রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মধ্যরাতের তাণ্ডব, গ্রেপ্তার ৯; উদ্ধার দুই ট্রাক মালামাল—পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, নেপথ্যের কারা?

‘রূপনগর’ নাটকে শেষ পর্যন্ত গডফাদার চরিত্রটিকে দেখা যায়নি। আমাদের প্রজন্ম সেখান থেকেই যেন বুঝতে শিখেছিল—গডফাদাররা সামনে আসে না, নির্দেশ দেয় আড়াল থেকে।
মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে মধ্যরাতের তাণ্ডবের পর সেই পুরোনো প্রশ্নটিই আবার সামনে এসেছে—যারা ভাঙচুর করেছে তারা ধরা পড়ছে, কিন্তু যারা নির্দেশ দিয়েছে তারা কোথায়?
রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ কার্যালয় ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় এ পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। লুট হওয়া মালামালের মধ্যে দুই ট্রাকও উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু ঘটনার নেপথ্যে কারা ছিল, কারা এই তাণ্ডবের নির্দেশ দিয়েছিল—সেই প্রশ্নের জবাব এখনো মেলেনি।
ঘটনাটি শুধু একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা কিংবা একটি জমি দখলের অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুলিশের উপস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব এবং একটি মানবিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন।
গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার ঘটনা ঘটে। মামলার এজাহারে একজনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা প্রায় ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি নিরাপত্তাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে প্রতিষ্ঠানে ঢুকে হামলা ও লুটপাট চালায়।
ঘটনার সময় ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে স্থাপনা ভাঙার অভিযোগও উঠেছে। সিসিটিভি ফুটেজের বর্ণনা অনুযায়ী, রাতের দিকে একটি ট্রাক আসে। পরে একটি বড় এস্কাভেটর আনা হয়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে। একপর্যায়ে সেখানে পুলিশের গাড়িও দেখা যায়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই—পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার পরও কীভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাট চলল?
ঘটনার সময় পুলিশের উপস্থিতির কথা থানার তৎকালীন ওসিও স্বীকার করেছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
ঘটনার পর স্থানীয়দের একটি অংশ পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, এত বড় একটি হামলা স্থানীয় রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের কোনো ধরনের ছত্রছায়া ছাড়া সম্ভব কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, তদন্ত এখনো চলছে। ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আরও গ্রেপ্তার হতে পারে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারা জড়িত, কারা জড়িত নয়—তা চূড়ান্তভাবে বলা যাচ্ছে না।
কিন্তু পুলিশের এই বক্তব্যের পাশাপাশি প্রশ্ন থাকছে—যারা মাঠে ছিল তাদের গ্রেপ্তার করা গেলেও যারা মাঠে লোক নামিয়েছে, তাদের শনাক্ত করতে এত সময় কেন লাগছে?
প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, মামলার তথ্য ও স্থানীয়দের বক্তব্যে জমি দখলকে ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের আগ্রহ ছিল। জমির মূল্য বেড়ে যাওয়ায় সেই আগ্রহ আরও তীব্র হয়েছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন এবং সেখানে পুলিশের উপস্থিতিও দেখেছেন। তার প্রশ্ন, পুলিশ যদি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকে, তাহলে হামলা ও ভাঙচুর ঠেকানো হলো না কেন?
অন্যদিকে, রাড্ডা কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা আইনি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখতে চান। নির্বাহী পরিচালক ড. নাসরিন আখতারের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ—যারা নির্দেশ দেয়, তারা তো সাধারণত নিজের হাতে ভাঙচুর করে না। এই বক্তব্যই তদন্তের মূল জায়গাটি নির্দেশ করে: মাঠপর্যায়ের হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করা।
ঘটনার পর স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের নাম আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন সূত্র ও সংবাদ প্রতিবেদনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে ইন্ধনের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সঙ্গে মিষ্টির সম্পৃক্ততার কথা শুনা যাচ্ছে। তাকে সমিতির সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
রাজনৈতিক নেতাদের পাল্টা অবস্থান
ঘটনার পর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কয়েকজন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক জানিয়েছেন, ঘটনায় দলীয় কিছু নেতাকর্মী ও একজন সংসদ সদস্যের নাম শোনা যাচ্ছে। তারা সত্যিই জড়িত থাকলে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাকর্মীরাও ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলা ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া স্থানীয় নারী সংসদ সদস্য, বিএনপির নেতাকর্মী এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেছেন।
পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার দুই দিন পর শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। অফিস আদেশে কারণ হিসেবে ‘প্রশাসনিক কারণ’ উল্লেখ করা হলেও পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, রাড্ডা ক্লিনিকে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বে অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং ওসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
‘রূপনগর’-এর গডফাদারকে দর্শক কখনো দেখেনি। চরিত্রটি দৃশ্যের বাইরে থেকেও পুরো ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করত। রাড্ডার ঘটনাতেও এখন পর্যন্ত যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে সামনে রয়েছে হামলাকারী ও লুটপাটে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা। তাদের কয়েকজন গ্রেপ্তারও হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে লুট হওয়া মালামাল। কিন্তু নির্দেশদাতার পরিচয় এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। এ কারণেই রাড্ডা শুধু একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্যও একটি পরীক্ষা।
Author