গাটিই যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সংবিধানে আইনের শাসন লেখা থাকলেও বাস্তব জীবনে তার অর্থ থাকে না।
মিরপুরের ঘটনায় সবচেয়ে বিব্রতকর প্রশ্নটি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। দুই শতাধিক মানুষ একটি প্রতিষ্ঠানে ঢুকেছে—অভিযোগ অনুযায়ী নিরাপত্তারক্ষীদের জিম্মি করেছে, চিকিৎসা সরঞ্জাম লুট করেছে এবং ভারী যন্ত্র দিয়ে স্থাপনা ভেঙেছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও কেন তা থামাতে পারেনি—এই প্রশ্নের উত্তর তদন্তে বেরিয়ে আসা জরুরি।
কারণ পুলিশ যদি কোনো অপরাধ ঘটার পর শুধু মামলা নেয়, আসামি গ্রেপ্তার করে এবং তদন্ত করে—তাহলে সেটি আইন প্রয়োগের একটি অংশ। কিন্তু অপরাধ যখন চোখের সামনে সংঘটিত হয়, তখন পুলিশ কী করেছে—সেটিও জবাবদিহির অংশ। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও অপরাধ ঠেকাতে না পারে, তাহলে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তার জন্য কার কাছে যাবে?
এরই মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়ার পরও প্রায় আড়াই হাজার প্রার্থী নিয়োগপত্র না পাওয়ায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রার্থীদের দাবি, পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন কারণে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, কোন তথ্যের ভিত্তিতে তার পুলিশ ভেরিফিকেশন নেতিবাচক হলো—তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা অনেকের কাছেই নেই। ‘কেন্দ্রীয় প্যানেল প্রাইমারি ২০২৫’ নামে প্রার্থীদের প্ল্যাটফর্মটি বাদ পড়া প্রত্যেকের নথি পুনর্যাচাই, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, প্রশাসনিক আপিল এবং পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দাবি করেছে। অন্যদিকে মন্ত্রণালয় বলছে, ভেরিফিকেশন সরকারি নিয়োগের নিয়মিত প্রক্রিয়া এবং ১ অক্টোবর পর্যন্ত কেউ নিয়োগপত্র না পেলে পরবর্তী সময়ে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পর্যায়ক্রমে নিয়োগ দেওয়া হবে।
প্রশ্নটি এখানেই— একজন নাগরিক যখন সব ধাপ অতিক্রম করে চূড়ান্তভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হন, তখন শেষ মুহূর্তে কোনো নেতিবাচক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাকে বাদ দিলে তার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকবে কি না? কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তা যাচাই হতে হবে, অনিয়ম থাকলে নিয়োগও হওয়া উচিত নয়। কিন্তু তথ্যগত ভুল, প্রশাসনিক ত্রুটি কিংবা অসম্পূর্ণ যাচাইয়ের কারণে একজন যোগ্য প্রার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায় কে নেবে? রাষ্ট্র যদি নাগরিকের কাছে জবাবদিহি চায়, তবে নাগরিকেরও রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের কারণ জানার অধিকার থাকতে হবে।
আইনের শাসন শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার নাম নয়; নির্দোষ নাগরিককে অন্যায়ভাবে শাস্তি না দেওয়াও আইনের শাসনেরই অংশ।
Author