
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এ সময় দেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করা যৌক্তিক। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, থিংকট্যাংক তারেক রহমান সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পারফরম্যান্সের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছে।
সাফল্যের জায়গাগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি ব্যর্থতা, সীমাবদ্ধতা ও ঘাটতিগুলোও তুলে ধরা জরুরি। এ ধরনের পর্যালোচনা নতুন কিছু নয়। বরং জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে প্রতিটি গণতান্ত্রিক সরকারকেই নিয়মিত এমন মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অধিকাংশ দেশেই অর্থনীতির ত্রৈমাসিক, অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পর্যালোচনা একটি স্বাভাবিক চর্চা। অনেক দেশের সরকারও নিজেদের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে এবং জনগণের সামনে তার অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ তুলে ধরে।
নতুন একটি সরকারের ক্ষেত্রে প্রথম ১০০ দিন বা প্রথম ছয় মাসকে সাধারণত ‘হানিমুন পিরিয়ড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময়ে সরকার প্রশাসনিক কাঠামো গুছিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে কিছুটা সময় পায়। নাগরিকরাও এই সময়ে সরকারের ভুলত্রুটি ও সীমাবদ্ধতাকে তুলনামূলকভাবে সহনশীল দৃষ্টিতে দেখেন।
একই সঙ্গে নির্বাচিত সরকার সাধারণত এই সময়েই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা উপভোগ করে। ফলে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনাও তুলনামূলকভাবে কম থাকে। কঠিন ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও এই সময় সরকার কিছুটা বাড়তি রাজনৈতিক সুবিধা পায়। কিন্তু হানিমুন পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর সরকারকে কঠোর সমালোচনা ও গভীর মূল্যায়নের মুখোমুখি হতে হয়।
বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করে। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমান দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব নেন। ফলে ১৭ আগস্ট তার সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে এবং এখন সপ্তম মাস চলছে।
অর্থনীতির গতিপথ পরিবর্তনের জন্য ছয় মাস যথেষ্ট সময় নয়। কোনো যুক্তিসংগত সমালোচকও এত অল্প সময়ে অর্থনীতির সব সমস্যার সমাধান প্রত্যাশা করেন না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, গত ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের সমালোচনামূলক মূল্যায়ন করা যাবে না—বিশেষ করে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনামলে অর্থনীতিকে গভীর সংকটের মধ্যে ফেলে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে।
গত ছয় মাসে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য কয়েকটি গুরুতর হুমকি ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত সরকার এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি।
প্রথম এবং অন্যতম উদ্বেগের বিষয় হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক—উভয় ধরনের বিভিন্ন কারণ মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী করছে। কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণে সরকার এখনো কার্যকর পথ খুঁজে পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।
ফলে মূল্যস্ফীতির গড় হার এখনো ৮ শতাংশের ওপরে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের প্রকৃত আয়ের ওপর। জুলাই ২০২৬-এ সাধারণ মূল্যস্ফীতি বা হেডলাইন ইনফ্লেশন ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। কিন্তু এই হার এখনো বেশ উঁচু।
অন্যদিকে কৃষি, শিল্প ও সেবা—এই তিনটি বৃহৎ খাত নিয়ে গঠিত মজুরি হার সূচক বা Wage Rate Index (WRI) জুলাইয়ে সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা জুনে ছিল ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির হার এখনো মূল্যস্ফীতির হারের নিচে। এর অর্থ, মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে।
দ্বিতীয় বড় উদ্বেগের জায়গা হলো বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিনিয়োগ পরিবেশ দ্রুত উন্নত হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু এখনো সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রমাণ মিলছে না। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের দুর্বল প্রবৃদ্ধিই এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশে। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ—সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সর্বনিম্ন হার।
একই সময়ে ব্যাংকিং খাতে মোট অতিরিক্ত তারল্য—সিকিউরিটিজসহ—৩৯ দশমিক ৪০ শতাংশ বেড়ে জুনে ৪ দশমিক ০৮ ট্রিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে। এটি মূলত ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ারই প্রতিফলন।
উচ্চ সুদের হার, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং আইনের শাসনের অবনতির কারণে বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগ কিংবা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা FDI ১৮ শতাংশ কমে ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। অবশ্য ২০২৬ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে জরুরি সমস্যা হলো জ্বালানি সংকট। এই সংকট এখন আর সাময়িক সমস্যা নয়; এটি পূর্ণাঙ্গ সংকটে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে।
বিএনপি সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে এমন একটি ব্যয়বহুল ও বিশৃঙ্খল জ্বালানি খাত পেয়েছে, যা শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে নানা নীতি ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশকে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
২০১৫ সাল থেকেই গ্যাস খাতে বড় ধরনের সংকট শুরু হয়। ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ চাহিদার বিপরীতে সরবরাহের ঘাটতি দ্রুত বাড়তে থাকে।
২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গ্যাস খাতের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে। এতে ঘাটতি মোকাবিলায় আমদানিনির্ভর সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়।
২০১৮ সাল থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ গ্যাস আমদানি শুরু করে। শেখ হাসিনা সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা দেশকে গ্যাস আমদানিনির্ভর করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন মন্ত্রী, আমলা ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীকে নিয়ে তিনি এমন একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন, যারা জ্বালানি খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এর ফলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে দেশে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে।
২০১৪ সালে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা LNG আমদানির সিদ্ধান্ত দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তন করে। আমদানিনির্ভরতার প্রথম বড় ধাক্কা আসে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর। জাহাজ পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশকে ব্যাপক লোডশেডিংয়ের আশ্রয় নিতে হয়।
এ বছরের শুরুতে আসে দ্বিতীয় বড় ধাক্কা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়। ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই বাংলাদেশ গুরুতর জ্বালানি সংকটে পড়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এরপর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশের দায়িত্ব নেয়।
১৮ মাস দায়িত্ব পালনকালে অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া আর্থিক ও জ্বালানি খাতের ক্ষতি মেরামতের চেষ্টা করে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে তারা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করলেও জ্বালানি খাতে খুব বেশি পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি।
এর অন্যতম কারণ ছিল শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে স্বাক্ষরিত ও বাস্তবায়িত দীর্ঘমেয়াদি LNG ও বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তিগুলো। এসব চুক্তির অনেকগুলোই সরবরাহকারীদের পক্ষে অত্যন্ত সুবিধাজনক এবং বাংলাদেশের জন্য ব্যয়বহুল। চুক্তিগুলোর সমস্যা জানা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার কোনো চুক্তি বাতিল করতে পারেনি।
এখন বিএনপি সরকার সেই পুরোনো চুক্তির বোঝা নিয়েই সমাধান খুঁজছে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদে সরকারের হাতে বিকল্প খুব বেশি নেই। এর একটি উদাহরণ ভারতের আদানি পাওয়ার থেকে বিদ্যুৎ আমদানি। ২০২৫ অর্থবছরে আদানির বিদ্যুৎ ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎসগুলোর একটি। প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের জন্য গড়ে ১৪ দশমিক ৮৬ টাকা ব্যয় হয়েছে।
২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছরের এই চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি করছে। চুক্তিটি বাতিল করতে গেলে এর শর্তগুলোর কারণে বাংলাদেশকে আরও বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা কম। আগামী দিনগুলোতেও বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন অব্যাহত থাকতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বিনিয়োগে। দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইতোমধ্যেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের সংকটে ব্যবসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। নতুন বিনিয়োগকারীরা এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে আরও সতর্ক হবেন।
ফলে বিনিয়োগ কমবে, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি আরও মন্থর হতে পারে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের ওপরও চাপ বাড়বে এবং বেকারত্ব বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ এবং জ্বালানি সংকট একে অপরকে আরও তীব্র করতে পারে। মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় কমাবে, বিনিয়োগের স্থবিরতা কর্মসংস্থান কমাবে এবং জ্বালানি সংকট উৎপাদন ব্যাহত করবে। অর্থনীতির সামনে তাই একটি কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।
তারেক রহমান সরকারের প্রথম ছয় মাসকে ব্যর্থতার চূড়ান্ত মূল্যায়ন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কিন্তু এই সময়ের প্রবণতাগুলো উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
Author