
এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের একজন নিঃসন্দেহে ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে একজন সাংবাদিককে কথা বলতে দেখেছি মাত্র দুই দিন আগে। সিএনএনের এক সাংবাদিক ট্রাম্পের মুখের ওপরই বলছিলেন—‘জাতিসংঘ আমাদের অনুমতি দিয়েছে। তুমি না করার কে?’
আমার মনে হয়, সাংবাদিকতায় এর চেয়ে সুন্দর মুহূর্ত আর কী হতে পারে!
সেখানেই তো সাংবাদিকতার সার্থকতা—যেখানে ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করা হয়। যেখানে ব্যক্তিস্বার্থে নয়, মানুষের স্বার্থে ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়ান একজন সংবাদকর্মী। ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করার সাহস, জবাবদিহির জায়গাটি তৈরি করা এবং সাধারণ মানুষের হয়ে কথা বলাই তো একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও হোয়াইট হাউজের সঙ্গে সিএনএনের টানাপোড়েন কম ছিল না। বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমটির সাংবাদিকদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সিএনএন পিছু হটেনি। ক্যামেরা তাক করা ছিল হোয়াইট হাউজের দিকে। ক্ষমতার পুরো মেয়াদজুড়েই তারা ট্রাম্পকে কাভার করেছে, প্রশ্ন করেছে, সমালোচনা করেছে।
এটাই তো সাংবাদিকতা।

এবারও ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের বিরোধ তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমের হোয়াইট হাউজ কাভারেজ নিয়েও বিধিনিষেধ এসেছে। কিন্তু তারা অভিমান করে সরে যায়নি। বরং ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড, সিদ্ধান্ত ও বক্তব্য কাভার করে যাচ্ছে নিরবচ্ছিন্নভাবে।
সাংবাদিকতার এই দৃশ্য দেখে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাঝেমধ্যেই প্রশ্ন ওঠে—‘এমন সাংবাদিকতা আমাদের দেশে হয় না কেন?’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলে এমন প্রশ্ন চোখে পড়বেই।
কিন্তু আমার মনে হয়, প্রশ্নটা করার আগে আমাদের একটু দৃষ্টিটা বদলানো দরকার। কারণ বাংলাদেশেও প্রতিদিন যে খবরগুলো প্রকাশিত হয়, তার বড় একটি অংশ বের করে আনেন সেই সাংবাদিকরাই, যারা নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কাজ করে যাচ্ছেন। সব সংবাদ হয়তো প্রকাশ করা সম্ভব হয় না, সব প্রশ্ন হয়তো করা যায় না—কিন্তু তার মানে এই নয় যে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিয়েছেন।
তবু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—আমাদের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের সাংবাদিকদের বাস্তবতা কি আমেরিকার একজন সাংবাদিকের মতো?
আমেরিকার একজন সাংবাদিক ক্ষমতাবান প্রেসিডেন্টকে প্রশ্ন করে হয়তো বাড়ি ফেরার সময় এই চিন্তা করতে হয় না যে, পথে কোনো ট্রাক তাকে চাপা দেবে কি না, কিংবা তার বাড়িতে কোনো লরি এসে পড়বে কি না। কিন্তু বাংলাদেশের একজন সাংবাদিককে অনেক সময় এসব বাস্তবতার কথাও ভাবতে হয়।
তাকে ভাবতে হয় চাকরি বাঁচানোর কথা। ভাবতে হয় পরিবারকে কীভাবে নিরাপদ রাখা যাবে। ভাবতে হয়, একটি প্রশ্নের পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে।
আমি নিজেও এর বাইরে নই।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের সময় আমি সিএনএনের হয়ে বাংলাদেশে কাজ করছিলাম। সেখান থেকে যা সত্য মনে হয়েছে, সেই সংবাদই পাঠিয়েছি। সাংবাদিক হিসেবে আমার কাজ ছিল সেটিই করা। এরপর কোনো এক অজানা কারণে আমি একসময় ‘ব্ল্যাকলিস্ট’-এর কাতারে চলে গেলাম। তার পরের সময়গুলো এখন আর মনে করতে চাই না।

২০২১ সালে অনেক চেষ্টার পর একজন শিক্ষানবিশের বেতনে এসএটিভিতে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু সেখানেও কাজের পাশাপাশি নিয়মিতভাবে গোয়েন্দা সংস্থার জেরার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
সেই সময়ের গল্প আর না-ই বা বললাম।
কারণ ‘গুম’ আর ‘আয়নাঘর’ সংস্কৃতির সময়টিতে সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি সংবাদ একজন সাংবাদিকের জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—সেটি বুঝতে খুব বেশি কল্পনার প্রয়োজন নেই।
তাই আমেরিকার সাংবাদিকের সঙ্গে বাংলাদেশের সাংবাদিকের সাহসের তুলনা করার আগে আমাদের বাস্তবতার পার্থক্যটাও বুঝতে হবে। সাংবাদিকতা শুধু সাহসের নাম নয়। সাংবাদিকতা হলো সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য সাংবাদিকেরও একটি নিরাপদ কর্মপরিবেশ দরকার। দরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, পেশাগত নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠানগত সুরক্ষা।
কারণ একজন সাংবাদিক যখন ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করেন, তখন আসলে শুধু একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন না—তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষ, যাদের প্রশ্ন করার সুযোগ নেই।
ট্রাম্পের চোখে চোখ রেখে একজন সাংবাদিকের প্রশ্ন করার সেই দৃশ্য তাই আমার কাছে শুধু একটি টেলিভিশন মুহূর্ত নয়।
এটি সাংবাদিকতার মূল শক্তির একটি দৃশ্যমান প্রতীক। ক্ষমতা যত বড়ই হোক, প্রশ্ন করার অধিকার তার চেয়েও বড়। আর সেই প্রশ্নটি করার সাহস থাকাটাই সাংবাদিকতার আসল শক্তি।

Author