
শেখ হাসিনা যে ধাতুতে গড়া, তাতে এমনই হওয়ার কথা, যা এখন হচ্ছে। এমনই করার কথা, যা এখন সে করছে। নানারকম বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার প্রয়াস সে অব্যাহত রেখেছে। সবশেষ তথ্যমতে, আগামিকাল দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে তার কথা বলার কথা শোনা যাচ্ছে। তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে যাবতীয় সংশয় দূর করে দিয়েছে। সে জানিয়েছে, সংবাদ সম্মেলন হবে এবং সেখানে তার মা বক্তব্য দিবে। যদিও এটি এখনও খোলাসা করা হয়নি- শেখ হাসিনা সরাসরি উপস্থিত থেকে বক্তব্য দিবে না ভার্চুয়ালি যুক্ত হবে। আবার ভার্চুয়ালি যুক্ত হলে সে কি তার চেহারা দেখাবে, নাকি শুধু অডিও শোনাবে।
সে যা-ই হোক, এই সংবাদ সম্মেলনের উদ্দ্যেশ্য, বলা হচ্ছে- শেখ হাসিনার ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ এর ঘোষণা উপলক্ষে। এবং সেটির জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে সেই ৫ অগাস্ট বা ৩৬ জুলাইকে! এখানেই চলে আসে শেখ হাসিনার ‘ধাতু’ নিয়ে আলাপ। জুলাই গণহত্যা নিয়ে দুই বছরেও তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা, ন্যূনতম কোনো উপলব্ধিবোধ তৈরী হয়নি। বরং এখন সে দেশে ফেরার ঘোষণা দিচ্ছে এবং তার জন্য ছাত্র-জনতার বিজয়ের দিন ৩৬ জুলাইকেই বেছে নিয়েছে। যদিও এর আগেই সে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার একটি ঘোষণা দিয়ে রেখেছে।
শেখ হাসিনার এই ঘোষণা এবং তার সমান্তরালে তার আর যাবতীয় কর্মকান্ডকে দুইভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। প্রথমত এই ঘোষণাটি রাজনৈতিক। যদিও রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ এবং ছন্নছাড়া। নেতাকর্মীদের অনেকেই বিদেশে অবস্থান করছে। দেশের ভেতরে থাকা নেতাকর্মীরা হয় নিষ্ক্রিয়, না হয় গা-ঢাকা, না হয় অন্য দলের আশ্রয়ে আশ্রিত। আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর পদ ছাড়তে নারাজ শেখ হাসিনার সামনে তাই একদিকে যেমন দলের কর্মীদের উজ্জীবিত রাখার প্রয়োজন, অন্যদিকে তার নেতৃত্বেই যে দল ঘুরে দাঁড়াতে পারবে- সেই বড় চ্যালেন্জও তাকে নিতে হচ্ছে। ফলে মাঝেমধ্যেই তাকে তার কণ্ঠ শোনাতে হয়। সে যে আছে, তা তার কর্মীদের বিশ্বাস করাতে হয়। এবং সেসবের অংশ হিসেবেই তার এই আস্ফালন। সে নিজেও জানে সে ফিরবে না। এই বিবেচনায় ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত একজন আসামীর স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আসার ঘোষণার মধ্যে অভিনয় ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই এটি একটি কথার কথা। সে ফিরবে না।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি অন্যরকম। সে ফিরবে। তবে সেটি নির্ভর করছে অনেকগুলো প্রেক্ষাপট ও প্লটের উপর। আমার ধারণা, সেই প্রেক্ষাপট তৈরির কাজ চলছে। যদি পরিকল্পনামাফিক সবকিছু হয়; সে ফিরবে। প্রেক্ষাপট তৈরির কতগুলো জ্বলন্ত উদাহরণ আছে। তিন/চারদিন আগে এই জুলাই মাসেই রংপুরে এনসিপির শীর্ষ নেতারা বিএনপির হাতে মার খেল। বিএনপির হামলায় আলিফ নামের তরুণ ছেলেটি কী নির্মমভাবে চোখ হারালো। গতকাল এবং আজ সারাদিন দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবির এবং ছাত্রদলের মধ্যে অকল্পনীয় সংঘর্ষ হল। অকল্পনীয় এই অর্থে যে, একসময় ছাত্রলীগ যেভাবে ছাত্রদল/ছাত্রশিবিরের উপর নির্যাতন করত, এখন ছাত্রদল সেই পদ্ধতিতেই শিবিরের উপর নির্যাতন করছে। সেই হেলমেট। সেই দেশীয় অস্ত্র। সেই মুখের ভাষা এবং সেই একই মুখোশ।
তার মানে জুলাই-উত্তর বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো, যারা সুযোগ পেয়েছিল একটি নতুন ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের, আজ দুবছর যেতে না যেতেই তাদের মধ্যে অনৈক্যের সুর, বিভাজনের দেয়াল এবং অন্যকে নাই করে দেয়ার তীব্র বাসনা। অর্থাৎ বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি কারো মধ্যেই জুলাই চেতনায় নির্মিত সম্পর্কটি আর নেই। প্রশ্ন হল- এই বিভাজন এবং মারামারি- এ কি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা, নাকি কোনো গেম-প্ল্যানের অংশ। এরকম নিজেদের মধ্যে বিদ্রোহ-বিভাজনের মাত্রা বাড়তে বাড়তে কিংবা বাড়াতে বাড়াতে ডিসেম্বরের মধ্যেই এমন এক অরাজক অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি উদ্ভব হতে দেওয়া, যেখানে শেখ হাসিনার নির্বিঘ্ন আগমনের রাস্তা তৈরী হয়! না-হলে হুট করে এনসিপির নেতাদের আক্রমণ কেন? শিবিরের সঙ্গে ছাত্রদলের সংঘর্ষ কেন? হাসপাতালে ঢুকে শিবিরের আহত নেতাকর্মীদের আক্রমণ করার কি রাজনৈতিক প্রয়োজন ছাত্রদলের সামনে উপস্থিত ছিল? কোথাও দেখা গেল জামায়াতের কিছু প্রয়াত নেতৃবৃন্দের ছবিতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ঘৃণা-প্রকাশ। ঠিক কোন কারণে একই সঙ্গে দেশের বিভন্ন জায়গায় এমন আগ্রাসী ছাত্রদলের উদ্ভব হল?
সামনে কি এমন আরও অনেক ঘটনা ঘটবে? এমন কি অকল্পনীয় কিছু? প্রশ্ন আছে। উত্তর নেই। তবে খেলোয়াড়েরা সক্রিয়।

Author