
১. সম্প্রতি প্রথম আলোর সম্পাদক বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্র, টেলিভিশন স্টেশন ও অন্যান্য গণমাধ্যম “স্বাধীনভাবে কাজ করতে গিয়ে যথেষ্ট সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে”। তাঁর দাবি, “বিভিন্ন ধরনের চাপ ও ভয়ের পরিবেশে” অনেক গণমাধ্যমের মালিকানা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে, সম্পাদকদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অনেক সাংবাদিককে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সাংবাদিকেরা “অনিশ্চয়তা ও স্ব-নিয়ন্ত্রণের একটি পরিবেশে” কাজ করেছেন।
২. তিনি আরও বলেন, ওই সময়ে প্রথম আলোকে “ভয়ের পরিবেশের মধ্যে” কাজ করতে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তিনি উগ্রবাদী গোষ্ঠী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের চাপ এবং হুমকির কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঠেকাতে অন্তর্বর্তী সরকারের “দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা” আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীকে “সরাসরি ও কার্যকর নির্দেশনা” দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
৩. এই বক্তব্যে গুরুতর কিছু অর্ধসত্য, ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য রয়েছে। ভয়ের পরিবেশের প্রসঙ্গে মতিউর রহমান স্পষ্টতই সত্যটি এড়িয়ে গেছেন। অন্তর্বর্তী সরকার কখনো সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করেনি; কোনো সংবাদপত্র বন্ধ করার নির্দেশ দেয়নি কিংবা কোনো প্রতিবেদন সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশও দেয়নি। বরং কয়েকটি ক্ষেত্রে স্থানীয় গণমাধ্যমকে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদন সংশোধনের অনুরোধ করা হয়েছিল। হাসিনা সরকারের সময়ে যেসব গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার অভিযোগ ছিল—এমনকি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি গণমাধ্যমে জোর করে আওয়ামী লীগপন্থী সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগও উঠেছিল—সেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
সংবাদপত্র, টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম যেকোনো বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সরকারের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল। আমরা দেখেছি, অনেক “সিনিয়র সাংবাদিক” এবং টকশোর অতিথি অবাধে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেছেন। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ উদ্যোগগুলোর বিরুদ্ধে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর যেন অবাধ সুযোগ তৈরি হয়েছিল। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার এসব বিষয়ে কখনো আদালতের আশ্রয় নেয়নি, এমনকি মিথ্যা ও অসত্য প্রচারকারীদের টেলিভিশন বা সংবাদপত্রে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে কোনো গণমাধ্যমকে ফোন করে নির্দেশও দেয়নি।
৫. অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অধ্যাপক ইউনূস ও তাঁর সহকর্মীরা জুলাই বিপ্লবের অংশগ্রহণকারীদের “উগ্রবাদী” ও “সন্ত্রাসী” হিসেবে আখ্যায়িত করা গণমাধ্যমগুলো বন্ধ করে দেওয়ার জন্য জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তরুণদের কাছ থেকে ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছিলেন। তাহলে কি অন্তর্বর্তী সরকার কোনো সংবাদমাধ্যম বন্ধ করেছিল? না। বরং হাসিনা সরকারের সময়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া সংবাদমাধ্যম ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলের বড় একটি সময়ে এসব মুদ্রণ, সম্প্রচার ও ডিজিটাল গণমাধ্যমের অনেকগুলোই হাসিনা ও তাঁর দলের প্রতি চরম তোষামোদমূলক ভূমিকা পালন করেছে। তারা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেছে, যা বিরোধীদের ওপর নির্মম দমন-পীড়নের পথ তৈরি করতে সহায়তা করেছে। বিরোধী দলের কর্মীদের “উগ্রবাদী” হিসেবে চিহ্নিত করে পুলিশের প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহারের ঘটনাকেও বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের শেষ দিনগুলোতেও এসব শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিকের অনেকেই জুলাই বিপ্লবের অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে সহিংস দমন-পীড়নের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
৬. এখন এসব সাংবাদিক ও গণমাধ্যম মালিক নিজেদের ইতিহাসের ভুল পাশে দেখতে পেয়ে মালিকেরা শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনেছেন, বিতর্কিত আওয়ামী লীগপন্থী সাংবাদিকদের সরিয়ে দিয়েছেন এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে জুলাইয়ের ঘটনাবলির উপস্থাপনার ধরনও প্রকাশ্যেই পরিবর্তন করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকার কি গণমাধ্যমের মালিকদের এসব পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছিল? না, দেয়নি। মালিকেরা নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা এবং নতুন রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য স্বেচ্ছায় এসব পরিবর্তন এনেছেন।
৭. হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একটি গণমাধ্যম সাম্রাজ্য পুরোপুরি আওয়ামী লীগপন্থী সাংবাদিকদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। ৫ আগস্টের বিপ্লবের পর নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সন্তুষ্ট করতে তারা শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে। আরও কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। এসব পরিবর্তন কি অন্তর্বর্তী সরকার করিয়েছিল? একেবারেই নয়; মালিকেরা নিজেরাই এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বিষয়টি সম্পাদক মতিউর রহমান খুব ভালোভাবেই জানেন, যদিও তিনি তাঁর বক্তব্যে এ বিষয়টি উল্লেখ করেননি।
এমনকি প্রথম আলোর ভেতরেও যেসব কণ্ঠকে আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে বিবেচনা করা হতো, মতামত পাতায় তাদের ভূমিকা সীমিত করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার কি প্রথম আলোকে এমনটি করতে বলেছিল? মোটেও নয়। একইভাবে, সময় টিভির মালিকেরা নতুন ব্যবস্থাপনা নিয়ে এসেছিলেন, কারণ হাসিনা সরকারের সময়ে এই চ্যানেলটি ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে প্রচারণায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। সময় টিভির মালিক প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপ ছিল বিপুল ঋণের বোঝায় ভারাক্রান্ত; হাসিনা সরকারের আমলে সময় টিভি আওয়ামী লীগের পক্ষে যে ভূমিকা পালন করেছিল, তার পুরস্কার হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি সহজেই নতুন ঋণ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। এখন রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যাওয়ায় তারা সংকটে পড়েছে।
৮. এই ভয়ের পরিবেশের সঙ্গে এসব গণমাধ্যম হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে যে আগ্রাসী, বিরোধীবিরোধী ও জনস্বার্থবিরোধী সাংবাদিকতা করেছে, তার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিএনপি, দলটির নেতা তারেক রহমান এবং প্রয়াত খালেদা জিয়া ছিলেন এর অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী। পাশাপাশি অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলও একই ধরনের আক্রমণের শিকার হয়েছে।
এসব গণমাধ্যম হাসিনার প্রতি এমন মাত্রায় তোষামোদ করেছে যে তারা কখনোই বিশ্বাস করেনি বিরোধীরা আবার ক্ষমতায় ফিরতে পারে। জুলাইয়ে পরিস্থিতির পালাবদলের পর এসব গণমাধ্যমের মালিক ও বিতর্কিত সাংবাদিকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধী দলের কর্মী এবং হাসিনার শাসনামলে জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি মামলা করেন। এসব মামলা অন্তর্বর্তী সরকার দায়ের করেনি।
আগ্রাসী সাংবাদিকতার অভিযোগে অভিযুক্ত গণমাধ্যমগুলো চাইলে তাদের অতীত ভূমিকা নিয়ে অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা করতে পারত। তারা নীরবে নিজেদের ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে পারত—যেমন সময় নিউজ তাদের জনস্বার্থবিরোধী সাংবাদিকতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে। কিন্তু তারা তা না করে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সন্তুষ্ট করা এবং নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার জন্য নিউজরুমগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে।
৯. প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা ছিল গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর জঘন্য অপরাধ। পুলিশকে এসব হামলা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হওয়া উচিত ছিল। এর কয়েক মাস আগে প্রথম আলোতে একই ধরনের হামলার চেষ্টা পুলিশ সফলভাবে প্রতিহত করেছিল। ১৮ ডিসেম্বরের হামলার পর পুলিশ সংবাদ সম্মেলন করে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে।
এরপর এসব হামলার ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে। হামলা ঠেকাতে অন্তর্বর্তী সরকারের “দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা” “সরাসরি ও কার্যকর নির্দেশনা” দিতে ব্যর্থ হয়েছেন—মতিউর রহমানের এই দাবির ভিত্তি কী, তা স্পষ্ট নয়। পুলিশকে উভয় সংবাদপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেনাবাহিনীকেও মোতায়েন করা হয়েছিল এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা ডেইলি স্টারের ভেতরে আটকে পড়া সাংবাদিকদের নিরাপদে বের করে আনতেও সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছিলেন।
(শফিকুল আলম সাবেক এএফপি ব্যুরো চিফ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সচিব। বর্তমানে তিনি ইংরেজি দৈনিক The Wadar-এর সম্পাদক।
সম্প্রতি প্রথম আলো সম্পাদক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কিছু অভিযোগ তুলে বক্তব্য দেন। এর জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ইংরেজিতে একটি স্ট্যাটাস দেন শফিকুল আলম। Policy Paper-এর পাঠকদের জন্য তাঁর সেই বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা হলো।)
Author