
লিখতে বসেছি, মাননীয় প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর প্রতি। তবে বারবার মনে পড়ছে বহু শতাব্দী আগের দুটি ঘটনাপ্রবাহ।
আধুনিক গণতন্ত্রের আঁতুড়ঘর নগররাষ্ট্র এথেন্স। শুরুতে এর কার্যক্রম ছিল প্রত্যক্ষ। নাগরিকরা সরাসরি হাজির হয়ে মতামত জানাতেন। অংশ নিতেন আইন প্রণয়নে। কালের পরিক্রমায় গণতন্ত্রের ধাঁচ পাল্টেছে। জনগণ ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। তাঁদের হয়ে প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করেন। একে খলিফাতন্ত্রও বলা চলে। যদিও তা হোঁচট খেয়েছে বারবার। কখনও এ প্রক্রিয়ায় নামে চলেছে প্রতারণা । সে গল্প আলাদা।
গণতন্ত্র নামক জীবন ব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।” আর এর একটা চরম প্রকাশ আমরা দেখতে পাই ইংরেজ কবি জন মিল্টনের লেখায়।
“লাইসেন্সিং অর্ডার”। ১৬৪৩ সালে ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে পাস হয় এ কালো আইন। বলা হয়, যেকোনো বই বা লেখা প্রকাশের আগে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। এর তীব্র বিরোধিতা করে জন মিল্টন লেখেন ইতিহাসের অন্যতম প্রধান রচনা “অ্যারিওপ্যাজিটিকা”। বিবেকের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, তা প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে কঠোর সওয়াল করেন তিনি। মিল্টন লেখেন সেই অমর মহাবাক্য, “সকল স্বাধীনতার উপরে আমাকে বিবেক অনুযায়ী স্বাধীনভাবে জানার, বলার এবং তর্ক করার স্বাধীনতা দাও।” ("Give me the liberty to know, to utter, and to argue freely according to conscience, above all liberties.")
ক্ষণকালে মিল্টন উপেক্ষিত হলেও মহাকালে তিনি জয়ী হন।
এত শতাব্দী প্রাচীন ঘটনাপ্রবাহের কথা কেন উল্লেখ করছি, সেটা বলি।
গণতন্ত্র এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে মিডিয়া। মিডিয়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতীকও বটে। এ জন্য কালে কালে তাকে মূল্যও দিতে হয়েছে। তার ওপর আঘাত এসেছে। আইনি, বেআইনি দুইভাবেই।
দেশে দেশে মিডিয়ার রক্ষাকবচ হিসেবে বারবার এগিয়ে এসেছে বিচারালয়। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। জাদুকরি লেখায় পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে পাঠকদের মুগ্ধ করা সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী এরশাদ জমানায় সাপ্তাহিক খবরের কাগজে লিখেছিলেন, “দুর্নীতিপরায়ণদের উল্লাসের নৃত্য।” রূপকাশ্রয়ী যে লেখায় নাম না নিয়ে তীব্র আক্রমণ করা হয় এরশাদকে। সামরিক শাসকের রোষানলে পড়েন মতিউর রহমান চৌধুরী। তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। ভেঙে দেওয়া হয় তাঁর গাড়ি। বন্ধ করে দেওয়া হয় খবরের কাগজ। শুরু হয় আইনি লড়াই। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয় আমাদের উচ্চ আদালত। আদালতের রায়ে মুক্ত হয় সাপ্তাহিক খবরের কাগজ। এটি ছিল মিডিয়ার এক ঐতিহাসিক বিজয়।
এটা হয়তো আমরা অনেকে স্মরণ করি না। এরশাদের শাসনামল পর্যন্ত বাংলাদেশের সংবাদপত্র নানা কালাকানুনে বন্দি ছিল। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান থাকাকালে এসব কালো বিধান বাতিল করে দেন। বাংলাদেশের সংবাদপত্র তখন কার্যত স্বাধীন হয়ে যায়। প্রাক্তন এই প্রধান বিচারপতির কাছে ঋণী আমরা।
হাসিনার প্রথম জমানার একটা ঘটনাও স্মরণ করতে পারি। গভীর রাতে হাইকোর্ট জামিন দিয়েছিল ইনকিলাব পত্রিকার সম্পাদক এ. এম এম বাহাউদ্দীনকে।
বিপরীত কিছু নজিরও অবশ্য আছে। সেসব এখানে উল্লেখ করতে চাই না।
আজ অন্য একটি বিষয়ে মাননীয় প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। যেটা নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে ইতিমধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবসময়ই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মিডিয়া তথা সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার ছিল, যেটা মূলত বৃহদর্থে জনগণেরই প্রবেশাধিকার। জনগণের তথ্য জানার অধিকার সংরক্ষিত হয়েছে এতে। উন্মুক্ত আদালতে বিচার এবং জনগণের সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে গত সাতই জানুয়ারি থেকে আপিল বিভাগে সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এ নিয়ে সাংবাদিকরা সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কাছে বারবার অনুরোধ করলেও এতে কোনো কাজ হয়নি।
দেশের ইতিহাসে এটা একটা নজিরবিহীন ঘটনা। আরও একবার এটা উল্লেখ করতে চাই, এর সঙ্গে জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার, উন্মুক্ত আদালতে বিচারের মতো প্রশ্ন জড়িত। অন্য দেশগুলোর আদালত বিবেচনায় নিলেও এটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।
আজ আর বেশি কিছু লিখতে চাই না।
মাননীয় প্রধান বিচারপতির কাছে বিনীত আবেদন রাখতে চাই, সাংবাদিকরা যেন অবাধে সুপ্রিম কোর্টে প্রবেশ করতে পারেন, তা নিশ্চিতে ব্যবস্থা নিন। এ-সংক্রান্ত বাধা প্রত্যাহার করুন।
লেখক: সাংবাদিক

Author