৭৮ শতাংশ কারখানা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে

বাংলাদেশের অধিকাংশ পোশাক কারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে ওয়ালমার্ট, গ্যাপ ও নেক্সটের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সরবরাহকারী ৪এ ইয়ার্ন ডাইংয়ে আপাতত উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। সেখানে শ্রমিকেরা নিরবচ্ছিন্নভাবে হুডি তৈরি করছেন এবং পোশাকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লোগো সংযুক্ত করছেন।
২০১৯ সাল থেকে ৪এ নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করে আসছে। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎও রয়েছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে উঠেছে। চীনের পর বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট দেশে জ্বালানি সংকটকে আরও তীব্র করেছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ প্রাকৃতিক গ্যাস, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলনির্ভর।
সম্প্রতি ১৩৪টি নিট পোশাক কারখানার ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, আগস্টের শেষ দিক থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ৫৫ শতাংশ কারখানা ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডার বাতিল বা কমে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। ৭৮ শতাংশ কারখানা আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। এসব কারখানা পণ্য পাঠাতে দেরি এবং ক্রেতাদের দেওয়া অর্ডারে ক্ষেত্রে মূল্যছাড় দেওয়ার কথাও জানিয়েছে।
তবে আপাতত ৪এ-তে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ঢাকার পাশেই অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কর্মী কাজ করেন। কারখানাটি মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করে। বাকি বিদ্যুতের বেশির ভাগই নিজস্ব গ্যাস ও ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপাদন করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম মালিক আবদুল্লাহ হিল নাকিব বলেন, ‘আমরা কখনোই একটি মাত্র জ্বালানি উৎসের ওপর নির্ভর করিনি। সবকিছুরই বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছি। আমাদের এক ধরনের নিশ্চয়তা দরকার। তবে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে। প্রথমে তেলের সংকট ছিল, এরপর শুরু হয়েছে গ্যাসের সংকট।’
ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ৪এ-এর উৎপাদন ব্যয় ২ থেকে ৩ শতাংশ বেড়েছে। নাকিবের হিসাবে, এতে প্রতিষ্ঠানটির মাসিক জ্বালানি ব্যয় প্রায় ৫০ লাখ টাকা বা ৪০ হাজার ৯৫০ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে।
সোমবার জ্বালানির দাম সর্বোচ্চ ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ানোর পর পোশাক কারখানাগুলোর ওপর চাপ আরও বেড়েছে। বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে জ্বালানির দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ সরকার। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর ওই সংঘাতের সূত্রপাত হয়।
ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন কমাতে ৪এ শিল্পকারখানা-উপযোগী বড় আকারের একটি ব্যাটারি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। বিদ্যুতের বিভিন্ন উৎসে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে এই ব্যাটারির সাহায্যে কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হবে।
নাকিব বলেন, ‘আমরা অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে পারছি। কিন্তু সব কারখানার পক্ষে তা সম্ভব নয়।’ তাঁর কারখানার ছাদ প্রায় পুরোপুরিই সৌর প্যানেলে ঢাকা।
গত সপ্তাহে বাংলাদেশের বিদ্যুৎমন্ত্রীও বলেছেন, এলএনজি আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের শিল্পোৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়ছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাট বাড়ছে এবং গ্যাসে বেশি ভর্তুকি দেওয়ার কারণে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় কমাতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশ। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করছে এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এর অবদান প্রায় ১০ শতাংশ।
জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে কিছু পোশাক প্রস্তুতকারক অতিরিক্ত ব্যয় করে আকাশপথে পণ্য পাঠাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার ক্রেতাদের মূল্যছাড় দিচ্ছেন।
পোশাক রপ্তানিকারক শাহিদুল্লাহ আজিম বলেন, ‘আমাদের মুনাফার পরিমাণ এমনিতেই খুব কম। জ্বালানির দাম বাড়ায় সেই মুনাফা আরও কমে যাবে। প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রেখে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির চাপ সামাল দেওয়া আমাদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।’
আজিম জানান, কানাডার একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ২৫ হাজার পোশাকের অর্ডার দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ৮ হাজার পণ্যের অর্ডার দিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়াকেই এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, প্রতিষ্ঠানটি এইচঅ্যান্ডএম (H&M)‘সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক সরবরাহ করে। তাঁর মতে, কোম্পানিগুলো হয়তো বাড়তি জ্বালানি ব্যয় বহন করতে পারবে। কিন্তু গ্যাস সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট আরও বড় উদ্বেগের কারণ। কারণ ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোতে এ ধরনের সংকট তুলনামূলকভাবে কম তীব্র।
তিনি বলেন, ‘অন্যান্য সোর্সিং দেশের সঙ্গে আমরা আমাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারব, নাকি তাদের কাছে বাজার হারাব—তা নির্ভর করবে আমরা পরিস্থিতি কতটা দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে পারি তার ওপর।’
Author