
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের বহু পুরোনো একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেও সামনে নিয়ে এসেছে—মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্বার্থ হাসিলের জন্য একটি ‘মধ্যপ্রাচ্যীয়’, ‘আরব’ কিংবা ‘মুসলিম’ ন্যাটো গড়ে তোলা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলপন্থী কিছু বিশ্লেষক এই চুক্তিকে ইসরায়েলবিরোধী জোট হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, নিজেদের ও আরব প্রতিবেশীদের পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়ায় সৌদি আরব হয়তো নতুন কোনো নিরাপত্তা নিশ্চয়তার পথ খুঁজছে।
তবে আরেকটি ব্যাখ্যাও রয়েছে। মক্কা চুক্তিকে বিশ্বজুড়ে স্নায়ুযুদ্ধের শুরুর সময় থেকে চলে আসা মার্কিন আঞ্চলিক নিরাপত্তানীতিরই একটি নতুন সংস্করণ হিসেবে দেখা যায়। সেই নীতির মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিমাপন্থী শাসনব্যবস্থাগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব বজায় রাখা। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন এই চুক্তির লক্ষ্যও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলা করা হতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিন দেশ ‘সম্প্রতি এবং অবশেষে’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। চুক্তিটির কাঠামোকে ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা সেন্টো—যা ‘বাগদাদ প্যাক্ট’ নামে পরিচিত ছিল—তার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ডুইট আইজেনহাওয়ারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন ফস্টার ডালেস বিশ্বজুড়ে সামরিক জোট গঠনের প্রবণতার জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান সোভিয়েতবিরোধী ফ্রন্ট হিসেবে বাগদাদ প্যাক্ট গড়ে ওঠে। এর সদস্য ছিল ব্রিটেন, তুরস্ক, শাহ-শাসিত ইরান, পাকিস্তান এবং হাশেমি শাসিত ইরাক।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জর্ডানকেও এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কারণে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। মিসরের গামাল আবদেল নাসের এবং তৎকালীন হাশেমিবিরোধী সৌদি আরবও এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিল।
১৯৫৭ সালের জানুয়ারিতে ঘোষিত আইজেনহাওয়ার ডকট্রিনের লক্ষ্যও ছিল মধ্যপ্রাচ্যে সোভিয়েত ও কমিউনিস্ট প্রভাব ঠেকানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা।
আইজেনহাওয়ারের দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্য ছিল ইসলাম, খ্রিষ্ট ও ইহুদি ধর্মের উৎপত্তিস্থল।
তাঁর নীতিতে এই অঞ্চলের পবিত্র স্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণকে কেবল ধর্মীয় নয়, বরং কৌশলগত ও রাজনৈতিক বিষয় হিসেবেও বিবেচনা করা হয়েছিল।
১৯৫৮ সালের বিপ্লবের পর ইরাক বাগদাদ প্যাক্ট থেকে বেরিয়ে গেলেও জোটটি আরও প্রায় দুই দশক টিকে ছিল। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর ইরান জোট ত্যাগ করলে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত এই আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোরও অবসান ঘটে।
তবে আঞ্চলিক ‘ন্যাটো’ গঠনের মার্কিন আকাঙ্ক্ষা কখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
২০০৬-০৭ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইস ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ গঠনের ধারণার সঙ্গে একটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের পরিকল্পনাও সামনে আনেন। সৌদি আরব, মিসর ও জর্ডানকে নিয়ে সে সময় একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির চেষ্টা হয়। তবে ইসরায়েলকে প্রকাশ্যভাবে সেই কাঠামোর অংশ করার সময় তখনো আসেনি।
ইসরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের উদ্যোগ আরও স্পষ্ট হয় ২০২২ সালে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েকটি আরব দেশের সামরিক সহযোগিতার পথ তৈরি করে। এই উদ্যোগকে অনেকে ‘মধ্যপ্রাচ্য ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
তৎকালীন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেনি গ্যান্টজ ‘মিডল ইস্ট এয়ার ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ বা এমইএডি-এর ধারণা সামনে আনেন। এর লক্ষ্য ছিল ইরান ও তার মিত্রদের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় আঞ্চলিক সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এরপর জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহও মধ্যপ্রাচ্য ন্যাটোর ধারণার প্রতি সমর্থন জানান। এই সামরিক কাঠামোর সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে ইরান, সিরিয়া, হিজবুল্লাহ, হামাস এবং রাশিয়ার মতো শক্তির নাম আলোচনায় আসে।
মক্কা চুক্তি ঘোষণার মাত্র কয়েক দিন আগে, ৩০ জুলাই সৌদি আরব আরও ১৩টি দেশের সঙ্গে একটি সামরিক জোট গঠন করে। দেশগুলো হলো বাহরাইন, বাংলাদেশ, কোমোরোস, জিবুতি, মিসর, জর্ডান, কুয়েত, পাকিস্তান, কাতার, সোমালিয়া, সুদান, তুরস্ক এবং এডেনভিত্তিক সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব প্রণালি ও এডেন উপসাগরে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে রিয়াদে ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ বা এমএমডিএ গঠিত হয়।
এই উদ্যোগকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’-এর একটি পরবর্তী রূপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র মিসর ও জর্ডান কেন মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়নি?
মিসর তখনো সিদ্ধান্ত বিবেচনা করছে বলে জানা যায়। তবে মিসর ও জর্ডানের অনুপস্থিতি এই আশঙ্কার প্রতিফলনও হতে পারে যে, ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো সংঘাতের ক্ষেত্রে তাদের ওপরও সামরিক হস্তক্ষেপের চাপ তৈরি হতে পারে।
ইসরায়েলপন্থী কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, নতুন এই চুক্তি ইসরায়েল এবং আব্রাহাম চুক্তির অংশীদার দেশগুলোর অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ফেলো স্টিভেন এ কুকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়ায় সৌদি আরবসহ কিছু দেশ বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামোর সন্ধান করতে পারে।
তাঁর যুক্তি হলো, আঞ্চলিক দেশগুলো এমন একটি ব্যবস্থা চাইতে পারে, যেখানে নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ ওয়াশিংটনের পরিবর্তে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর হাতে থাকবে।
কিন্তু এই ধারণার দুর্বলতা হলো—মক্কা চুক্তির তিন স্বাক্ষরকারীই দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় যুক্ত। পাকিস্তানের সঙ্গেও ওয়াশিংটনের দীর্ঘ সামরিক সম্পর্ক রয়েছে।
ফলে এই তিন দেশকে নিয়ে গঠিত জোটকে মার্কিন প্রভাবের বাইরে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন তৃতীয় মেরু হিসেবে দেখা কঠিন।
বরং মক্কা চুক্তিকে আব্রাহাম চুক্তির সরাসরি বিকল্পের চেয়ে একটি পরিপূরক নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে দেখাই যুক্তিযুক্ত হতে পারে।
তুরস্কের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক জটিল হলেও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ রয়েছে। সৌদি আরবও বহু বছর ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বজায় রেখেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের ইসরায়েলবিষয়ক অবস্থানকে ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক থেকে আলাদা করে দেখা কঠিন।
অর্থাৎ তিন দেশের কেউই ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে সরাসরি কোনো সর্বাত্মক সামরিক সংঘাতে যাওয়ার অবস্থানে নেই।
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক খালিদ আল-জাবেরের মতে, মক্কা চুক্তি এমন একটি সতর্কবার্তা হতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব কমে গেলে মধ্যপ্রাচ্য এমন একটি ব্যবস্থার দিকে যেতে পারে, যেখানে ইসরায়েল ও ইরান প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে।
তাঁর মতে, মক্কা চুক্তিকে তৃতীয় একটি মেরু তৈরির প্রাথমিক প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে—যে জোট কোনো পক্ষের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না, কিন্তু কোনো একক শক্তিকেও এই অঞ্চলে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করতে দেবে না।
তবে এই ব্যাখ্যারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক এতটাই গভীর যে ওয়াশিংটনের প্রভাবকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তাদের একটি স্বাধীন তৃতীয় অক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন।
সুতরাং মক্কা চুক্তিকে কেবল যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বা ইসরায়েলবিরোধী জোট হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য হয়তো বোঝা যাবে না।
মক্কা চুক্তি অনেকাংশে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতিরই নতুন সংস্করণ হতে পারে। বাগদাদ প্যাক্টের সময় যেমন সোভিয়েত প্রভাব মোকাবিলা ছিল প্রধান লক্ষ্য, বর্তমান সময়ে তেমনই ইরান ও তার মিত্রদের মোকাবিলা, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা নতুন জোটগুলোর গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হয়ে উঠতে পারে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই ধরনের জোট শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থ রক্ষা করবে?
সৌদি আরবের জন্য এটি হতে পারে নিজস্ব নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়ানোর একটি প্রচেষ্টা। তুরস্কের জন্য এটি হতে পারে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ। পাকিস্তানের জন্য এটি মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার একটি মাধ্যম।
কিন্তু বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই জোটগুলো শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর বাইরে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
মক্কা চুক্তিকে তাই নতুন কোনো ‘তৃতীয় মেরু’র জন্ম হিসেবে দেখার আগে এর সদস্য দেশগুলোর বিদ্যমান সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
কারণ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে জোটের নাম বদলালেও ক্ষমতার সমীকরণ খুব সহজে বদলায় না।
লেখক: জোসেফ মাসাদ
অধ্যাপক, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, নিউইয়র্ক। সূত্র: মিডল ইস্ট আই (Middle East Eye)
Author