
হোয়াইট হাউসে এমন লোক যে আগে কখনও আসেনি তা আরও একবার নিশ্চিত করলেন ডনাল্ড ট্রাম্প। জাতিসংঘের মঞ্চের বৃহত্তর আসনে বিশ্ব নেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে ইরানকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হুমকি দিলেন। বললেন, সংঘাতের অবসান না হলে তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দিতে পারেন। তাঁর ভাষণের সময় ইরানের প্রতিনিধিদলের মাত্র একজন সদস্য সভাকক্ষে উপস্থিত ছিলেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ সফল হয়েছে। তবে একই দিনে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে কাতারের মধ্যস্থতায় প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠক হয়েছে, যা সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের পূর্ণ সভাকক্ষে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ‘বিশ্ব সরকার’-এর ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন। একই সঙ্গে তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে মধ্যস্থতার প্রতিশ্রুতি দেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন এক দিনে এলো, যেদিন উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতাও চলেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠকও ছিল।
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধ তাঁর পররাষ্ট্রনীতি-কে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেললেও ট্রাম্প নিজে একাধিক বিশ্বনেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। এদিন তিনি ১২ জনের বেশি রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
জাতিসংঘে ভাষণের শুরুতেই ট্রাম্প অর্থনীতি, অভিবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সহিংস অপরাধ দমনে তাঁর সরকারের সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের এই অংশের সুর ম্যানহাটনে উপস্থিত কূটনীতিকদের চেয়ে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটারদের উদ্দেশে দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
ভাষণের বড় একটি অংশজুড়ে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এর আগে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্যের সঙ্গে ট্রাম্পের সুরের স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, বিশ্বে বিভাজন আরও গভীর হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বের দেশ ও জনগণের পারস্পরিক নির্ভরতার বিষয়টি তুলে ধরেন।
ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাত তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রেখেছে। তাঁর ভাষায়, এ ঘটনা ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ প্রতিষ্ঠার নীতির কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে—যেখানে সমঝোতা বা আপসের বদলে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা ও শক্তি প্রয়োগের হুমকি দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে কি এমন একটি চুক্তি হবে, যার মাধ্যমে তারা আবার গড়ে উঠতে পারবে এবং আগের চেয়েও শক্তিশালী একটি দেশ হয়ে উঠতে পারবে?’
এরপর ট্রাম্প বলেন, ‘নাকি আমি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে নিশ্চিহ্ন করে দেব এবং তা দ্রুতই করব—তাদের আর কখনো মানুষ ও দেশ ধ্বংস করার সুযোগ না দিয়ে? আমি কি তাদের নরকে পাঠিয়ে দেব?’
ট্রাম্প বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন নভেম্বরের নির্বাচনের পরপরই ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে। তবে এ পর্যন্ত তাঁর প্রচেষ্টা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি।
তাঁর বক্তব্যে পররাষ্ট্রনীতির এমন একটি কৌশলের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যেখানে আলোচনার দরজা খোলা রাখার পাশাপাশি ব্যাপক সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকি দেওয়া হয়।
পরে সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের বাইরে মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তিন ঘণ্টার একটি ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ বৈঠক করেছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ইরনাকে বলেন, কাতারের মধ্যস্থতায় এই আলোচনা হয়েছে।
কাতারের মাধ্যমে তেহরান তার শর্তগুলো জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসী কর্মকাণ্ড’ বন্ধ করা।
জাতিসংঘ ভবন থেকে বের হওয়ার সময় বিবিসি মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফকে বৈঠক সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলি তুলে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেন।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে উইটকফ নিশ্চিত করেন, দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা হয়েছে এবং তারা দিনভর দুই পক্ষের মধ্যে যাতায়াত করে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।
উইটকফ বলেন, ‘তারা সফলভাবে এক দফা আলোচনা শেষ করেছে। আমরা আশা করছি, এটি গঠনমূলক ও আশাব্যঞ্জক ফল বয়ে আনবে। মধ্যস্থতাকারীরা তাদের কাজ অব্যাহত রাখবেন।’

ভাষণে ট্রাম্প আবারও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের বিষয়ে তাঁর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কথা বলেন। তবে যুদ্ধ থামার কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ নেই। বরং দুই পক্ষই পরস্পরের ভূখণ্ডের গভীরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতাদের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি এবং আমরা এটি সমাধান করব। আমার মনে হয়, মানুষ যতটা বুঝতে পারছে, তার চেয়েও দ্রুত এটি ঘটবে।’
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, বুধবার নিউইয়র্কে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও ট্রাম্প তাঁর অবস্থান তুলে ধরেন। চীনের কাছে এআই ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব হারানোর আশঙ্কা নাকচ করে তিনি বলেন, আতঙ্ক ছড়ানো বা প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের কোনো ‘বিশ্ববাদী পরিকল্পনা’র কারণে যুক্তরাষ্ট্র তার নেতৃত্ব ছেড়ে দেবে না।
ট্রাম্প বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বরং ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ বলা উচিত।
তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম—এই শব্দটি শুনলে বিষয়টিকে নকল বা ভুয়া মনে হয়। এটি ভুয়া নয়, এটি আসলে অসাধারণ। তবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের বাইরে মঙ্গলবার ট্রাম্প ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতাদের সঙ্গে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর আওতায় উত্তর আটলান্টিকের দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
চুক্তিতে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দ্বীপটির আকাশসীমা ও ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রকে বিস্তৃত প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং এবং সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন।
আরব ও ইসলামি বিশ্বের অন্যান্য নেতাদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ‘আঞ্চলিক সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা এবং নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা সুসংহত করার উপায়’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে ইউএইর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন।
এর আগে জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে বিদায়ী ভাষণ দেন আন্তোনিও গুতেরেস। কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে তিনি বিশ্বের পরাশক্তিগুলোকে সতর্ক করে বলেন, ‘তাদের ক্ষমতা এতটা অপ্রতিদ্বন্দ্বী নয়।’
গুতেরেস বলেন, ‘আমাদের বিশ্বের বিভাজনরেখাগুলো আরও প্রশস্ত হচ্ছে।’ ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে তিনি এসব বিভাজনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমালোচনা করেন। তিনি জাতিসংঘকে ‘চরম বামপন্থী বৈশ্বিকতাবাদী আমলাদের এজেন্ডা’ অনুসরণের জন্য অভিযুক্ত করেন, যাদের ‘কেউ নির্বাচিত করেনি’।
এর বিপরীতে ট্রাম্প জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতুলনীয়’ সামরিক শক্তির ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, ‘কোনো বিশ্ব সরকার নেই।’
এ ছাড়া পশ্চিম গোলার্ধের যেকোনো স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য হুমকি তৈরি হতে দেওয়া হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘প্রয়োজনে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে আমাদের অতুলনীয় সামরিক শক্তি ব্যবহার করব।’
ট্রাম্প কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের বামপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিযোগ করেন। এসব সংগঠনের মধ্যে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি ইউএসএ, অ্যান্টিফা এবং ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার নাম উল্লেখ করেন।
ট্রাম্প কিউবাকে একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ করার পর কিউবার প্রতিনিধিদল সাধারণ পরিষদের সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যায় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
Author