
কড়াই গরম হচ্ছে। জন্ম নেবে এক নতুন রাষ্ট্র। তার প্রস্তুতি পর্বে নানা আয়োজন। আন্দোলন-রক্তপাত। নেতা শেখ মুজিবুর রহমানও তৈরি হচ্ছেন ক্রমশ।
সে সময় তার ফ্রেন্ড অ্যান্ড ফিলোসফার ‘মানিক ভাই’। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। ইত্তেফাক সম্পাদক। দিনের পর দিন তারা কথা বলেছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাসে ইত্তেফাকের ভূমিকা অবিস্মরণীয়।
কখনও কখনও এমন হয়। ইতিহাস তার পাতা খুলতে থাকে। একের পর এক ছবি তৈরি হয়। ক’দিন ধরে সংবাদপত্রের বিপরীত অতীত মনে আসছে বারবার। মুক্তিযুদ্ধে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখা সংবাদপত্র বিপর্যয়ের মুখে পড়ে খুব দ্রুত। সিনিয়র সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধুকে ‘মুজিব ভাই’ বলে ডাকতেন। কিন্তু তিনি চারটি সংবাদপত্র রেখে বাকি সব বন্ধ করে দেন। দ্রুতই অবশ্য পটপরিবর্তন হয়। মুক্তি পায় সংবাদপত্র। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত একটি মিশ্র ধারা ছিল। কখনও সংবাদমাধ্যম নিপীড়নের শিকার হয়েছে, কখনও স্বাধীনতা ভোগ করেছে।
বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান থাকাকালে সংবাদপত্রবিরোধী সব কালাকানুন বাতিল করে দেন। ২০০৬ সাল পর্যন্ত সংবাদপত্র মোটাদাগে অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করে। এ সময়ের মধ্যে বেসরকারি টেলিভিশনও যাত্রা শুরু করে। তবে টেলিভিশন সবসময়ই একটা চাপের মধ্যে ছিল।
ওয়ান-ইলেভেনের পর নতুন করে সংবাদমাধ্যম অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। নানা রং, ঢং আছে। পরিস্থিতির ওঠানামা আছে। তারপরও মোটাদাগে সংবাদমাধ্যমকে একটা সংকটের মধ্যে যেতে হয়েছে। এর মধ্যে বিরাট এক সাংবাদিক গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে। তারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে শেখ হাসিনার তোষামোদী করতে থাকে। এবং অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে মিডিয়া হয়ে ওঠে শাসকদের প্রশংসক। এতে মিডিয়া বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। সেখানে সত্য-গুজব মিলিয়ে নানা খবর প্রচার হতে থাকে।
শেখ হাসিনার পতনের পর ইউনূস জমানায় মিডিয়ার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তবে হামলা, মামলার ভয়ে মিডিয়া বিপর্যস্ত অবস্থাতেই ছিল। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ভবন আক্রান্ত হয়।

ঢাকায় পত্রিকা পড়ছেন মানুষ: ছবি এএফপি
এখানকার পরিস্থিতি কী? মোটাদাগে যদি জিজ্ঞেস করেন বলব, কেউ শাসকদের চটাতে চান না। এক সপ্তাহের উদাহরণ দেই। এ সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ইস্যু ছিল জ্বালানি এবং ওষুধনীতি। কিন্তু এ নিয়ে কোনো মিডিয়াতেই বিস্তারিত রিপোর্ট নেই, প্রশ্ন নেই। মিডিয়া দেখে মনে হয়, আর যাই হোক প্রধানমন্ত্রীর কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না!
গণতন্ত্র কি মারা যাচ্ছে? সাম্প্রতিক অতীতে পশ্চিমে এটা খুবই বড় প্রশ্ন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেভিড রাঞ্চিমান এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ‘কীভাবে গণতন্ত্রের বিনাশ হবে’ নামক বইয়ে। উপসংহারটা ইন্টারেস্টিং। তিনি লিখেছেন, গণতন্ত্র এখনই মারা যাচ্ছে না। কিন্তু এটি অনিশ্চিত মধ্যবয়সের সংকটে রয়েছে।
বাংলাদেশের মিডিয়া কি মারা যাচ্ছে? এ প্রশ্ন প্রায়ই মনে উঁকি দেয়। কেন? সম্ভবত, দেড়-দুই দশকের মধ্যে এখন সংবাদপত্রের সার্কুলেশন সবচেয়ে কম। মুদ্রিত পত্রিকার প্রতি মানুষের আকর্ষণ নেই বললেই চলে। অনেক বহুল আলোচিত পত্রিকা দিনে বিক্রি হয় পাঁচ-দশ হাজার কপি। সরকারি হিসেবে অবশ্য চলে লাখ লাখ। টিভিও মানুষ পর্দায় দেখছে না। যা দেখছেন সোশ্যাল মিডিয়াতে। অনলাইনের পাঠকও কমেছে।
এই পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো। এককভাবে একটি কারণকে চিহ্নিত করা কঠিন। কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা যায়।
সামাজিক মাধ্যমের বিস্তার সম্ভবত সবচেয়ে বড় কারণ। মানুষ এখন রিলস দেখছে। ঐতিহ্যগতভাবেই এ ভূমির মানুষের পড়ার অভ্যাস কম। রিলসের যুগে সেটা আরও কমেছে। ছাপা পত্রিকার সার্কুলেশন কমা অবশ্য সারা দুনিয়ারই ট্রেন্ড।
বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট প্রকট। শেখ হাসিনার শাসনামলে তা ছিল আরও তীব্র। সে ধারা এখনও কাটেনি। যে কারণে মানুষ সত্য খবরের জন্য অনেক সময় সামাজিক মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল।

ছবি: বিবিসি বাংলা
ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা, গভীর অনুসন্ধান আর বিশ্লেষণের ঘাটতি প্রকট। সরকারের নীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে মিডিয়া। বড় করপোরেট হাউজগুলোও পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। নিজস্ব মিডিয়াকে তারা ব্যবহার করছে ব্যক্তিস্বার্থে, উৎপাদন করছে মিথ্যা।
মিডিয়াতে দক্ষ মানুষের সংকটও প্রবল। যে কারণে মানসম্মত উৎপাদন কম। বেতন কাঠামো, অনিয়মিত বেতন ও চাকরির অনিশ্চয়তা এ পেশায় মেধাবীদের টানছে না। কাগজে-কলমে যে বেতন আছে তাও অনেকে পাচ্ছেন না। ১০-১২ হাজার টাকায় চাকরি শুরু করতে হয় বহু প্রতিষ্ঠানে। দলবাজ, অদক্ষ বহু মানুষ রয়েছেন নেতৃত্বে।
একটু পেছনে ফিরে তাকাই। ঢাকাই সিনেমার তখন রমরমা যুগ। নায়ক-নায়িকারা ছিলেন সুপারস্টার। টিকিট বিক্রি হতো কালোবাজারিতে। কিন্তু সময় কি নিষ্ঠুর! সেইসব সিনেমা হল এখন মৃত। ঈদের সময়টা কিছু সিনেমা মুক্তি পায়। টুকটাক কথাবার্তা হয়, এই যা।
এক দশক ধরে ঢাকার সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিত নায়িকা পরীমনি। কখনও বিয়ে, কখনও স্ক্যান্ডালে তাকে নিয়ে শিরোনাম হয়। সোশ্যাল মিডিয়াতেও ছবি আর ভিডিও দেন। কিন্তু সিনেমা? কতদিন যে তার সিনেমা মুক্তি পায় না কে জানে!
ঢাকার মিডিয়া কি মারা যাচ্ছে? না পরিস্থিতি এখনও এতো খারাপ নয়। তবে মিডিয়া খুব সম্ভবত আইসিইউতে আছে। ঢাকার মিডিয়া কি সিনেমার পরিণতির দিকে এগোচ্ছে? তাও হয়তো নয়। কিন্তু পরীমনির সঙ্গে মিডিয়ার একটা অদ্ভুত মিল দেখি। চাকচিক্য আছে, সৌন্দর্য আছে, কিন্তু দর্শক টানার ক্ষমতা নেই।
এ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে হবে। না হয় সামনে আরও অন্ধকার।
লেখকঃ সাংবাদিক, সহপ্রতিষ্ঠাতা, পলিসি পেপার

Author