
বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র বলতে যা বোঝায়, ভারত যেন তা দ্রুত বর্জন করতে চলেছে। দেশটি এখন ফ্যাসিবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ভারতের নির্বাচন কমিশন বা ইসিআইয়ের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জ্ঞানেশ কুমার প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কমিশনের ভূমিকা এই আশঙ্কার প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।
আমরা যে সময়ে বাস করছি, তাতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর নির্ভীক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি নিঃসন্দেহে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের নানা অনিয়ম, কোটি কোটি বৈধ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র এবং নতুন তরুণ ভোটারদের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে বাধা দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের কারসাজি বা জালিয়াতি ঠেকাতে সংবিধানে এলাকাভিত্তিক ভোটার তালিকা সংরক্ষণের যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, কমিশন তা অমান্য করেছে। কেন্দ্রীয়ভাবে একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করে তারা ভোটার তালিকার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এসব ঘটনা মূলত একটি নির্দিষ্ট দিকের প্রতিই ইঙ্গিত করে।
গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার এই অপচেষ্টার পাশাপাশি গত এক দশকে আরও কিছু উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে। দ্য হিন্দু-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন জনমিতিক পরিবর্তন-সংক্রান্ত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি রাজ্যগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তারা রাজ্যগুলোর কাছে ধর্মভিত্তিক ভোটার নিবন্ধন, যানবাহন নিবন্ধন, জমি ক্রয়-বিক্রয়, স্কুলে ভর্তি এবং অন্যান্য তথ্য চেয়েছে।
মুক্ত, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্যই সংবিধানে নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সেই সম্মানিত প্রতিষ্ঠানটিকেই এখন ভারতে ফ্যাসিবাদী নকশা বাস্তবায়নের একটি যন্ত্রে রূপান্তর করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন সরকারের বিরোধীদের সমর্থন করেন—এমন ভোটারদের গণহারে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো বর্তমান সরকার এবং তাদের সাভারকরবাদী আদর্শকে স্থায়ী ভিত্তি দেওয়া। এই ভাবধারা গোলওয়ালকরের বহুল আলোচিত We or Our Nationhood Defined বইয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
বইটিতে ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের বিভিন্ন পদ্ধতির এমন নগ্ন প্রচার রয়েছে যে বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকেরা প্রকাশ্যে এর সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা স্বীকার করতে অস্বস্তি বোধ করেন। কারণ, এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁদের উপহাস ও সমালোচনার মুখে পড়তে হবে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনের ভেতরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইন পরিবর্তনের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই তাঁকে এই পদের জন্য বেছে নেন। নতুন নিয়মে তিন সদস্যের বাছাই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মনোনীত একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থাকবেন। ফলে সরকার সহজেই নিজেদের পছন্দের এমন একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বেছে নিতে পারে, যিনি সরকারের ইচ্ছানুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। এই ব্যবস্থায় কমিটির তৃতীয় সদস্য, অর্থাৎ বিরোধীদলীয় নেতা, প্রতিবাদ জানিয়ে বৈঠক ত্যাগ করা ছাড়া কার্যত আর কিছুই করতে পারেন না।
সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে বিজেপি সরকার এই বিতর্কিত আইন পাস করেছে। ২০২৩ সালের আগে এই কমিটিতে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতি। নতুন আইনে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে কমিটিকে কার্যত সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে।
গণতন্ত্র রক্ষা করতে হলে এই বিপজ্জনক আইন বাতিল করে একে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা প্রয়োজন। তবেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর ২৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্ঞানেশ কুমারের মেয়াদে নেওয়া বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোও রদ করা জরুরি। কারণ, অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার লিখিতভাবে এসব সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। ওই দুই কমিশনারের ফাইল নোট সামনে আসার পর সাধারণ মানুষ পুরো বিষয়টি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছেন এবং তাদের মধ্যে ক্ষোভও বাড়ছে।
বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী গত দুই বছর ধরে নির্বাচন কমিশনের অনিয়মের বিষয়গুলো সামনে আনার চেষ্টা করছেন। এখন সাধারণ জনগণের একটি অংশও নিজেদের প্রতারিত মনে করছে এবং প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। এই জনরোষের জবাবে সরকার কতটা দমন-পীড়নের পথে যায়, তা বিশ্বজুড়ে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার সমমর্যাদার কমিশনারদের মধ্যে প্রথম হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সব কমিশনারের ভোটের মূল্য সমান। কিন্তু বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার বাকি দুই কমিশনারকে কোণঠাসা করে রেখেছেন। তাঁর নেতৃত্বে কমিশনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে ১৩ কোটিরও বেশি ভারতীয় তাঁদের ভোটাধিকার হারিয়েছেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোট যত মানুষ ভোট দিয়েছিলেন, এই সংখ্যা তার প্রায় ২০ শতাংশ।
তবু স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর কার্যক্রম থেমে নেই। এখনো অনেক রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই কার্যক্রম বাকি রয়েছে। দিল্লির ৭০টি বিধানসভা কেন্দ্রের এক-তৃতীয়াংশেই গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে মোট প্রদত্ত ভোটের চেয়ে বেশি মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
সমগ্র দেশে এসআইআর চালুর এই উদ্যোগ ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন এবং ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তবু এই প্রক্রিয়ার ক্ষতিকর প্রভাব অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের ২৭ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি বেঞ্চ এই প্রক্রিয়াকে অনুমোদন দিয়েছিল। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন সেই বেঞ্চের সিদ্ধান্তও পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
বিশেষ পরিস্থিতিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণের মতো কাজে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় ভোটার তালিকা নিবিড়ভাবে সংশোধনের বিধান রয়েছে। সে ক্ষেত্রে কারণ লিখিতভাবে জানাতে হয়। কিন্তু সারা দেশের প্রতিটি রাজ্যে এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা পরিচালনা করা একটি অস্বাভাবিক পদক্ষেপ।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে বিপুলসংখ্যক ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত ট্রাইব্যুনাল তথাকথিত সন্দেহভাজন ৯১ শতাংশ কেস বাতিল করে সংশ্লিষ্ট ভোটারদের ছাড়পত্র দিয়েছিল। তা সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে সেখানে ১৬ লাখ ভোটারকে গণহারে বাদ দেওয়া হয়েছে। কারা আপত্তি তুলেছে, সে বিষয়টিও অজানা। এমন বিষাক্ত পরিবেশে এই কর্মকাণ্ডের পেছনে অন্যায় উদ্দেশ্যের গন্ধ পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
ভারতের রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থায় এসব ঘটনা কোনো সাধারণ আমলাতান্ত্রিক ব্যর্থতা বা দুর্নীতির ঘটনা নয়। নির্বাচন কমিশন ও বিচারব্যবস্থার কিছু পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ভারতে যা ঘটছে, তা ফ্যাসিবাদের সুস্পষ্ট সংকেত। আজ এই কঠিন সত্য এড়িয়ে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই—ভারত ইতিমধ্যেই ফ্যাসিবাদের আঁতুড়ঘরে প্রবেশ করেছে।
(আনন্দ কে. সহায়, প্রবীণ সাংবাদিক। দ্য ওয়্যার-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করা হলো পলিসি পেপারের পাঠকদের জন্য।)
Author