
হরমুজ প্রণালিতে এলএনজি পরিবহন স্বাভাবিক না হওয়ায় ইউরোপ ও এশিয়ার গ্রাহকদের জন্য তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ বাতিলের সময়সীমা নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত বাড়িয়েছে কাতারএনার্জি। ফলে কাতার থেকে এলএনজি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কাতারএনার্জি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক এলএনজি পরিবহন এখনো কার্যত বন্ধ থাকায় ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতাদের জন্য ঘোষিত ‘ফোর্স মেজর’ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকবে। ইতালির জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এডিসনের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে নভেম্বরের শুরুর মধ্যে নির্ধারিত আরও পাঁচটি এলএনজি কার্গো সরবরাহ করতে পারবে না কাতারএনার্জি।
এ নিয়ে এপ্রিল থেকে এডিসনের সঙ্গে চুক্তির আওতায় মোট ২৯টি এলএনজি কার্গো বাতিল হয়েছে। এসব কার্গোর পরিমাণ প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাসের সমান। এডিসন জানিয়েছে, বাতিল হওয়া ২১টি কার্গোর বিকল্প ইতোমধ্যে তারা নিশ্চিত করেছে, যার পরিমাণ প্রায় ২ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস।
কাতারের এলএনজি সরবরাহ সংকটের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। কাতারএনার্জি পাকিস্তানের ক্রেতাদের জানিয়েছে, সরবরাহ বাতিলের ঘটনা অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহও সেপ্টেম্বরের পর পর্যন্ত বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইউরোপের কয়েকজন ক্রেতাকেও একই ধরনের নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
কাতারএনার্জি মার্চে প্রথমবারের মতো ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করে। এরপর পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় মাসে মাসে এর মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে এলএনজি রপ্তানি কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্ভরযোগ্য কোনো সময়সীমা দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির গ্লোবাল রিসার্চ স্কলার অ্যান-সোফি করবাউয়ের মতে, রাজনৈতিক সমাধান না হলে কিংবা প্রধান পক্ষগুলোর কোনো একটি পক্ষ পিছু না হটলে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
হরমুজ সংকটের কারণে বৈশ্বিক বাজারে কাতারের এলএনজি সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমেছে। আইসিআইএসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৫০৯টি কার্গো।
এই সরবরাহ ঘাটতির কারণে কাতারের গ্যাস বিক্রি থেকে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
কাতারের ঘাটতির একটি অংশ পূরণ করছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নাইজেরিয়া ও মালয়েশিয়া। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার নতুন এলএনজি উৎপাদন স্থাপনা থেকে সরবরাহ বেড়েছে। তবে এসব বিকল্প উৎস এখনো কাতারের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি।
এশিয়ার কিছু দেশ গ্যাসের ব্যবহার কমিয়েছে অথবা বিকল্প জ্বালানিতে চলে গেছে। ইউরোপও স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কেনার পরিবর্তে মজুত গ্যাস ব্যবহার বাড়িয়েছে। এতে ইউরোপের গ্যাস মজুতের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
এলএনজি সরবরাহ সংকটের প্রভাব সব দেশের ওপর সমান নয়। যেসব দেশ কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এলএনজির ওপর বেশি নির্ভরশীল এবং পর্যাপ্ত বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেনি, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
অ্যান-সোফি করবাউ পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এসব দেশের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি এলএনজি ক্রয়ের ওপর যারা বেশি নির্ভরশীল, তাদের ঝুঁকি আরও বেশি।
অন্যদিকে, জাপান তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। দেশটি কাতার থেকে তুলনামূলক কম এলএনজি আমদানি করে এবং বিভিন্ন উৎসের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে।
চীনও এখন পর্যন্ত কাতারের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ার পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে। ইউরোপ মজুত গ্যাস ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দিলেও এতে তাদের মজুত কমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নাইজেরিয়ায় নির্মাণাধীন নতুন এলএনজি রপ্তানি প্রকল্পগুলো ভবিষ্যতে কাতারের বিকল্প হিসেবে বৈশ্বিক বাজারে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে পারে। তবে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এর আগে ধারণা করা হয়েছিল, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ এলএনজি বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে ফিরবে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই পূর্বাভাসকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
ইরান যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। বর্তমানে কিছু তেলবাহী ট্যাংকার এই জলপথ ব্যবহার করলেও এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজের চলাচল এখনো সীমিত।
এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজগুলো বিশেষায়িত হওয়ায় সহজে বিকল্প জাহাজ দিয়ে তাদের প্রতিস্থাপন করা যায় না। ফলে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ ও নিয়মিত জাহাজ চলাচল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কাতারের এলএনজি রপ্তানি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।
কাতারএনার্জির হিসাবে, হরমুজ প্রণালি নিরাপদ বলে নিশ্চিত হওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এমন ১২টি এলএনজি উৎপাদন ইউনিট থেকে প্রায় দুই মাসের মধ্যে উৎপাদন পুনরায় চালু করা সম্ভব। তবে রাস লাফান এলাকায় হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত আরও দুটি উৎপাদন ইউনিট মেরামতে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার পর সীমিত পরিসরে এলএনজি পরিবহন পুনরায় শুরু হলেও নতুন করে হামলার কারণে তা স্থায়ী হয়নি।
কাতারের এলএনজি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জন্য সরাসরি জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করছে। কারণ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। আমদানিনির্ভর এলএনজি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি ব্যাঘাত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা সংকট তাই শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি।
বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য অন্তত তিনটি বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে—এলএনজি সরবরাহের উৎস বহুমুখীকরণ, দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তি শক্তিশালী করা এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহন কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। ফলে কাতারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প উৎস ও জ্বালানি নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল তৈরি করাই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
Author