
মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট যুক্ত হবার কথাতে এশিয়ার কুটনীতিতে নতুন আলোচনায় বাংলাদেশ। ২০ আগস্ট পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর জানিয়েছিলেন, দেশের স্বার্থ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির বাস্তবতা সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককের সাথে যুক্ত হওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বাংলাদেশ।
এমন বক্তবের জেরে নড়ে ছড়ে বসেছে প্রতিবেশী ভারত। তারা গভির ভাবে পর্যবেক্ষনের কথা বলেছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল।
মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন একটি সমীকরণের জন্ম দিয়েছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট। ৭ আগস্ট ২০২৬ মক্কায় সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তির মূল নীতি হলো—তিন দেশের কোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করার কথাও বলা হয়েছে।
চুক্তিটি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। তবে এই উপমা যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তবতা ততটা সরল নয়। ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট, সমন্বিত কমান্ড কাঠামো কিংবা সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট সামরিক প্রতিক্রিয়ার বাধ্যবাধকতা এখনো স্পষ্ট নয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দারও চুক্তিটিকে ‘সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়; বরং অন্যান্য দেশও এতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে নতুন একটি প্রশ্ন এসেছে: ঢাকা কি এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হবে?
২০ আগস্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ততকালীন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা বর্তমান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর জানিয়েছিলেন, দেশের নিজস্ব স্বার্থ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতা বিবেচনায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে ঘিরে কোনো অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে দেখছে।
মক্কা চুক্তি আসলে কী?
চুক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, তিন দেশের কোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজও মনে করছে, চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও এর বাস্তব প্রয়োগ এবং সদস্যদের প্রতিশ্রুতির সীমা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কেন এখন এই চুক্তি?
মক্কা চুক্তির সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের পর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের একটি প্রশ্ন হলো—সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা কতটা নির্ভরযোগ্য?
সৌদি আরবের দৃষ্টিকোণ থেকে তাই নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। তুরস্কের রয়েছে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প, বড় সামরিক সক্ষমতা এবং ন্যাটোর সদস্য হিসেবে দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা।
অন্যদিকে পাকিস্তান একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম দেশ এবং সৌদি আরবের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে।
ফলে তিন দেশের সক্ষমতা পরস্পরকে সম্পূরক করে: সৌদি আরব — অর্থনৈতিক শক্তি ও জ্বালানি প্রভাব, তুরস্ক — প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সামরিক শিল্প, পাকিস্তান — সামরিক অভিজ্ঞতা ও পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা
এই তিনটি শক্তিকে এক জায়গায় আনার ফলে একটি নতুন আঞ্চলিক প্রতিরোধ কাঠামোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এটি কি ইরানবিরোধী জোট?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রশ্ন। মক্কা চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানকে কোনো শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেনি। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান স্পষ্ট বলেছেন, চুক্তিতে ইরান বা অন্য কোনো দেশকে অভিন্ন হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। পাকিস্তানও চুক্তিটিকে ‘সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক’ বলে ঘোষণা করেছে।
কিন্তু ভূরাজনীতিতে শুধু ঘোষণাই সবকিছু নয়।
চুক্তিটি এমন এক সময়ে হয়েছে যখন সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চল ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়েও সৌদি আরব ও তুরস্কের উদ্বেগ রয়েছে।
তাই মক্কা চুক্তিকে সরাসরি ‘ইরানবিরোধী জোট’ বলা ঠিক হবে না। বরং এটিকে বলা যায়— ইরান, ইসরায়েল এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক অনিশ্চয়তার মধ্যে একটি নতুন আঞ্চলিক প্রতিরোধ কাঠামো গড়ে তোলার প্রচেষ্টা।
পাকিস্তানের জন্য এর গুরুত্ব কতটা?
মক্কা চুক্তির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হতে পারে পাকিস্তান। দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান অর্থনৈতিক সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা সমস্যার সঙ্গে লড়ছে। একই সময়ে দেশটির সামরিক বাহিনী দেশের রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক পাকিস্তানের জন্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুই দেশ একটি Strategic Mutual Defence Agreement-ও অনুমোদন করেছিল। মক্কা চুক্তি সেই দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাকে আরও বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে।
পাকিস্তানের জন্য মক্কা চুক্তির তিনটি সম্ভাব্য সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, এটি মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ও অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। দ্বিতীয়ত, এই চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পাবে, যা দেশটির সামরিক নেতৃত্বের মর্যাদা ও প্রভাব বাড়াতে পারে। তৃতীয়ত, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারিত হলে পাকিস্তান নতুন বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং আর্থিক সহায়তার সুযোগ পেতে পারে।
তবে এসব সম্ভাব্য সুবিধার পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। মক্কা চুক্তি পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংকট, বৈদেশিক ঋণের চাপ, রাজস্ব ঘাটতি কিংবা দুর্বল উৎপাদনশীলতার মতো মৌলিক সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। ফলে চুক্তিটি পাকিস্তানের কূটনৈতিক ও সামরিক অবস্থানকে শক্তিশালী করলেও, দেশটির দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বিকল্প হয়ে উঠবে না।
বাংলাদেশের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের জন্য মক্কা চুক্তির গুরুত্ব মূলত তিনটি স্তরে— নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি । বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্য-সংযুক্ত বাণিজ্যিক রুটের সংযোগস্থলে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় যেকোনো বড় পরিবর্তন বাংলাদেশের ওপর সরাসরি বা পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত বা নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে জ্বালানি সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এসব বিষয় শুধু পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্ন নয়; এগুলো জাতীয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
একই সঙ্গে মক্কা চুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, সৌদি বিনিয়োগ, তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন করে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়গুলোও যুক্ত। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক নাগরিক উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত এবং তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। অন্যদিকে তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। ফলে মক্কা চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সামরিক জোটের বিষয় হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ কৌশলগত তাৎপর্য বোঝা যাবে না; বরং এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য, শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক পরিবর্তন।
সৌদি -বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন দিগন্ত হতে পারে
বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্ক কেবল ধর্মীয় আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এটি শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও উন্নয়ন সহযোগিতার ওপরও দাঁড়িয়ে আছে।
২০২৫ সালে ৭ লাখ ৫২ হাজারের বেশি বাংলাদেশি সৌদি আরবে কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে এসেছে প্রায় ৫.২৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স , যা ওই সময়ে বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ১৬ শতাংশ।
অর্থাৎ সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি কূটনৈতিক অংশীদার নয়; এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা, শ্রমবাজার এবং লাখ লাখ পরিবারের আয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার।
সুতরাং সৌদি নেতৃত্বাধীন কোনো নতুন আঞ্চলিক কাঠামো বাংলাদেশের জন্য অপ্রাসঙ্গিক নয়।
তুরস্ক-বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন স্তম্ভ
তুরস্ক বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প বিশেষ করে ড্রোন, নৌযান, সাঁজোয়া যান ও বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক সরঞ্জামের ক্ষেত্রে দ্রুত সক্ষমতা অর্জন করেছে।
বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং যৌথ উৎপাদনে আরও এগোতে চায়, তাহলে মক্কা কাঠামো একটি অতিরিক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে। তবে এখানেও সতর্কতা জরুরি।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা জোট—এক জিনিস নয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন সামরিক প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি হতে পারে; কিন্তু তার জন্য কোনো সামরিক জোটের সদস্য হওয়া অপরিহার্য নয়।
ভারত কোনো এত উদ্বিগ্ন?
বাংলাদেশ মক্কা চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথাতে সবচেয়ে বেশি কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে ভারতে। কারণ ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে বৈরিতাপূর্ণ।
একই সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। তবে এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত ঝুঁকি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও সীমান্ত নিরাপত্তার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সামনে কোন পথ খোলা
মক্কা চুক্তিকে ঘিরে বাংলাদেশের সামনে মূলত তিনটি কৌশলগত পথ খোলা রয়েছে। প্রথম পথ হলো সরাসরি এই প্রতিরক্ষা জোটের সদস্য হওয়া। বাংলাদেশ যদি এতে যোগ দেয়, তাহলে সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতা থেকে সুবিধা নেওয়া এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা আলোচনায় বাংলাদেশের ভূমিকাও বাড়তে পারে। তবে এই পথের ঝুঁকিও কম নয়। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে, ইরানসহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির কাছে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে ভুল বার্তা যেতে পারে এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্ন উঠতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে ভবিষ্যতের আঞ্চলিক সংঘাত বা সংকটে বাংলাদেশের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক দায়বদ্ধতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
দ্বিতীয় পথ হতে পারে সরাসরি সদস্য না হয়ে পর্যবেক্ষক বা সহযোগী অংশীদার হিসেবে এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকা। বাংলাদেশের জন্য এটি তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকির একটি বিকল্প। এ ক্ষেত্রে ঢাকা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতায় না জড়িয়েও যৌথ সামরিক মহড়া, দুর্যোগ মোকাবিলা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, শান্তিরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারে।
এতে মক্কা চুক্তির সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোর সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থেকে বাংলাদেশ সুবিধা নিতে পারবে, কিন্তু কোনো সদস্য দেশের ওপর হামলা হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার মতো ঝুঁকি নিতে হবে না।
তৃতীয় পথ হলো আনুষ্ঠানিক কোনো সামরিক জোটে না গিয়ে অর্থনৈতিক, জ্বালানি, বাণিজ্যিক ও দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বাড়ানো। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও কৌশলগতভাবে ভারসাম্যপূর্ণ পথ। ঢাকা সৌদি আরবের সঙ্গে বিনিয়োগ, জ্বালানি ও শ্রমবাজারের সম্পর্ক গভীর করতে পারে; তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়াতে পারে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করতে পারে।
কিন্তু এসব সহযোগিতার জন্য আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যুক্ত হওয়া অপরিহার্য নয়। বরং এ ধরনের একটি অবস্থান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বহুমুখী, ভারসাম্যপূর্ণ ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে—কোনো নির্দিষ্ট সামরিক ব্লকের অংশ না হয়ে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের আলোকে বিবেচনা করা।
বাংলাদেশের ও উপসাগরীয় অর্থনীতি
বাংলাদেশের জন্য মক্কা চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়তো সামরিক নয়— অর্থনৈতিক । সৌদি আরব, ইউএই, কাতার, ওমান, কুয়েত ও বাহরাইন বাংলাদেশের শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, জ্বালানি ও বিনিয়োগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
সম্প্রতি কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশ জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের উচিত ‘মক্কা চুক্তিতে যোগ দেব কি না’—এই একমাত্র প্রশ্নে আটকে না থেকে আরও বড় প্রশ্ন করা: কীভাবে উপসাগরীয় অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সংযোগকে কৌশলগত সম্পদে পরিণত করা যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বাংলাদেশের জন্য উপসাগরীয় সম্পর্ককে শুধু রেমিট্যান্স বা শ্রমবাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং এটিকে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। প্রথমত, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে আরও কার্যকরভাবে প্রস্তুত করতে হবে।
একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি তেল ও গ্যাস আমদানি চুক্তির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উপসাগরীয় বিনিয়োগ আনার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। বাংলাদেশের বন্দর, গভীর সমুদ্রবন্দর, লজিস্টিকস ও আঞ্চলিক যোগাযোগ অবকাঠামোতেও এসব দেশের বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব। এর সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাত শিল্প, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
একইভাবে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ—মানবসম্পদ—কে উপসাগরীয় শ্রমবাজারের জন্য আরও দক্ষ করে তোলা জরুরি। শুধু স্বল্পদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর পরিবর্তে চিকিৎসা, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, হসপিটালিটি ও অন্যান্য উচ্চদক্ষ পেশায় বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বাজার সম্প্রসারণ করতে হবে। এর পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে রেমিট্যান্সনির্ভর সম্পর্ক ধীরে ধীরে বিনিয়োগ ও উৎপাদননির্ভর সম্পর্কে রূপ নিতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু উপসাগর থেকে অর্থ আনা নয়; উপসাগরীয় পুঁজি, প্রযুক্তি, জ্বালানি, বাজার ও দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে যুক্ত করা।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব পরীক্ষা
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে মক্কা চুক্তিকে ঘিরে ঢাকার সিদ্ধান্তে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর বলেছেন, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেওয়া হবে। এই অবস্থান থেকেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল প্রশ্নটি নির্ধারণ করা উচিত। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—ভারত কী ভাববে, পাকিস্তান কী চাইছে কিংবা সৌদি আরব কোন অবস্থানকে সমর্থন করছে। প্রথম এবং প্রধান প্রশ্ন হওয়া উচিত— বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ কী এবং কোন সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতাকে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী করবে? মক্কা চুক্তির মতো কোনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোকে তাই ধর্মীয় বা পুরোনো মিত্রতার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করতে হবে।
এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে সামুদ্রিক নিরাপত্তা। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ সমুদ্রপথনির্ভর এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ভারত মহাসাগর, আরব সাগর, লোহিত সাগর ও সুয়েজ রুট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতগুলো দেখিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের একটি নিরাপত্তা সংকট খুব দ্রুত জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলে বাংলাদেশের কাছে উপসাগরীয় নিরাপত্তা কোনো দূরের ভূরাজনৈতিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে জ্বালানি মূল্য, আমদানি ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও খাদ্য নিরাপত্তা । এ কারণে বাংলাদেশের উপসাগরীয় নীতিতে সামরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি সমুদ্রপথ, জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যিক নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
এই কৌশলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ইউএই। মক্কা চুক্তির আলোচনায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে ঘিরে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তার বাইরে ইউএইকে রেখে বাংলাদেশের জন্য পূর্ণাঙ্গ উপসাগরীয় কৌশল তৈরি করা কঠিন। ইউএইর বন্দর, লজিস্টিকস, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা উপসাগরীয় অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ফুজাইরাহর অবস্থান হরমুজ প্রণালির বাইরে ওমান উপসাগরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করায় এর কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
তাই বাংলাদেশের উপসাগরীয় নীতি শুধু সৌদি আরবকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয়; সৌদি আরব, ইউএই, কাতার, ওমান, কুয়েত ও বাহরাইন—পুরো জিসিসি কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ককে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। একইভাবে ইরানকেও এই কৌশল থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। ইরানকে কোনো নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর কারণে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে তা ঢাকার দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিকে সংকুচিত করবে। বরং সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ, ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা—সবগুলোকে একই কৌশলগত কাঠামোর মধ্যে রাখতে হবে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ এখনই মক্কা চুক্তিতে যোগ দেবে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার কারণ নেই। বরং ঢাকার সামনে তিনটি পথ রয়েছে। প্রথমত, সরাসরি সদস্য হয়ে সামরিক দায়বদ্ধতা গ্রহণ করা; দ্বিতীয়ত, পর্যবেক্ষক বা সহযোগী অংশীদার হিসেবে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় যুক্ত হওয়া; তৃতীয়ত, কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে না গিয়ে সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানো। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় পথের সমন্বয়ই তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হতে পারে। এতে বাংলাদেশ নতুন অংশীদারদের কাছ থেকে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিতে পারবে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক ব্লকের অংশ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি কম থাকবে। অর্থাৎ, ঢাকার দরজা খোলা রাখা উচিত, কিন্তু কোনো দরজায় তাড়াহুড়ো করে ঢুকে পড়া নয়।
নীতিগতভাবে বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত ‘Gulf Strategy’ । এই কৌশলের কেন্দ্রে শুধু প্রতিরক্ষা থাকবে না; থাকবে সৌদি ও অন্যান্য উপসাগরীয় বিনিয়োগ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে পুঁজি আনা, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বন্দর ও লজিস্টিকস, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি, ফার্মাসিউটিক্যালস, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর। উপসাগরীয় সম্পর্ককে শুধু রেমিট্যান্সনির্ভর শ্রমবাজারের সম্পর্ক থেকে বের করে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উৎপাদন ও বাণিজ্যনির্ভর অংশীদারিত্বে নিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানো যেতে পারে, তবে কোনো ক্ষেত্রেই এসব সম্পর্ককে ভারতবিরোধী বা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে কৌশলগত জোট হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ কোনো সামরিক জোট নয়— তার ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষমতা।
মক্কা চুক্তি তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি সামরিক জোটে যোগ দেওয়া বা না-দেওয়ার প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের সামনে বৃহত্তর একটি কৌশলগত সিদ্ধান্তের সুযোগ তৈরি করেছে— বাংলাদেশ কি অন্যের নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হবে, নাকি নিজের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করে একটি স্বতন্ত্র কৌশলগত অবস্থান তৈরি করবে? ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এই প্রশ্নের উত্তর কতটা বাস্তববাদী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদি করা যায় তার ওপর।
Author