
মধ্যপ্রাচ্য ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে ইরানকে যুক্ত করার সম্ভাবনা। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন প্রতিরক্ষা জোটে ইরানকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
তবে এই আমন্ত্রণের খবর এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা চুক্তির তিন প্রতিষ্ঠাতা দেশ—সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। ফলে আপাতত বিষয়টি একটি প্রতিবেদন ও ইরানি কর্মকর্তার বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে পাওয়া তথ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, কাতারভিত্তিক আল-মায়াদিনকে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের পার্লামেন্টের সংবাদ সংস্থা খানে-ই-মেল্লাতের প্রধান মেহদি রহিমি বলেন, ইরান মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছে এবং বিষয়টি বর্তমানে তেহরান পর্যালোচনা করছে।
রহিমির ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো বা ‘regional security umbrella’ গড়ে তোলার দিকে এগোচ্ছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলে আসছে বলে তিনি দাবি করেন।
অর্থাৎ, ইরান যদি শেষ পর্যন্ত এই জোটে যোগ দেয়, তাহলে এটি শুধু একটি নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার ঘটনা হবে না; বরং দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিভক্ত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ৭ আগস্ট ২০২৬। সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই চুক্তিতে সই করেন।
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
এই ব্যবস্থা অনেকটা ন্যাটোর Article 5-এর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। ন্যাটোর Article 5-এর মূল ধারণা হলো, একজন সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলা পুরো জোটের বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান স্পষ্ট করেছেন, মক্কা চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশ—বিশেষ করে ইরানকে—লক্ষ্য করে গঠিত হয়নি।
এই তিন দেশের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতার সমন্বয় চুক্তিটিকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে।
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও আর্থিক শক্তি। তুরস্কের রয়েছে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প, ন্যাটো সদস্য হিসেবে দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা এবং নিজস্ব সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নের সক্ষমতা। অন্যদিকে পাকিস্তানের রয়েছে বড় সামরিক বাহিনী এবং পারমাণবিক সক্ষমতা।
ফলে এই তিন দেশের সমন্বয়কে কেবল একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এর মধ্যে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামরিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পারমাণবিক প্রতিরোধ—বিভিন্ন ধরনের কৌশলগত শক্তির সমন্বয় রয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়াও চুক্তিটিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পুনর্বিন্যাস হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ইরান যদি সত্যিই এই জোটে যোগ দেয়, তাহলে এর চরিত্র আমূল বদলে যেতে পারে। কারণ সৌদি আরব ও ইরান দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে বিবেচিত। সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, লেবাননসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান বহু বছর ধরে পরস্পরবিরোধী ছিল।
অন্যদিকে তুরস্কের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক একই সঙ্গে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার। আবার পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সীমান্ত ও নিরাপত্তা সম্পর্ক থাকলেও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নিরাপত্তা উদ্বেগও রয়েছে।
এই বাস্তবতায় একই প্রতিরক্ষা কাঠামোর মধ্যে সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইরানকে নিয়ে আসা গেলে সেটি মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত নিরাপত্তা সমীকরণে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
মক্কা চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই বিভিন্ন বিশ্লেষণে এটিকে সম্ভাব্য ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। তবে এই তুলনাটি এখনো রাজনৈতিক ও বিশ্লেষণাত্মক পর্যায়ের।
কারণ ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট হিসেবে কাজ করার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কমান্ড কাঠামো, সমন্বিত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা, যৌথ সামরিক সক্ষমতা এবং সদস্যদের মধ্যে সুস্পষ্ট প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি।
মক্কা চুক্তির সদস্যরা ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সামরিক কমান্ডারদের মধ্যে বৈঠক, যৌথ সামরিক মহড়া এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার মতো বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেছে। তুরস্ক জানিয়েছে, ভবিষ্যতে জোটে আরও দেশ যুক্ত হতে পারে। মিসরের নাম সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে প্রকাশ্যে এসেছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বাইরের শক্তির পরিবর্তে আঞ্চলিক দেশগুলোর নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলে আসছে।
এই কারণে ইরানের পার্লামেন্টের সংবাদ সংস্থার প্রধান মেহদি রহিমি আমন্ত্রণের বিষয়টিকে তেহরানের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক দেশগুলো যখন নিজেদের নিরাপত্তার জন্য একটি আঞ্চলিক কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে, তখন সেটি ইরানের দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাইও এর আগে ১০ আগস্ট নতুন এই জোট গঠনের বিষয়ে তেহরানের ‘উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। অর্থাৎ জোট গঠনের প্রাথমিক পর্যায়েই ইরান এটিকে সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখেনি।
ইরান যদি শেষ পর্যন্ত এই জোটে যোগ দেয়, তাহলে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও পড়তে পারে। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোর বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা সম্পর্ককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইরানের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো যদি নিজেদের মধ্যে একটি সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিজস্ব ভূমিকা বাড়তে পারে।
তবে ইরানের যোগদানের খবর এখনো নিশ্চিত না হওয়ায় এ পর্যায়ে এর সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়া কঠিন।
মক্কা চুক্তিকে তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেই—এমন ইঙ্গিত ইতোমধ্যে এসেছে। তুরস্ক জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আরও দেশকে এই কাঠামোর আওতায় আনা হতে পারে।
মিসরকে সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে প্রকাশ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন ইরানকে আমন্ত্রণ জানানোর দাবি সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে—এই জোট কি ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিণত হবে?
যদি ইরান, মিসরসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ এতে যুক্ত হয়, তাহলে এর ভৌগোলিক পরিধি আরব উপদ্বীপ থেকে পূর্ব ভূমধ্যসাগর, আনাতোলিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশও এই প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যোগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছে বলে টাইমস অব ইন্ডিয়ার আরেকটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর বলেছেন, ঢাকার সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থ এবং ‘Bangladesh First’ নীতিকে কেন্দ্র করে নেওয়া হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ সরাসরি কোনো শক্তির বলয়ে না গিয়ে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চাইছে।
এই পরিস্থিতিতে ইরান যদি মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ তখন এটি শুধু সৌদি আরব-তুরস্ক-পাকিস্তানের একটি প্রতিরক্ষা সমঝোতা থাকবে না; বরং ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইরানকে সত্যিই আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে কি না। কারণ আমন্ত্রণের তথ্যটি এসেছে ইরানের পার্লামেন্টের সংবাদ সংস্থার প্রধান মেহদি রহিমির বক্তব্য থেকে। এখন পর্যন্ত ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
তাই আপাতত এটিকে একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে আমন্ত্রণটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হলে এবং তেহরান তা গ্রহণ করলে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
একই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো সৌদি-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতা, তুরস্কের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, পাকিস্তানের মুসলিম বিশ্বের ভূমিকা এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন-রাশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ওপরও নতুন প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থাৎ, মক্কা চুক্তিতে ইরানের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি কেবল একটি নতুন দেশের সদস্যপদ নয়—এটি পশ্চিম এশিয়া ও মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হয়ে উঠতে পারে।
Author