
ঠিক পাঁচ বছর আগে তালেবান সরকার বিজয়ী হয়ে কাবুলে প্রবেশ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সামরিক অভিযানে ততকালীন তালেবান সরকারের পতনের ২০ বছর পর তারা আবার জনগনের রায় নিয়ে ফিরে আসে। সে সময় মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী আফগনিস্তান ছেড়ে যায় তখন দেশটি ছিলো একটি অস্থিতিশীল বিশৃঙ্খল ভূমি, যেখানে একটি বোমা হামলায় প্রায় ২০০ আফগানের প্রাণহানি ঘটতো।
আজকের কাবুল আর সেই বিশৃঙ্খল শহর নয়—যেখানে বোমা হামলা থেকে সুরক্ষার জন্য চারপাশে ছিল সুরক্ষিত দেয়াল, কিংবা সশস্ত্র ব্যক্তিদের বহর যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করত। এটি এখন তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন ও শান্ত একটি শহর, যা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শিখছে।
এই বার্ষিকীতে তালেবান কী অর্জন করেছে, কোথায় তারা ব্যর্থ হয়েছে এবং আগামী বছরগুলোতে কী ঘটতে পারে—সেসব নিয়ে আজকের এই লেখা।
তালেবানরা যা করতে পেরেছে
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবানের প্রথম শাসনামলের অন্যতম বড় ব্যর্থতা ছিল পুরো আফগানিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারা। দেশটির যেসব প্রদেশ তালেবানের শাসন মেনে নেয়নি, শেষ পর্যন্ত সেসব এলাকাই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল।
এবার তালেবান সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলেই মনে হচ্ছে। বর্তমানে আফগানিস্তানের পুরো ভূখণ্ডই তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং তারা দেশজুড়ে তুলনামূলকভাবে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসমর্থিত সরকারের শেষ বছরগুলোতে ইসলামিক স্টেট–খোরাসান প্রদেশ (আইএসকেপি) যে বড় ধরনের হুমকি তৈরি করেছিল, সেই বাস্তবতায় বিষয়টি বেশ উল্লেখযোগ্য।
তালেবান আইএসকেপিকে অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছে এবং আপাতত বড় কোনো সশস্ত্র বিদ্রোহের মুখোমুখিও হতে হচ্ছে না। আফগানরা এখন দেশের এমন অনেক এলাকায় যাতায়াত করতে পারছেন, যেসব জায়গায় একসময় জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে যাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। এমন একটি দেশে, যেখানে রাজধানী কাবুলের ভেতরেও একসময় চলাচল ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন।
তবে অর্থনীতির চিত্রটি আরও জটিল। তালেবান ক্ষমতায় ফেরার আগের দুই দশক ধরে আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মূলত আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। একই সঙ্গে দুর্নীতি ও নিরাপত্তাহীনতা অর্থনীতির ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল। বিদেশি সহায়তার ওপর এতটা নির্ভরশীল একটি অর্থনীতি যে বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক সহায়তা এক রাতের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেলে বড় ধরনের ধাক্কা খাবে, সেটিই স্বাভাবিক।
তবে ২০২১ সালের ভয়াবহ ধাক্কা সামলেও তালেবান আফগান অর্থনীতিকে কোনোভাবে সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে। দেশটি আপাতত একটি নিম্নমাত্রার অর্থনৈতিক ভারসাম্যে পৌঁছেছে বলেই মনে হচ্ছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। এর মধ্যে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণও রয়েছে। দেশে ফিরে আসা শরণার্থীরা সঙ্গে করে অর্থ নিয়ে এসেছেন এবং কেউ কেউ ব্যবসায়ও বিনিয়োগ করছেন। কর ও শুল্ক আদায়ের ব্যবস্থার উন্নতির ফলে সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বেড়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে থাকা আফগানরা এখনও প্রতিবছর দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাঠাচ্ছেন।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি এবং বাণিজ্য বৃদ্ধি আফগান অর্থনীতিকে কিছুটা সহায়তা করেছে। তালেবান সরকার কুশ তেপা খাল, তুর্কমেনিস্তান–আফগানিস্তান–পাকিস্তান–ভারত (টিএপিআই) গ্যাস পাইপলাইন এবং উজবেকিস্তানের সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের মতো বড় অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। এর পাশাপাশি দেশজুড়ে অসংখ্য সড়ক নির্মাণ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে কিংবা চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্প সাধারণ আফগানদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করছে।
তবে এর পরও তালেবান সরকার সরকারি অর্থব্যবস্থাপনা সম্পর্কে স্বচ্ছ নয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার ব্যাপারে অনাগ্রহী। এর ফলে জবাবদিহি ও দুর্নীতির মতো গভীর কাঠামোগত সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ছে।
যা করতে পেরে নাই
তালেবানের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা তাদের সামাজিক নীতিতে।
গত পাঁচ বছরে একের পর এক ডিক্রি জারি করে নারী ও মেয়েদের ওপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে লিঙ্গবৈষম্যের ক্ষেত্রে আফগানিস্তান বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর দেশ হিসেবে আরও বেশি পরিচিতি পেয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির পর আফগান মেয়েদের ও নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক ও আধুনিক শিক্ষার সুযোগ না থাকা সমাজের জন্য যেমন লজ্জাজনক, তেমনি অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের ক্ষতি।
এর নেতিবাচক প্রভাব এখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আফগানিস্তানে নারী চিকিৎসক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর সংকট দেখা দিচ্ছে। বিষয়টি এক ধরনের স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করেছে। তালেবান নেতৃত্ব বলছে, মেয়েদের জন্য স্কুল যথেষ্ট নিরাপদ বা উপযোগী নয়। অথচ একই সময়ে দেশটিতে এমন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় নারীদের প্রয়োজন বাড়ছে, যেসব পেশার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগই তাদের দেওয়া হচ্ছে না।
সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগ্য শিক্ষক ও শিক্ষকদের ধরে রাখার বিষয়টিতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে এবং এগুলোই যেন সরকারের পছন্দের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে। আফগান সমাজে ধর্মীয় শিক্ষার অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বৈধ স্থান রয়েছে। কিন্তু তা কোনোভাবেই আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না।
এসব নীতির কেন্দ্রে রয়েছে নৈতিকতার নামে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ক্রমবর্ধমান বিস্তার—অর্থাৎ নাগরিকরা একসময় যেসব বিষয়কে নিজেদের ব্যক্তিগত বিষয় বলে মনে করতেন, সেসব ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ধারণা। এর ফলে শুধু আফগানদের জীবনযাপনই বদলে যায়নি; সরকার ও দেশটির জনগণের বড় একটি অংশের মধ্যকার দূরত্বও আরও গভীর হয়েছে।
তালেবান আফগান সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে সরকারকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করে তুলতেও ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি নিজেদের আন্দোলনের মধ্যেও সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকে কোণঠাসা করেছেন। দোহা চুক্তি নিয়ে যারা আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন এবং চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন, তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে কিংবা প্রভাবের বলয় থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে ক্ষমতা ক্রমেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এতে সরকারি কার্যক্রমের গতি কমেছে এবং সর্বোচ্চ নেতাকে ঘিরে থাকা তুলনামূলক ছোট একটি গোষ্ঠীর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রাধান্য পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তালেবান তাদের প্রত্যাশিত স্বীকৃতি আদায় করতে পারেনি। বিভিন্ন সময়ে যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা দেখা গেলেও প্রতিবেশী দেশগুলো এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশ কাবুলের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখলেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এখনও অধরাই রয়ে গেছে। নারী ও মেয়েদের শিক্ষা এবং অধিকার নিয়ে বিধিনিষেধ বহাল থাকা পর্যন্ত আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ থেকে বিচ্ছিন্নই থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
এরপর কী?
এই মুহূর্তে তালেবান ক্ষমতার ওপর বেশ শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলেই মনে হচ্ছে। তাদের সামনে কোনো কার্যকর সামরিক হুমকি নেই, রাজনৈতিক বিরোধীরা গভীরভাবে বিভক্ত এবং আফগানিস্তানে আবারও সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা চালানোর মতো আগ্রহ বা সক্ষমতা—কোনোটিই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।
তালেবানের জন্য বড় বিপদ তাই হয়তো তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি থেকে নয়; বরং ধীরে ধীরে জমতে থাকা জনঅসন্তোষ থেকেই আসতে পারে।
একটি সরকার দীর্ঘ সময় ধরে বিরোধিতা মোকাবিলা করে টিকে থাকতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন সরকারের কাছ থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন বোধ করতে শুরু করে যে সরকারকে দুর্বল করতে চাওয়া শক্তিগুলোর—সেটি বিদেশি শক্তি হোক কিংবা দেশের অভ্যন্তরের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী—প্রতি তারা আর তেমন উদাসীন না থাকে, তখন সেই সরকার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তাই তালেবানের বর্তমান স্থিতিশীলতাকে স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পর তালেবান আফগানিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু তারা এখনও একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি—তারা আসলে কী ধরনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং জনগণের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার এই পরিস্থিতি সামনে বড় ধরনের সংকট ডেকে আনতে পারে। তালেবানের ভেতরের কেউ কেউ বিষয়টি বুঝতে পারছেন। এখন প্রশ্ন হলো, যারা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছেন, তারা কি শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার মতো সাহস দেখাবেন, যে কেন্দ্রীকরণ তালেবানকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে?
কোনো না কোনো জায়গায় পরিবর্তন আসতেই হবে।
(আল জাজিরায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটি পলিসি পেপারের পাঠকদের জন্য বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।)

Author