
বাংলাদেশে বলটা ঠিক পাস করে দিয়ে দিয়েছে ভারতের কোর্টে। তারা কীভাবে সেটাকে ব্যবহার করবে, তা এখন তাদের ওপর নির্ভর করে।
তারা যদি মনে করে, শুধু আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই তারা চলবে, তাহলে তাদের নীতি হবে এক। আর যদি মনে করে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে দু’দেশের সম্পর্ক হবে, তাহলে নীতি হবে আরেক।
সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে, ভারত সরকার আওয়ামী লীগকে ছাড়া অন্যদের ঠিক একটা মানুষ মনে করে না।
একটা মানুষ, যার নেতৃত্বে ১৪শ মানুষ হত্যা হলো, যাকে দেশের মানুষ বিতাড়িত করল। যার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ উঠে।ছে, সেই মানুষটিকে ভারত আশ্রয় দিল, প্রশ্রয় দিল, সে দেশের মাটিতে বসে রাজনীতি করার অধিকারও দিল। বাহ্, কী মধুর সম্পর্ক! প্রেমিকার সঙ্গেও এত মধুর সম্পর্ক হয় কি না, সন্দেহ আছে।
হ্যাঁ, ভারত বিভিন্ন সময় কিছু বিদেশি ক্ষমতাচ্যুত নেতাকে তাদের দেশে আশ্রয় দিয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম দালাই লামা, আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহ আহমদজাই, মোহাম্মদ নাশিদ ও রাজা ত্রিভুবন শাহ। এদের আশ্রয় দেওয়া এবং এদের ঘিরে ভারতের রাজনীতির কারণ মূলত চীন, আফগানিস্তান, মালদ্বীপ ও নেপাল—কারও সঙ্গেই ভারতের সম্পর্ক আর বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি।
অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রায়ই একটি কথা বলতেন—ভালো না লাগলেও তো আর প্রতিবেশী পাল্টানো যাবে না। হ্যাঁ, সেটাই। আর এ কারণেই ভারত সীমান্তসংলগ্ন সবগুলো দেশের সঙ্গেই ভারতের সম্পর্ক যেন এক্স-প্রেমিকের মতো। সবকিছু জানে বলেই শত্রুতাও বেশি করে।
তুলনামূলকভাবে ভারতঘেরা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গেই তাদের সম্পর্ক ছিল মধুর। যদিও যারা ভারত গিয়েছেন, তারা হয়তো উপলব্ধি করেছেন যে ভারত এবং তার জনগণ বাংলাদেশকে ‘গুলশানে থাকা কড়াইল বস্তির মানুষের মতো’ সম্মান করে।
স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পেছনে ভারতের যে সহযোগিতা ছিল, তা মেনেই বাংলাদেশের মানুষ তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে গেলেও ভারত সম্মানজনক বন্ধুত্বের পরিবর্তে কর্তৃত্ববাদী প্রভুত্বের আসনে বসে সম্পর্ক তৈরির দিকেই বেশি মনোযোগী ছিল। এক্ষেত্রে তারা সফলও হয়েছে। স্বাধীনতার পরপরই শেখ মুজিবুর রহমান ভারতনির্ভরভাবে ক্ষমতা চালানো শুরু করলেন।
১৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সাত্তার ও জিয়াউর রহমান দিল্লির ওপারে তাকানো শুরু করলেন, সম্পর্ক তৈরি শুরু করলেন পৃথিবীর সঙ্গে। এটা ভারত ঠিক মেনে নিতে পারেনি।
১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় আসলেও তার কিচেন ক্যাবিনেটের নিয়ন্ত্রণ ছিল সম্পূর্ণ ভারতের কাছে।
’৯১-এ আবার ভারত নিয়ন্ত্রণ হারায় বাংলাদেশের ওপর। বেগম জিয়া ভারতের দাসত্ব মেনে নিলেন না। বাংলাদেশকে বিশ্ব দেখার সুযোগ করে দিলেন তাদের চোখে। এটা হয়তো ভারত পছন্দ করল না। এটা অনেকটা হুজুরদের প্রেমিকার মতো—প্রেমিকাকে অন্য কেউ দেখবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না।
১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ভারত আবারও বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব শুরু করে আওয়ামী লীগের মাধ্যমে। তারপরের ইতিহাস খুব বেশি দিনের পুরোনো নয়। এরপরের কথা হয়তো আপনার মনে আছে দিনের আলোর মতো করে।
২০১৬ সালে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যাওয়ার পর এক প্যানেল আলোচনায় কিছু লোককে যতবারই বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, তারা ততবারই বলেছে—ইন্ডিয়ার পাশে সাগরপাড়ের ছোট্ট জায়গাটি। সেদিন আমি তাদের কথা ভালোভাবে নিতে পারিনি। ভারতে পরিচয়ে আমি পরিচিত হতে চাইনি। কিন্তু ভারত বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে এমনভাবে উপস্থাপন করে যে বাংলাদেশ যেন তাদেরই অংশ।
অনেকেই বলে, হাসিনার কিচেন ক্যাবিনেট ছিল দিল্লিতে। হ্যাঁ, আমি হয়তো মানতে নারাজ হলেও আওয়ামী লীগ ও ভারতের কর্মকাণ্ড আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, তা সত্য—দিনের আলোর মতো সত্য।
সত্য তখন আরও জ্বলজ্বল করে ওঠে, যখন ১৪শ মানুষ হত্যার পর, দু’দেশের বন্দিবিনিময় চুক্তি থাকার পর, বাংলাদেশ সরকারের বারবার অনুরোধের পরও ভারতের রাজধানীতে বসে শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলন করার অনুমতি পান। যেখানে ১৩ বছরে নরেন্দ্র মোদি কোনো সংবাদ সম্মেলন করেননি, সেখানে হাসিনাকে ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশ নিয়ে ষড়যন্ত্র করার সব সুযোগ করে দেওয়া হয়। তখন তো এটা বলাই যায় যে, হাসিনা ক্ষমতা হারিয়ে পালিয়ে গেলেও তার কিচেন ক্যাবিনেট এখনও সক্রিয়।
এমন বাস্তবতায় ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে, বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে সামনে এগোতে চায়, তাহলে হাসিনাকে বন্দিবিনিময় চুক্তি অনুসরণ করে ফিরিয়ে দিয়ে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।
শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটিতে বসে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব—এ দেশের মানুষ মেনে নেবে না।
তারই বলটি ভারতকেই খেলতে হবে। সেটা কি গোলপোস্টে যাবে, নাকি বারের ওপর দিয়ে সীমানার বাইরে চলে যাবে?

Author