
ক’দিন ধরে স্মৃতিতে সাক্ষাৎকারটি হাতড়ে বেড়াচ্ছিলাম। এআইকে বলায় মুহূর্তেই খুঁজে দিল।
আগস্ট, ২০১৪। প্রথম আলোর হয়ে মিজানুর রহমান খান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের দীর্ঘ ইন্টারভিউটি করেন। সেখানে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় বিএনপিতে স্বাধীনতাবিরোধীদের অবস্থান নিয়ে কথা উঠেছিল।
মির্জা আব্বাসের বক্তব্যটা হুবহু তার ভাষায় তুলে দিই। তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমি তখন স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বিবেচনায় বিশেষ কতিপয় ব্যক্তির তীব্র বিরোধিতা করেছিলাম। সাহস করে বলেছিলাম, আমি তাঁদের সঙ্গে রাজনীতি করতে পারব না। জিয়ার অনন্য গুণ ছিল যে আমার সঙ্গে বিরোধিতা না করে বরং আশ্বস্ত করেছিলেন। জিয়া বোঝালেন, তুমি নিশ্চয় আমার চেয়ে বড় মুক্তিযোদ্ধা নও। এটা দেশ বিভক্তির সময় নয়। দেশকে বিভক্ত করে জাতিকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। তাঁর এই কথা একটি সর্বকালীন সত্য।’’
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন এটাই ছিল বিএনপির অবস্থান। ঐতিহাসিক ৫ই আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতির বহু কিছু পাল্টে দেয়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিএনপির অবস্থানও। গত দুই বছরে বিএনপির কিছু নেতার মুখে নিয়মিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা শোনা যায়। জামায়াত-শিবিরকে তারা বলেন স্বাধীনতাবিরোধী। অথচ এ দলের সঙ্গেই তাদের ছিল দীর্ঘ সখ্যতা।
এত গেল একটি ইস্যুর কথা। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ক্ষেত্রেই বিএনপির রাজনীতিতে পরিবর্তনের আওয়াজ স্পষ্ট। বিএনপি কি বদলে যাচ্ছে? কী পরিবর্তন হচ্ছে দলটির ভেতর। এ নিয়ে আজকের রিপোর্টে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় আওয়ামী লীগ। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্ভিক্ষ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে শেখ মুজিব সরকার ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ—বাকশাল—গঠনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে একদলীয় ব্যবস্থার সূচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষ তৈরি করে।
১৫ আগস্ট ১৯৭৫, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রক্ষমতায় দ্রুত পরিবর্তন আসে। পরবর্তী কয়েক মাসে একের পর এক অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সামরিক ও বেসামরিক ক্ষমতার ভারসাম্যও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন। প্রথমে সামরিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে ক্ষমতা পরিচালনা করলেও ধীরে ধীরে তিনি সরাসরি রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিকে এগিয়ে যান।
জিয়াউর রহমানের সামনে তখন দুটি বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল। একদিকে ১৯৭৫ সালের একদলীয় ব্যবস্থার পর দেশে বহুদলীয় রাজনৈতিক পরিসর পুনর্গঠনের প্রশ্ন; অন্যদিকে আওয়ামী লীগসহ পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বাইরে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।
তিনি জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ইসলামি মূল্যবোধসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারণাকে সামনে নিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে জাগদল (জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল) গঠিত হয় ১৯৭৭ সালের ২৮ আগস্ট। পরে জাগদলসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের সমন্বয়ে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠিত হয়। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি সামরিক প্রশাসনের বাইরে একটি নির্বাচনী ও সাংগঠনিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজের নেতৃত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।
বিএনপির জন্ম তাই কেবল একটি নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ছিল না; এটি ছিল ১৯৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, বহুদলীয় রাজনীতি, জাতীয় পরিচয় এবং ক্ষমতার নতুন রাজনৈতিক বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। দলের ঘোষণাপত্রে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এবং ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি পৃথক রাজনৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াউর রহমানের দল গঠনের ইতিহাস লিখতে হলে ‘বিএনপি সরাসরি ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়ার পাশাপাশি জাগদল, জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট এবং ১৯৭৫–৭৮ সালের রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ধারাটিও দেখানো জরুরি। এতে দলটির জন্মের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনেক বেশি পরিষ্কার হয়।
বিএনপির মতাদর্শ তাহলে কোন দিকে?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি এমন একটি দল, যার রাজনৈতিক পরিচয়কে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। দলটিকে কেউ মধ্য-ডানপন্থি, কেউ জাতীয়তাবাদী, কেউ রক্ষণশীল, আবার কেউ ইসলামপন্থী শক্তির সঙ্গে জোট করা একটি ডানঘেঁষা রাজনৈতিক দল হিসেবে বর্ণনা করেন।
কিন্তু বিএনপির প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক পথচলার দিকে তাকালে দেখা যায়, দলটির মূল পরিচয়ের কেন্দ্রে কখনোই কেবল ধর্ম, কেবল অর্থনীতি কিংবা কেবল ক্ষমতার রাজনীতি ছিল না। বরং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, বাজারমুখী অর্থনীতি, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং আওয়ামী লীগের বিপরীতে একটি পৃথক রাজনৈতিক পরিচয়—এই কয়েকটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই বিএনপির রাজনৈতিক চরিত্র তৈরি হয়েছে।
আওয়ামী লীগের রাজনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। ভাষা, সংস্কৃতি, বাঙালি জাতিসত্তা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর গড়ে ওঠা সেই জাতীয়তাবাদের বিপরীতে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ভূখণ্ড, রাষ্ট্রীয় পরিচয়, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা সামনে আনেন। এর মধ্য দিয়ে বিএনপি শুধু একটি নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, আওয়ামী লীগের বাইরে একটি বিকল্প জাতীয় রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
এই জায়গাটিই বিএনপির ডানমুখী রাজনৈতিক চরিত্রের প্রথম ভিত্তি তৈরি করে। কারণ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের পাশাপাশি অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে ব্যক্তিখাত, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগ ও উৎপাদনকে উৎসাহ দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতি যেখানে জাতীয়করণ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের দিকে এগিয়েছিল, বিএনপির উত্থানের সঙ্গে সেখানে ব্যক্তিখাত ও বাজার অর্থনীতির জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি জায়গা তৈরি হয়।
অর্থনীতির এই অবস্থান বিএনপিকে আওয়ামী লীগের তুলনায় ডানদিকে নিয়ে যায়। তবে সেই ডানপন্থা ইউরোপীয় অর্থে কট্টর রক্ষণশীলতা ছিল না। বরং বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি ছিল জাতীয়তাবাদী, বাজারমুখী এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকেন্দ্রিক একটি মধ্য-ডান রাজনৈতিক অবস্থান।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি বড় সংকটে পড়ে। কিন্তু সেই সংকট থেকে দলকে টেনে তুলতে সামনে আসেন বেগম খালেদা জিয়া।
এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে বিএনপির একক রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠেন। আশির দশকের শেষ দিকে বিএনপি আর শুধু জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী দল ছিল না; এটি হয়ে ওঠে একটি বড় গণভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যুক্ত হয়। দলটি একদিকে জাতীয়তাবাদী ও রক্ষণশীল অবস্থান ধরে রাখে, অন্যদিকে গণতন্ত্র ও সংসদীয় রাজনীতির দাবিকে সামনে আনে। অর্থাৎ বিএনপির রাজনীতিতে তখন একটি আকর্ষণীয় দ্বৈততা তৈরি হয়—আদর্শে মধ্য-ডান ও রক্ষণশীল, কিন্তু রাজনৈতিক আন্দোলনে গণতন্ত্রপন্থী।
১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয় এবং খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়া দলটির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোর একটি। রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে বাংলাদেশ আবার সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে যায়। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি তখন নিজেদের শুধু জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করেনি; বরং একটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক, বাজারমুখী ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে।
এই সময় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাত, বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তাদের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। বিএনপির অর্থনৈতিক দর্শনও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হবে—এমন ধারণার পরিবর্তে ব্যক্তিখাত ও বাজারকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হয়। এই অর্থনৈতিক অবস্থান বিএনপিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে মধ্য-ডান অবস্থান আরও দৃঢ় করে।
তবে বিএনপির ডানপন্থি পরিচয়ের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ছিল ধর্ম ও ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে তার সম্পর্ক।
বিএনপি নিজে কখনো জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি ইসলামপন্থী দল ছিল না। বিএনপির মূল আদর্শ ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইসলামকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে দলটি। বিভিন্ন সময়ে ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী ও রাজনৈতিক জোট করেছে। এই সম্পর্ক বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে।
১৯৯১ সালের পর থেকেই বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোট গঠনের মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্ক আরও স্পষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের এই জোট বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সুস্পষ্ট ডানঘেঁষা নির্বাচনী জোটের চেহারা নেয়।
২০০১ সালের নির্বাচন ছিল এই রাজনৈতিক ধারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। চারদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ী হয় এবং খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বিএনপির ডানপন্থি পরিচয় নিয়ে আলোচনাকে আরও গভীর করে।
এখানে বিএনপির রাজনৈতিক চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। দলটি একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদী, বাজারমুখী ও সংসদীয় গণতন্ত্রের কথা বলেছে; আবার ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে জোট করেছে। ফলে বিএনপিকে শুধু ‘ডানপন্থী’ বা শুধু ‘গণতান্ত্রিক’—কোনো একক পরিচয়ে বোঝা কঠিন।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সময় দেশের অর্থনীতি, বেসরকারি খাত ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের নানা উদ্যোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়। এই সময় দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান, ১৭ আগস্ট ২০০৫-এর দেশব্যাপী বোমা হামলা এবং ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মতো ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
বিশেষ করে জঙ্গিবাদের উত্থান বিএনপির জন্য একটি কঠিন রাজনৈতিক প্রশ্ন তৈরি করে। জাতীয়তাবাদী ও রক্ষণশীল রাজনীতির সঙ্গে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির জোট কি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিল, যেখানে উগ্রবাদী শক্তি রাজনৈতিক ও সামাজিক জায়গা পেয়েছিল? বিএনপি অবশ্য জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক বিতর্কটি থেকে যায়।
২০০৬ সালের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপি ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। এরপর দলটির সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। ক্ষমতার রাজনীতির পাশাপাশি বিএনপির রাজনৈতিক ভাষায় গণতন্ত্র, নির্বাচন, ভোটাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতার প্রশ্ন আরও গুরুত্ব পেতে থাকে।
এই পরিবর্তন বিএনপির রাজনৈতিক বিবর্তন বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দলটি তার পুরোনো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী অবস্থান থেকে সরে যায়নি, কিন্তু সেই জাতীয়তাবাদের সঙ্গে নতুন কিছু রাজনৈতিক ভাষা যুক্ত হতে থাকে। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদের কার্যকারিতা, ক্ষমতার ভারসাম্য—এসব বিষয় বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্যে গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
বিএনপি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকে। আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে দলটির প্রধান রাজনৈতিক দাবি হয়ে ওঠে নিরপেক্ষ নির্বাচন ও ভোটাধিকার। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা, তার কারাবাস এবং দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা বিএনপিকে আরও সংকটে ফেলে।
এই সময় দলটি উপলব্ধি করতে শুরু করে যে শুধু আওয়ামী লীগ বিরোধিতা দিয়ে ভবিষ্যতের রাজনীতি পরিচালনা করা কঠিন। তাই ২০১৭ সালে বিএনপি ‘Vision 2030’ সামনে আনে। এই পরিকল্পনায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদীয় গণতন্ত্র, প্রশাসনিক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মতো বিষয় গুরুত্ব পায়।
এর মধ্য দিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক ভাষায় একটি পরিবর্তন স্পষ্ট হয়। জিয়াউর রহমানের সময় যেখানে মূলত জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্র ও উন্নয়ন ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়, খালেদা জিয়ার পরবর্তী পর্যায়ে তার সঙ্গে যুক্ত হয় প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র সংস্কারের ভাষা।
২০১৮ সালের পর খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অনুপস্থিতি বিএনপির নেতৃত্ব কাঠামোতেও পরিবর্তন আনে। তারেক রহমান দলের কার্যকর নেতৃত্বে চলে আসেন। বিএনপির রাজনীতিতে তখন নতুন প্রজন্মের ভাষা এবং নতুন ধরনের রাষ্ট্র সংস্কারের ধারণা সামনে আসে।
এই ধারারই পরিণতি ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার পরিকল্পনা। বিএনপি এই পরিকল্পনাকে জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা এবং খালেদা জিয়ার Vision 2030-এর ধারাবাহিকতা হিসেবে উপস্থাপন করে। সেখানে রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারের মতো বিষয় সামনে আসে।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপিতে তারেক রহমানের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই মধ্যে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ঐতিহাসিক জয় লাভ করে।
এ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল গত প্রায় চার দশকে এই প্রথম আওয়ামী লীগ বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। আগের নির্বাচনগুলোতে বিএনপির কৌশল ছিল আওয়ামী লীগবিরোধী সব ভোট বিএনপির বাক্সে ফেলা। মূলত এই কৌশলের অংশ হিসেবেই চারদলীয় জোট গড়ে উঠেছিল। প্রয়াত সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ আনোয়ার জাহিদ বেগম খালেদা জিয়াকে এটা বোঝাতে সক্ষম হন যে, আওয়ামী লীগবিরোধী সব ভোট যদি এক বাক্সে ফেলা যায়, তাহলে আওয়ামী লীগ কখনো নির্বাচনে জিততে পারবে না। ২০০১ সালে সেটা অনেকটা প্রমাণও হয়েছিল।
কিন্তু, ২০২৬ সাল বিএনপির জন্য নতুন বাস্তবতা নিয়ে আসে। এ প্রেক্ষাপটে দলটি তার কৌশল পরিবর্তন করে। এখানে কয়েকটি প্রধান কৌশল দেখা যায়।
এক. মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয়টি বিএনপি বারবার সামনে আনতে থাকে। যেটা আগেই বলেছি, বিএনপির রাজনীতির এক নতুন ঘটনা। দুই. সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগের ভোট টানার কৌশল নেয় বিএনপি। তিন. আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল দেখা যায়, ইসলামপন্থীরা যেন সবাই জামায়াতের সঙ্গে না মিলে। এক্ষেত্রে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে বিএনপি তার জোটে টানে। অন্যদিকে, হেফাজতে ইসলামকে সক্রিয় করে জামায়াতের বিরুদ্ধে।
বিএনপির এই কৌশল ভোটের রাজনীতিতে সফল হয়। আরও দুটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আমরা বিএনপির রাজনীতিতে দেখি। এক. জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে গুপ্ত রাজনীতির ন্যারেটিভ। দুই. বিএনপিপন্থী একদল অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট মাঠে দেখা যায়, যারা জামায়াতকে তীব্র আক্রমণ করে। যাদের বামপন্থী কিংবা আওয়ামী লীগের প্রতি একধরনের সফট দেখা যায়।
নানা ইস্যুতে ছাত্রদলকেও বামপন্থীদের পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যায়। সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যায়, ছাত্রদল ডাকসু থেকে জিন্নাহর ছবি নামাতে আলটিমেটাম দিচ্ছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে সাংবাদিক আলফাজ আনাম মনে করেন, বিএনপি সেন্টার-রাইট থেকে সেন্টার-লেফটের দিকে যাচ্ছে এবং দলটির এই পরিবর্তনের পথ আগামী দিনে আরও পরিষ্কার হতে পারে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিএনপি আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চলমান রাজনৈতিক ও আইনি অবস্থান রাতারাতি বদলাতে না পারলেও আওয়ামী লীগের বৃহত্তর সমর্থকগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করতে পারে।
এই সময়ে অভ্যন্তরীণ কিংবা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আমরা যেটা দেখছি, আদর্শ দ্বিতীয় সারিতে চলে যাচ্ছে। স্বার্থই হয়ে পড়ছে মুখ্য। জ্যঁ-পল সার্ত্রের একটা বিখ্যাত উক্তি আছে, ‘‘ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্র একই। প্রত্যেকেই স্বার্থপর।’’ রাজনীতিতেও আমরা সেটা দেখছি। এবং সম্ভবত, এটা খুব দোষেরও নয়।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার, বিএনপি যে সরকার গঠন করেছে সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি রয়েছেন। কিন্তু ইসলামপন্থী কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নেই।
অবস্থাদৃষ্টে যেটা মনে হচ্ছে, হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে বিএনপি একটা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে এবং রাখবে। কিন্তু ইসলামী মূল্যবোধের রাজনীতির কথা আগের মতো বলবে না।
‘২৪-এর ন্যারেটিভে ’৭১ যেন গুরুত্ব না হারায়, সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ দৃষ্টি রাখবে বিএনপি। বিএনপি সংখ্যালঘু এবং বামপন্থীদের পক্ষে অবস্থান স্পষ্ট রাখবে।
মন্তব্য: অবস্থাদৃষ্টে যেটা পরিষ্কার, বিএনপি কিছুটা হলেও আদর্শিক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। তবে এখনও পর্যন্ত এটা হিসেবি পরিবর্তন। বিএনপির বড় কোনো পরিবর্তন নির্ভর করছে আওয়ামী লীগের ফেরা, না ফেরার ওপর। আওয়ামী লীগ না ফিরলে বিএনপি বদলে যাবে।
Author