
দেশের লাখ লাখ মানুষের কর্মস্থল প্রবাসে। নাড়ির টান পেছনে রেখে জীবনের একটি বড় অংশ তাঁরা কাটিয়ে দেন বিদেশের মাটিতে। উদ্দেশ্য, দেশে রেখে যাওয়া মা-বাবা, ভাইবোন ও সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানো। বছরের পর বছর অপেক্ষার পর যখন দেশে ফেরেন, মনে থাকে আনন্দ, সঙ্গে থাকে পরিবারের জন্য নিয়ে আসা মূল্যবান উপহার বা অর্থকড়ি।
কিন্তু অনেকের দেশে ফেরার আনন্দ দুঃখে পরিণত হয় বিমানবন্দরেই। দীর্ঘ অপেক্ষার পর বেল্ট থেকে লাগেজ হাতে নিয়ে কেউ দেখেন তালা ভাঙা, কারও ব্যাগের চেইন খোলা, কারও ব্যাগ কাটা। ভেতরে খুঁজে পান না মূল্যবান জিনিসপত্র।
বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘিরে এমন অভিযোগ বহু বছরের। কখনো চুরির অভিযোগে কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন, কখনো মামলা হয়েছে। আবার অনেকে পাননি কোনো সমাধান।
তাহলে ব্যাগ কাটা হচ্ছে কোথায়? মালামাল সরানো হচ্ছে যাত্রার কোন পর্যায়ে? আর অভিযোগ জানানোর পর যাত্রী কতটা প্রতিকার পাচ্ছেন?
বিভিন্ন সময়ে এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে। কিন্তু সব ঘটনার পরিষ্কার উত্তর পাওয়া যায়নি। অভিযোগের পেছনের রহস্যও থেকে গেছে অপ্রকাশিত। সম্প্রতি যাত্রীদের লাগেজ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষাকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচিত হয়েছে বিষয়টি।
২০১৭ সালের মে মাসে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীর লাগেজ কেটে চুরির অভিযোগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ছয় কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা অস্থায়ী ট্রাফিক হেলপার হিসেবে কাজ করতেন। এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ তখন জানায়, মালয়েশিয়া থেকে আসা একটি ফ্লাইটের লাগেজ খালাসের সময় এক যাত্রীর ব্যাগ কেটে টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সন্দেহজনক গতিবিধির কারণে কর্মীদের আটক করে তল্লাশি চালানো হয়। তাঁদের কাছ থেকে ৯০০ মালয়েশীয় রিঙ্গিত ও ১০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।
একই বছরের আগস্টে লন্ডন থেকে ফেরা আলিফা নামের এক যাত্রী অভিযোগ করেন, লাগেজ পেতে তাঁকে প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ব্যাগ হাতে পাওয়ার পর দেখেন, সেটি খোলা হয়েছে। ভেতর থেকে একটি নতুন আইপড ও সোনার আংটি হারিয়ে গেছে। ২০ আগস্ট প্রকাশিত ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে এমনটি উঠে আসে।
২০২২ সালের ১০ আগস্ট শাহজালাল বিমানবন্দরে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের গণশুনানিতেও লাগেজ থেকে মূল্যবান জিনিস খোয়া যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, সৌদিপ্রবাসী ইসহাক আলী ওই শুনানিতে জানান, একাধিকবার অভিযোগ করেও তিনি প্রতিকার পাননি। অন্য যাত্রীরাও লাগেজ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, হয়রানি ও কর্মীদের আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সেই বছরের সেপ্টেম্বরে সাফজয়ী নারী ফুটবলারদের লাগেজ থেকে টাকা ও অন্যান্য জিনিস হারানোর অভিযোগ ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে খেলোয়াড়দের অভিযোগের পাশাপাশি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও উঠে আসে।
কর্তৃপক্ষ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় ঢাকায় চুরির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দলের প্রতিনিধিরা অক্ষত ও তালাবদ্ধ অবস্থায় লাগেজ বুঝে নিয়েছিলেন। এ ঘটনা লাগেজসংক্রান্ত অভিযোগের তদন্তে একটি জটিলতা সামনে আনে। যাত্রী ঢাকায় এসে মালামাল খুঁজে না পেলেও, সেটি ঠিক কোথায় হারিয়েছে, তা নির্ধারণ করা জরুরি। শুধু এই কারণে দায় এড়ানো যায় না।
২০২৩ সালের ১৫ অক্টোবর সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিমানের একটি ফ্লাইটের চার যাত্রী লাগেজ খোলা বা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পাওয়ার অভিযোগ করেন। তাঁদের মধ্যে দুজন পরে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন।
একটি লাগেজ যাত্রীর কাছ থেকে জমা নেওয়ার পর উড়োজাহাজে তোলা, গন্তব্যে নামানো এবং বেল্টে পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে কয়েকটি ধাপ পার হয়। ট্রানজিট থাকলে যোগ হয় আরও ধাপ। কোথায় ব্যাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা জিনিস সরানো হয়েছে, তা জানতে এই পুরো পথের তথ্য প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজনীয় ফুটেজ বা রেকর্ড পেতে দেরি হলে তদন্তও থেমে থাকে। যাত্রীর কাছে তখন অভিযোগ জানানোর পরের সময়টুকুও হয়ে ওঠে আরেক ভোগান্তি।
২০২৩ সালের নভেম্বরে লাগেজ চুরি ঠেকাতে কর্মীদের শরীরে ক্যামেরা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এর কার্যকর ব্যবহার না থাকায় মূল লক্ষ্য ব্যাহত হয়। শুধু ক্যামেরা দিয়ে সমস্যা সমাধান কতটা সম্ভব, তা নিয়ে তখনই প্রশ্ন ওঠে।
৫ অক্টোবর দেশের সব বিমানবন্দরে লাগেজ চুরি ও লুটপাট বন্ধে ১০ দিনের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে হাইকোর্টে রিট করার হুঁশিয়ারি দিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন। পুরো লাগেজ হ্যান্ডলিং প্রক্রিয়া লাইভ সিসিটিভির আওতায় এনে যাত্রীদের সামনে সম্প্রচার, লাগেজ তল্লাশি প্রকাশ্যে ও ক্যামেরার নজরদারিতে পরিচালনা এবং লোডার, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগে স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, উড়োজাহাজের কার্গো হোল্ড থেকে লাগেজ নামিয়ে কনভেয়ার বেল্টে পৌঁছানোর মধ্যবর্তী সময়ে একটি অসাধুচক্র তালাবদ্ধ লাগেজ কেটে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থসহ মূল্যবান সামগ্রী চুরি করছে।
লাগেজ চুরির প্রতিটি ঘটনায় যাত্রীরা আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক হয়রানিরও শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। কারণ, বিমানবন্দর শুধু দেশে প্রবেশ বা দেশ ছাড়ার জায়গা নয়; এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা, সেবা ও ভাবমূর্তিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বছরের পর বছর ধরে অভিযোগ ওঠার পরও বিমানবন্দরের মতো সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থানে যাত্রীর লাগেজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেন সম্ভব হচ্ছে না? কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। যাত্রী যেন নিশ্চিত থাকতে পারেন—মালামাল নিরাপদ এবং হারিয়ে গেলে এর জবাব দেওয়ার মতো একটি ব্যবস্থা রাষ্ট্রের আছে।
Author