
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের উন্নয়নে যত কাজ করেছে, তার সবকিছুকে সফল বলা যাবে না। সরকারের ব্যর্থতা, ভুল কিংবা বিতর্ক নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের সমালোচনা হবেই। বিরোধী দল আন্দোলন করবে, রাজপথে কর্মসূচি দেবে, সংসদে সরকারের সমালোচনা করবে—এটাই স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া।
কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। সমস্যা হলো, সরকারের কাজের চেয়ে সরকারের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া ইস্যুগুলোই এখন জনআলোচনার বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে। ফলে সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিলেও সেগুলোর রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য মানুষের কাছে ঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
সরকার কাজ করছে—কিন্তু কাজের গল্পটি বলতে পারছে না। এটি কেবল সরকারের প্রচার-সংক্রান্ত দুর্বলতা নয়; এটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি বড় সংকটে পরিণত হচ্ছে।
৫৮ বছর পর দেশে দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার নির্মাণের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। ৩০ লাখ টন শোধন সক্ষমতার এই প্রকল্প দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে দেশের জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভরতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তার মতো সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেই জায়গায় নতুন একটি বড় শোধনাগার নির্মাণের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে জাতীয় পর্যায়ের
আলোচনার বিষয় হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেটি কতটা হয়েছে?
গত কয়েক দিনে মিডিয়ার বড় অংশের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল বিরোধী দলের লংমার্চ, সিফাতের বক্তব্য ও গালি, গ্রেপ্তার এবং নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর গাড়িকাণ্ড।
বিরোধী দল লংমার্চ করেছে—এটি খবর। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বা সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কটূক্তি করেছেন—এটিও খবর। কোনো রাজনৈতিক নেতা কোন গাড়ি ব্যবহার করেছেন—সেটিও একটি খবর হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একটি দেশের জাতীয় সংবাদ-আলোচনায় কোন খবর কতটা জায়গা পাবে, সেটিই কি শেষ পর্যন্ত আমাদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে?
যে দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ, সেখানে নতুন তেল শোধনাগার নির্মাণের মতো একটি উদ্যোগ যদি কয়েকটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিতর্কের আড়ালে হারিয়ে যায়, তাহলে শুধু সরকারের নয়, সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক সমাজেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।
আমাদের রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবীরা খবরের অন্তরালের খবর খোঁজেন, বিশ্লেষণ করেন। টেলিভিশন টকশোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার হাজার পোস্ট হয়।
কিন্তু সিফাত কী বলেছেন, গালি দেওয়া জায়েজ না নাজায়েজ—এই বিতর্ক যতটা জায়গা পায়, তেল শোধনাগারটি দেশের জ্বালানি অর্থনীতিতে কী পরিবর্তন আনতে পারে—সে আলোচনা ততটা দেখা যায় না।
নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর গাড়ি বিএনপির না আওয়ামী লীগের—এ নিয়ে তর্ক হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেটি নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না।
এখানেই আসল বিপদ। আমরা ইস্যুর রাজনৈতিক গুরুত্বের চেয়ে ইস্যুর বিনোদনমূল্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।
চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগের কথাও ধরা যাক। এটি শুধু একটি প্রতিরক্ষা ক্রয়ের খবর নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, চীন-ভারত প্রতিযোগিতা এবং বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। অথচ এমন একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যে ধরনের গভীর জাতীয় বিতর্ক হওয়ার কথা, তা খুব একটা দেখা যায় না।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ব্যাপক প্রবেশের বিষয়টিও একই রকম। এটি কেবল কয়েক লাখ শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার খবর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং লাখ লাখ পরিবারের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ।
কিন্তু সেই আলোচনার জায়গা দখল করে নিচ্ছে ব্যক্তি ও ঘটনা-কেন্দ্রিক রাজনীতি। ন্যারেটিভ যেন ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে।
যে আলোচনায় থাকার কথা ছিল তেল শোধনাগার, সেখানে আছে গাড়িকাণ্ড। যে আলোচনায় থাকার কথা ছিল প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, সেখানে আছে গালি। যে আলোচনায় থাকার কথা ছিল শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স, সেখানে আছে লংমার্চ।
এ দায় শুধু সংবাদমাধ্যমের নয়। সরকারেরও। কারণ আধুনিক রাজনীতিতে শুধু উন্নয়ন করলেই হয় না; উন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থও জনগণের সামনে তুলে ধরতে হয়। একটি প্রকল্প কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেটি মানুষের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তার দীর্ঘমেয়াদি সুফল কী—এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারকেই দিতে হয়।
সরকার যদি সেই ব্যাখ্যা না দেয়, অন্য কেউ এসে সেই জায়গা দখল করবে।
এখানে বর্তমান সরকারের একটি বড় দুর্বলতা স্পষ্ট হচ্ছে—ন্যারেটিভ তৈরির সক্ষমতার ঘাটতি।
আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার সুবাদে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক যোগাযোগ কাঠামো তৈরি করেছিল। জামায়াতও নিজেদের রাজনৈতিক বার্তা সংগঠিতভাবে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। তারা জানে কীভাবে একটি ঘটনা থেকে রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরি করতে হয়, কীভাবে নিজেদের অবস্থানকে মানুষের সামনে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করতে হয়।
বর্তমান সরকার সেই জায়গায় এখনো অনেক পিছিয়ে। সরকারের মন্ত্রীরা কথা বলছেন, কর্মকর্তারা কাজ করছেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কিন্তু এসব উদ্যোগকে একটি সমন্বিত রাজনৈতিক বার্তায় রূপান্তর করার মতো কার্যকর যোগাযোগ কৌশল চোখে পড়ছে না।
ফলে বিরোধীরা যে ইস্যু সামনে আনছে, সেটিই দিনের ন্যারেটিভ হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল, বুলিং, ব্যক্তি আক্রমণ এবং পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক বক্তব্য সংবাদ-আলোচনার বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে। আর সরকারের বাস্তব কাজগুলো ধীরে ধীরে সেই কোলাহলের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
তারেক রহমানের সরকারের জন্য এটি সতর্কবার্তা।
নীরবে কাজ করে যাওয়ার নীতি প্রশাসনিকভাবে প্রশংসনীয় হতে পারে, কিন্তু রাজনীতিতে সেটি যথেষ্ট নয়। জনগণকে জানতে হয় সরকার কী করছে, কেন করছে এবং তার সুফল কোথায়।
আপনি যদি নিজের কাজের গল্প নিজে বলতে না পারেন, আপনার প্রতিপক্ষ আপনার হয়ে সেই গল্প লিখবে। তখন বাস্তবতা হয়তো সরকারের পক্ষে থাকবে, কিন্তু জনমতের ন্যারেটিভ থাকবে অন্যের হাতে।
আর রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত শুধু কে কত কাজ করল, তা দিয়ে সবসময় বিচার হয় না। কে সেই কাজের অর্থ জনগণের কাছে কতটা সফলভাবে পৌঁছে দিতে পারল—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নয়ন তাই শুধু সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা তেল শোধনাগার নির্মাণের নাম নয়। উন্নয়নের একটি রাজনৈতিক ভাষাও আছে।
বর্তমান সরকার সেই ভাষা তৈরি করতে পারছে কি না—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।

Author