
১৯৬টি দেশের মানুষকে যদি ১৮ বছর বয়সে, জাতীয় দলের হয়ে ক্যারিয়ারের শুরুতেই লিওনেল মেসির মতো একজন ফুটবলার উপহার হিসেবে দেওয়া হতো, তাহলে তারা কী করত?
সম্ভবত তারা তাঁকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসত ও সমর্থন করত। তাঁকে এবং তাঁর ফুটবলকে নিজেদের করে নিত। তাঁকে নিয়ে গর্ব করত। কিন্তু যে দেশটি সত্যিই এই ‘উপহার’ পেয়েছিল, সেই আর্জেন্টিনা কী করেছিল? তারা তাঁকে সমালোচনা করেছে, তুচ্ছ করেছে, প্রত্যাখ্যান করেছে, এমনকি দুয়োও দিয়েছে। বছরের পর বছর, বহু বছর ধরে। অবশ্যই সব আর্জেন্টাইন এমন ছিলেন না। তবে ফুটবল নিয়ে উন্মাদনার জন্য পরিচিত এই দেশের একটি বড় অংশই এমন আচরণ করেছিল।
শেষ পর্যন্ত একদিন সেই আর্জেন্টাইনরাই বুঝতে পেরেছিল—মেসির সঙ্গে এমন আচরণ করাটাই ছিল আসল উন্মাদনা।
আলফ্রেডো দি স্তেফানো ও দিয়েগো ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিদের জন্মভূমি হিসেবে যে দেশ গর্ব করে, তারা এমন একজন খেলোয়াড়কে আপন করে নিতে আশ্চর্যজনকভাবে দীর্ঘ সময় নিয়েছে, যাঁকে বহু বিশেষজ্ঞ ও ফুটবলপ্রেমী সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় বলে মনে করেন।
তবে যখন তারা তাঁকে ভালোবাসতে শুরু করল, তখন পরিস্থিতি যেন অন্য চরমে চলে গেল। কারণ আজকের আর্জেন্টিনায় মেসির সমালোচনা করেন—এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
মেসির সেই অনিশ্চয়তা ও প্রত্যাখ্যানের বছরগুলো আজ খুব কমই মনে পড়বে। মঙ্গলবার রাতে—যুক্তরাজ্যের সময় বুধবার ভোরে—বুয়েনস আয়ার্সের রিভার প্লেটের এস্তাদিও মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে জাতীয় দলের হয়ে ২০৮তম ম্যাচ খেলতে নেমে মেসি যখন চূড়ান্ত বিদায় জানালেন, তখন সেই পুরোনো দিনগুলো যেন বহু দূরের স্মৃতি। তবু গল্পটি মনে রাখা দরকার। কারণ এমন ঘটনা আবার কখনো ঘটবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
১৩ বছর বয়সে মেসি তাঁর জন্ম ও শৈশবের শহর রোসারিও ছেড়ে বার্সেলোনায় জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্নে ইউরোপে পাড়ি জমান। ২০০০ সালের সেই সেপ্টেম্বরের দিনে তাঁর সামনে কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। বার্সেলোনা তাঁকে দুহাত বাড়িয়ে গ্রহণ করার জন্য অপেক্ষা করছিল না। নিজের ফুটবল প্রতিভা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তাঁকে স্প্যানিশ ক্লাবটির কোচ ও কর্তাদের আস্থা অর্জন করতে হয়েছিল। আর এই যাত্রায় তাঁর সবচেয়ে বড় অবলম্বন ছিলেন তাঁর বাবা হোর্হে।
ইউরোপে মেসির প্রথম পদচারণার সময়ই আর্জেন্টিনা তার ইতিহাসের অন্যতম বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল—২০০১-০২ সালের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়। সেই সময়ের পর আর্জেন্টাইনদের জাতীয় গর্ব আরও দৃঢ় হয় এবং তারা তাদের ঐতিহাসিক নায়কদের আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। দিয়েগো ম্যারাডোনা নিঃসন্দেহে তাঁদের অন্যতম। আর বহু বছর ধরে সেটিই মেসির জন্য বড় এক সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
২০০৫ সালের আগস্টে তখনকার জুভেন্টাস কোচ ফাবিও কাপেলো বার্সেলোনার কোচ ফ্রাঙ্ক রাইকার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, তিনি এই প্রতিভাবান তরুণকে দলে নিতে চান। সেই প্রাক-মৌসুমে দুই দলের ম্যাচে ১৮ বছর বয়সী মেসির পারফরম্যান্স তাঁকে মুগ্ধ করেছিল।
বহু বছর পর আর্জেন্টিনার ক্রীড়া দৈনিক ওলে-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাপেলো স্মরণ করে বলেছিলেন, “আমি বুঝতে পেরেছিলাম, সে
ইতিমধ্যেই অসাধারণ একজন খেলোয়াড়।”
রাইকার্ড তাঁকে জানিয়ে দেন, সেটি সম্ভব নয়। বার্সেলোনা এবং গোটা ইউরোপীয় ফুটবল তখন দ্রুত এই কিশোরের প্রতিভার কাছে নতিস্বীকার করছে।
কিন্তু নিজের দেশেই? অনেকেই মুগ্ধ ছিলেন। আবার অনেকে ঠিক উল্টো কথা বলতেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল—মেসি ম্যারাডোনার ধারেকাছেও নেই; তিনি বড়জোর একজন মাঝারি মানের খেলোয়াড়। তাঁকে যদি দক্ষিণ আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ হিসেবে পরিচিত কোপা লিবার্তাদোরেসে খেলতে দেওয়া হতো, তাহলে সেখানকার শক্তিশালী ডিফেন্ডাররা তাঁকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলত। তাঁদের যুক্তি ছিল, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে মেসির জন্য কাজটা সহজ, কারণ ইউরোপে ডিফেন্ডাররা লিবার্তাদোরেসের মতো শারীরিকভাবে কঠোর বা নির্মম নয়।
মেসিকে দীর্ঘ সময় ধরে নিজের জীবনের এক অদ্ভুত ‘দুই শহরের গল্প’ বয়ে বেড়াতে হয়েছে—একজন ডিকেন্সীয় ফুটবলারের মতো।
নিজ দেশে তিনি যেমন প্রশংসা পেয়েছেন, তেমনি পেয়েছেন সমালোচনা, চাপ ও বিরূপতা। জাতীয় দলের হয়ে খেলাটা অনেক সময় তাঁর জন্য হয়ে উঠেছিল যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা। কারণ তিনি কখনো কোনো আর্জেন্টাইন ক্লাবের হয়ে খেলেননি; ফলে তাঁকে ঘিরে স্থানীয় কোনো সমর্থকগোষ্ঠীও তৈরি হয়নি, যারা তাঁকে দেবতার মতো পূজা করবে।
কিন্তু ইউরোপ ও বিশ্বের অন্য কোথাও এসবের কোনো গুরুত্ব ছিল না। সেখানে মেসির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ক্রমেই বাড়ছিল—এবং তা থামার কোনো লক্ষণ ছিল না।
একই মানুষের যেন দুটি আলাদা জীবন। দুটি মেসি।
“বিভিন্ন কারণে মেসি আর্জেন্টাইনদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছিলেন। অথচ তিনি আমার দেখা সবচেয়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড়,” দ্য অ্যাথলেটিক-কে বলেন তমাস আব্রাহাম।
রোমানিয়ায় জন্ম নেওয়া এই আর্জেন্টাইন লেখক ও দার্শনিকের বয়স এখন ৭৯। তিনি আজও নিজের জীবনযাপন ও দৈনন্দিন রুটিন সাজান চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচকে ঘিরে। তাঁর লেখা বইগুলোর একটি হলো দ্য ডিনাইড ম্যাসাকার, যেখানে তিনি বর্ণনা করেছেন কীভাবে তাঁর বাবা-মা অ্যাডলফ হিটলারের হাতে মৃত্যুর হাত থেকে পালিয়ে বেঁচেছিলেন।
আব্রাহাম অত্যন্ত সংস্কৃতিমনা মানুষ। কিন্তু ফুটবলের মতো আর কিছুই তাঁকে এতটা উত্তেজিত করে না, হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয় না। ফুটবল নিয়ে তিনি যেন জীবন্ত এক বিশ্বকোষ। মেসির ঘটনাটি তিনি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, বিষয়টির পেছনে শুধু ক্রীড়া নয়, রাজনৈতিক কারণও কাজ করেছিল।
“আর্জেন্টিনার অনেক পেরোনপন্থী মেসিকে কখনো পছন্দ করেননি। কারণ মেসি এই আন্দোলনের নেতাদের কখনো আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেননি। পেরোনবাদের বামঘেঁষা জনতাবাদী ধারা কির্শনারিজম ম্যারাডোনাকে নিজেদের প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছিল, কারণ ক্যাস্ত্রো ও শ্যাভেজের প্রতি ম্যারাডোনারও ছিল গভীর অনুরাগ।”
মেসি সবসময়ই রাজনৈতিক বক্তব্য এড়িয়ে চলেছেন। তবে তার অর্থ এই নয় যে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস ছিল না।
২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর বুয়েনস আয়ার্সে উদযাপনের সময় বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছিল। মেসি ও তাঁর সতীর্থরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তারা প্রেসিডেন্টের বাসভবন কাসা রোসাদায় যাবেন না। সেখানে পেরোনপন্থী প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফের্নান্দেস তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
বার্সেলোনায় কাটানো বছরগুলোতেও একই ধরনের ঘটনা দেখা গেছে। ক্লাব কর্তৃপক্ষ এবং কাতালোনিয়ার রাজনৈতিক শক্তিগুলো বহুবার অপেক্ষা করেছে—মেসি কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা ও স্পেন থেকে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেবেন। কিন্তু মেসি তা করেননি।
সংযত ও পরিমিত স্বভাবের কাতালানরা এই আর্জেন্টাইনকে পছন্দ করত—যিনি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কথা বলতেন না, ছোট ছোট বাক্যে কথা বলতেন এবং বিতর্কিত বিষয় থেকে দূরে থাকতেন।
কিন্তু তাঁর স্বদেশীরা, যারা মেসিকে সবসময় ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা করত, তাঁর এই নীরবতায় বিভ্রান্ত ও সন্দিহান হয়ে পড়ত।
একজন আর্জেন্টাইন এত কম কথা বলে? সেটাও কি সম্ভব?
ম্যারাডোনা পোপ, ফিদেল কাস্ত্রো কিংবা জর্জ ডব্লিউ বুশ—কাকে কী করতে হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট মত দিতেন। মেক্সিকো ’৮৬-এর সেই প্রতিভাবান তারকার সবার ও সবকিছু নিয়েই মত ছিল। তাহলে মেসির কি ফুটবলের বাইরের কোনো বিষয়ে কিছু বলার নেই?
অবশ্য প্রায় সবকিছুর মতো এখানেও একটি ব্যতিক্রম ছিল।
২০২৬ সালের মার্চে ইন্টার মায়ামির সতীর্থদের সঙ্গে মেসিকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক অর্থে তিনি ১৪ মাস দেরিতে সেখানে গেলেন—এবং জো বাইডেনের কাছ থেকে যে সম্মান তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, ট্রাম্পের কাছ থেকে তা গ্রহণ করলেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাইডেনের মেসিকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম দেওয়ার কথা ছিল। ওই অনুষ্ঠানে মেসির সঙ্গে হিলারি ক্লিনটন, ডেনজেল ওয়াশিংটন, আনা উইন্টুর, জেন গুডল ও আরভিন ‘ম্যাজিক’ জনসনের মতো ব্যক্তিদেরও সম্মান জানানোর কথা ছিল।
মেসি শুধু অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি তা নয়, তাঁর পক্ষ থেকে কাউকেও পাঠানো হয়নি।
ট্রাম্পের আমন্ত্রণের ক্ষেত্রে তাঁর আচরণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতে তাঁকে মনোযোগী ও হাস্যোজ্জ্বল দেখা যায়।
এটাই স্বাভাবিক ছিল—কারণ তিনি যে দেশে বসবাস ও কাজ করেন, সেই দেশের প্রেসিডেন্ট তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু বাইডেনের অনুষ্ঠান এড়িয়ে যাওয়ার কারণ কখনো ব্যাখ্যা করা হয়নি।
মেসির জনজীবনে এটি ছিল এক অদ্ভুত মুহূর্ত। এমন শিরোনাম তৈরি করা তাঁর স্বভাব নয়। কিন্তু এবার তিনি যেন সেই বিচক্ষণ ও সংযত মেসি ছিলেন না, যিনি এত দিন তাঁর স্বদেশীদের বিস্মিত করে এসেছেন। তিনি অবস্থান নিয়েছিলেন—ঠিক যেমনটা ম্যারাডোনা করতেন।
আর্জেন্টিনার টেলিভিশনের অন্যতম পরিচিত ফুটবল বিশ্লেষক এরিয়েল সেনোসিয়াইন দ্য অ্যাথলেটিক-কে বলেন, মেসির এই নীরবতা তাঁর জন্য সত্যিই সমস্যার কারণ হয়েছিল।
“আমার মনে হয়, আর্জেন্টিনার ফুটবল-নায়কদের ব্যক্তিত্ব ছিল মেসির চেয়ে অনেক বেশি ম্যারাডোনাসুলভ—এটাই তাঁকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। বছরের পর বছর যারা মেসিকে বুঝতে পারেনি, তারা শেষ পর্যন্ত বুঝেছে—প্রতিটি প্রতিভাবানের ব্যক্তিত্ব আলাদা।”
সেনোসিয়াইনের মতে, দেশের একটি অংশ মেসির সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছিল। তবে তাঁর ধারণা, এই অংশটি খুব বড় ছিল না।
“কিছু আর্জেন্টাইন ভুলভাবে মনে করতেন, মেসি দূরত্ব বজায় রাখেন, তিনি বিচ্ছিন্ন। অথচ সত্য হলো, কৈশোরের আগেই দেশ ছাড়লেও মেসি যতটা সম্ভব তাঁর আর্জেন্টাইন পরিচয় ধরে রেখেছেন।”
দিয়েগো ম্যারাডোনা ও মেসি—দুজনকেই বার্সেলোনায় যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কিংবদন্তি এজেন্ট জোসেপ মারিয়া মিনগেয়া বহু বছর আগে খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন কেন আর্জেন্টাইনদের মেসিকে বিদেশি মনে করার কোনো কারণ নেই।
“বিষয়টি হলো, মেসি আপনার সঙ্গে আর্জেন্টিনার স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে না—সে কথা বলে রোসারিওর উপভাষায়! সে রোসারিওকে সঙ্গে করে বার্সেলোনায় নিয়ে গিয়েছিল। মনে হয়, ভূমধ্যসাগরের তীরে নয়, সে যেন পারানা নদীর তীরেই বসবাস করছে।”
খেলাধুলার ব্যবসা ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক মার্সেলো গান্তমান বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে মেসির অগ্রযাত্রা কাছ থেকে অনুসরণ করেছেন। আর্জেন্টাইনদের একাংশের মেসিবিরোধিতার জন্য তাঁর একটি ব্যাখ্যা আছে।
“আমার মনে হয়, তখন মেসি জাতীয় দল নিয়ে সংবাদমাধ্যমের হতাশারও প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিলেন। আর্জেন্টিনা ১৯৯৩ থেকে ২০২১—২৮ বছর কোনো শিরোপা জিততে পারেনি। সাংবাদিকরা মেসির সমালোচনা করতেন, কারণ তিনি বার্সেলোনার মতো জাতীয় দলের হয়েও পারফর্ম করতে পারছিলেন না। কিন্তু তারা আসলে বিবেচনায় নিতেন না বার্সেলোনার সেই দলটি কীভাবে খেলত এবং কীভাবে দলটি গড়ে উঠেছিল।”
গান্তমান বলেন, “এমন একটা সময় ছিল যখন সাংবাদিকরা মনে করতেন, ফুটবল নিয়ে মানুষের অনুভূতির ব্যাখ্যা দেওয়ার অধিকার তাঁদেরই আছে। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আজকের মতো প্রভাব ছিল না। সংবাদমাধ্যম নিজেদের ফুটবল কাভারেজে সমর্থকদের কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করত।”
ম্যারাডোনার সঙ্গে আরেকটি তুলনাও মেসির বিপক্ষে কাজ করেছিল। এবার বিষয়টি ছিল পুরোপুরি ফুটবলীয়।
নাপোলির কিংবদন্তি ম্যারাডোনার খেলায় ছিল প্রতিভা ও যন্ত্রণার এক বিস্ফোরক মিশ্রণ—ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে তাঁর চিরন্তন লড়াই যেন ফুটবলের মধ্যেও প্রতিফলিত হতো। বিপরীতে মেসির কাছে সবকিছুই যেন খুব সহজে এসে যেত। তাঁর খেলা আর্জেন্টাইন রুচির কাছে অতিরিক্ত ঠান্ডা মনে হতো।
ছিল না ঘাম, রক্ত, নাটক কিংবা কষ্ট।
সবকিছু এত নিখুঁত, এত সহজ কীভাবে হতে পারে?
কিন্তু মেসি যা করেছিলেন, তা মোটেও সহজ ছিল না। তাঁর অসাধারণ প্রতিভা ছিল, ঠিক। কিন্তু সেই প্রতিভার পেছনে ছিল অসংখ্য ঘণ্টার পরিশ্রম, দলের সঙ্গে অগণিত অনুশীলন এবং একাকী অনুশীলনেরও অগণিত সময়—সবকিছুর লক্ষ্য ছিল পূর্ণতার আরও কাছাকাছি পৌঁছানো।
২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয় কি সেই মোড় ঘোরানো মুহূর্ত ছিল—যে মুহূর্তে সন্দেহ ও দূরত্বের জায়গা দখল করে নেয় ভালোবাসা ও ভক্তি?
আংশিকভাবে, হ্যাঁ। তবে মেসির সর্বজনীন নায়কে পরিণত হওয়ার শিকড় খুঁজতে হলে এর আগের কয়েকটি টুর্নামেন্ট এবং নিজের দেশে তাঁর পার করা কঠিন সময়গুলোর দিকেও তাকাতে হবে।
মেসিবিরোধী মনোভাব চূড়ায় পৌঁছেছিল ২০১১ সালের কোপা আমেরিকার কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিদায়ের পর। সেই টুর্নামেন্ট হয়েছিল আর্জেন্টিনাতেই। তাঁর নিজের প্রদেশ সান্তা ফেতে দর্শকরা তাঁকে বিদায় দিয়েছিল প্রচণ্ড দুয়োধ্বনির মাধ্যমে।
বার্সেলোনার হয়ে রিয়াল মাদ্রিদের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে খেলার সময় এর আগে মেসি এমন দুয়োধ্বনি শুনেছিলেন। কিন্তু নিজের দেশের মাঠে এমন অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন মাত্রার।
মেসি বরাবরের মতো তাঁর খেলার মাধ্যমেই জবাব দিয়েছেন—এমনকি যখন তিনি ব্যর্থ হয়েছেন, যেমন ২০১৪ বিশ্বকাপের জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালে, কিংবা ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিপক্ষে।
কখনো কখনো বোঝা কঠিন ছিল—মুরগি আগে, নাকি ডিম আগে।
জাতীয় দলের হয়ে মেসির পারফরম্যান্স কি চাপ এবং আর্জেন্টাইনদের একটি বড় অংশের শীতল আচরণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল?
নাকি মেসির প্রতি সেই অবিশ্বাস ও শীতলতার জন্ম হয়েছিল তাঁর হতাশ মুখ, লড়াইয়ের অভাব এবং পরিস্থিতির চাপে তাঁর বিপর্যস্ত হয়ে পড়া থেকে?
এর মধ্যে ২০০৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে মেসিকে খেলাতে না পারার ঘটনাও ছিল। কোচ হোসে পেকেরমান তাঁকে বেঞ্চে রেখেছিলেন। ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার অধীনেও মেসি ভালোভাবে ব্যবহৃত হননি। দুর্দান্ত এক প্রজন্মের আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া সেই দলটি কোচের সিদ্ধান্তে প্রায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
২০১৫ সালে আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক পরিবেশ বদলাতে শুরু করেছিল। কিন্তু জাতীয় দল তখনও সংকটে। অদ্ভুত ও বিতর্কিত কোচ হোর্হে সাম্পাওলির অধীনে দলটি তলানিতে গিয়ে ঠেকে। এরপর ২০১৮ সাল থেকে লিওনেল স্কালোনির অধীনে শুরু হয় পুনর্জাগরণ।
২০১৯ সালের কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালেই নতুন আশার জন্ম হয়। আর দুই বছর পর ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয় নতুন যুগের সূচনা করে।
এরপরও কি কেউ মেসিকে অস্বীকার করতে পারে?
অথবা তিনি আর্জেন্টাইন—এই সত্য উপভোগ করতে অস্বীকার করতে পারে?
এরপর আসে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা জয়, কাতার ২০২২ বিশ্বকাপ, ২০২৪ সালের আরেকটি কোপা আমেরিকা শিরোপা—এবং শেষ পর্যন্ত রোমাঞ্চকর ২০২৬ বিশ্বকাপ।
মাত্র পাঁচ বছরে মেসি আগের ১৫ বছরে তাঁর কাছ থেকে আটকে রাখা ভালোবাসার শতগুণ ভালোবাসা ফিরে পেলেন।
২০২২ সালের ২০ ডিসেম্বর বুয়েনস আয়ার্সের রাস্তায় পাঁচ থেকে ছয় মিলিয়ন মানুষ নেমে এসেছিল—দেশটির মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও বেশি। ফের্নান্দেস সরকারের অস্থিরতার মধ্যেও সেই উদযাপন ছিল নিখুঁত।
এটি ছিল মানুষের নিজেদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এক উদযাপন, যেখানে মেসি এবং আর্জেন্টাইন জনগণই ছিলেন প্রধান চরিত্র।
এরপর আর কিছুই তাঁদের আলাদা করতে পারেনি।
এটি আরও একবার প্রমাণিত হয় এ বছরের বিশ্বকাপের আগের দিনগুলোতে। সেখানে মেসির জীবনের যেন সব ধরনের অনুভূতি একসঙ্গে এসে মিলেছিল।
ফুটবল যে তীব্রতা ও উন্মাদনা তৈরি করতে পারে, তার সবটাই ছিল সেখানে। পাশাপাশি ছিল বাবার অসুস্থতা নিয়ে উদ্বেগ—যার প্রকৃত অবস্থা তাঁর পরিবার তাঁর কাছ থেকে গোপন রেখেছিল, যাতে বিশ্বকাপ চলাকালে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে না পড়েন।
জুন থেকে সেপ্টেম্বর—মাত্র তিন মাসে মেসির জীবনে ঘটে যায় একের পর এক ঘটনা। খেলাধুলা ও ব্যক্তিজীবন—দুই দিকেই যেন ঝড় বয়ে যায়।
একটি দুর্দান্ত বিশ্বকাপ, যেখানে তিনি ছিলেন সেরা খেলোয়াড়—যদিও ফিফা তাঁকে সেই পুরস্কার দেয়নি। এরপর স্পেনের কাছে ফাইনালে মর্মান্তিক পরাজয়। তারপর বাবার মৃত্যু। এবং সবশেষে জাতীয় দল থেকে বিদায়ের ঘোষণা।
এই আবেগঘন ঘটনাগুলোর সমষ্টি মেসির আরও মানবিক ও সহজে কাছে টেনে নেওয়া যায়—এমন একটি দিক প্রকাশ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর পোস্টগুলোয় ফুটে ওঠে হৃদয়ভাঙা আন্তরিকতা ও সরলতা। মনে হয়, তিনি যেন নিজের আত্মা ও হৃদয়টাকেই সবার সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।
লিওনেল মেসি: তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে নির্মম মাস ও হারানোর গল্প
৮ আগস্ট আর্জেন্টিনার টেলিভিশনের অন্যতম পরিচিত উপস্থাপক নেলসন কাস্ত্রো আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। পর্দায় দেখা যাচ্ছিল, মেসি রোসারিওর একটি কবরস্থানে পৌঁছেছেন। কয়েক ঘণ্টা আগেই তাঁর বাবা মারা গিয়েছিলেন। বাবাকে শেষ বিদায় জানাতে সেখানে গিয়েছিলেন মেসি।
“হোর্হে লিওনেলের মধ্যে কী অসাধারণ মূল্যবোধ গড়ে দিয়েছিলেন!”—বারবার বলছিলেন কাস্ত্রো।
আর কয়েক লাখ আর্জেন্টাইন তখন টেলিভিশনের পর্দা থেকে চোখ সরাতে পারছিলেন না। পর্দায় খুব বেশি কিছু দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু তাতে কিছুই যায়-আসেনি।
তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মেসির পাশে থাকা—দূর থেকে হলেও।
তাঁকে অনুভব করানো যে, তাঁকে নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো বিতর্ক নেই। এত দিন যা ঘটেছে, সবই ছিল একটি ভুল।
এবং তারা আর কখনো মেসির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে না।
Author