
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও উত্তাপ বাড়ছে। একদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মাঠের তৎপরতা, অন্যদিকে জুলাই সনদের বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধী জোটের ধারাবাহিক আন্দোলন—এর মধ্যেই রাজধানীতে একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব ঘটনা এমন একটি সময়ে ঘটছে যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সময়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে এবং ১৯ সেপ্টেম্বর জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ঢাকা-রংপুর লংমার্চ কর্মসূচি পালন করছে। ফলে আগামী কয়েক দিন রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা—দুই দিক থেকেই সরকারকে বাড়তি চাপ মোকাবিলা করতে হতে পারে।
রাজধানীতে ককটেল, বাসে আগুন
শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের হিসাবে ছয় থেকে নয়টি স্থানে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। যাত্রাবাড়ী, মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালী, মগবাজার, বাবুবাজারসহ কয়েকটি এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে। যাত্রাবাড়ীতে বিস্ফোরণের ঘটনায় একজন অটোরিকশাচালক আহত হয়েছেন। একই রাতে কাফরুল থানার সামনে একটি বাসেও আগুন দেওয়া হয়।
ঘটনাগুলোর ধরন এবং সময়ের ব্যবধান স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করেছে—এগুলো কি বিচ্ছিন্ন নাশকতার ঘটনা, নাকি একই ধরনের কোনো সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ?
এ মুহূর্তে পুলিশের পক্ষ থেকে এসব ঘটনার জন্য নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক সংগঠনকে দায়ী করা হয়নি। ফলে আওয়ামী লীগ কিংবা অন্য কোনো পক্ষ সরাসরি এসব ঘটনায় জড়িত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তদন্তের ফলাফল পাওয়া জরুরি।
তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজপথে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ। ২০২৫ সালের মে মাসে সরকার দলটির সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে; পরবর্তীতে এ নিষেধাজ্ঞার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা একটি রিটও হাইকোর্ট খারিজ করেছে।
এরপরও সেপ্টেম্বরজুড়ে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নামে মিছিল ও রাজনৈতিক কর্মসূচির খবর পাওয়া যাচ্ছে। ১১ সেপ্টেম্বর গুলশানে আওয়ামী লীগের একটি মিছিলে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় পুলিশ দুজনকে আটক করে এবং ঘটনাস্থল থেকে আরও পাঁচটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধারের কথা জানায়।
১২ সেপ্টেম্বর একই ধরনের আরেকটি ঘটনায় ৩২ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের মাঠে ফেরার চেষ্টা যে সরকারের জন্য একটি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুবলীগের ঘোষিত ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত দলীয় বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০ সেপ্টেম্বর এই কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং তার আগে ১৬ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—এই কর্মসূচি কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি রাজধানীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করার চেষ্টা হবে?
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা
পরিস্থিতিকে আরও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর করে তুলেছে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা আগামী ১৪ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন।
তবে এটি এখন পর্যন্ত একটি ঘোষিত পরিকল্পনা; বাস্তবে তিনি ওই তারিখে দেশে ফিরবেন কি না, সেটি ভবিষ্যতের বিষয়।
তার ওপর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক কার্যক্রম, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক নিষেধাজ্ঞা এবং দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো—সব মিলিয়ে তাঁর দেশে ফেরার প্রশ্নটি নিছক ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ফলে শেখ হাসিনার ঘোষিত প্রত্যাবর্তনের তারিখ সামনে রেখে আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ড বাড়ে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠছে।
জিয়াউল আহসানের বিচারও আলোচনায়
এর পাশাপাশি সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিচারও রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিরুদ্ধে ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ১০৪ জনের গুম ও হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে তিনি ট্রাইব্যুনালে নিজের বিরুদ্ধে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ হওয়ার অভিযোগ তোলেন। তাঁর আইনজীবীও মামলার শুনানিতে একই ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করেন।
এই বিচারকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা থাকলেও, বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি রাজধানীর সাম্প্রতিক নাশকতার যোগসূত্র এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন—একই সময়ে একাধিক রাজনৈতিক ঘটনা ঘটলেই সেগুলো একই পরিকল্পনার অংশ, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তবে রাজনৈতিক উত্তেজনার সামগ্রিক পরিবেশে প্রতিটি ঘটনা অন্য ঘটনাকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রশাসন কি আগের কাঠামোতেই চলছে?
সরকারের জন্য সবচেয়ে জটিল প্রশ্নগুলোর একটি সম্ভবত এখানেই। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক কাঠামোর বড় একটি অংশ এখনো রাষ্ট্র পরিচালনায় রয়েছে। সরকার পরিবর্তন হয়েছে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু আমলাতন্ত্র, পুলিশ, প্রশাসন এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বড় অংশের কর্মকর্তা-কাঠামো একদিনে বদলে যায়নি।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—নতুন রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামোর সমন্বয় কতটা কার্যকর?
আরও বড় প্রশ্ন হলো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে প্রশাসন সেটিকে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষভাবে মোকাবিলা করতে পারছে কি না।
ক্যান্টনমেন্ট ও গুলশান থানার কর্মকর্তাদের কথোপকথনের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলে আলোচনা রয়েছে। অডিওগুলো নিয়েই এখন চলছে জোর আলোচনা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কমান্ড কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ক্যান্টনমেন্ট ও গুলশান থানার কর্মকর্তাদের কথোপকথনে বুঝাযায় আওয়মীলীগকে তারা মিছিলের সুযোগ দিয়েছে। এবং আওয়ামীলীগ নেত্রী দেশে আসলে প্রশাসন তেমন কোন সমস্যা তৈরী করতে পরবে না। সরকারের জন্য এখানেই বড় পরীক্ষা—রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো অংশ রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট কি না, সেটি নিয়ে যেন জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি না হয়।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর প্রশ্নগুলোর একটি হলো—সরকার পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো কতটা পরিবর্তিত হয়েছে? রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলেছে, ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে বিশাল আমলাতান্ত্রিক ও আইনশৃঙ্খলা কাঠামো প্রয়োজন, সেটি তো একদিনে বদলে যায় না। ফলে নতুন সরকারের সামনে পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট ও গুলশান—দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ থানা। কূটনৈতিক এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বসবাস এবং রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় এসব এলাকার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্যান্টনমেন্ট ও গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নামে কথোপকথনের অডিও ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে আওয়ামী লীগের মিছিল ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথাবার্তার দাবি করা হচ্ছে।
অডিওগুলোর বিষয়বস্তু একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি মোকাবিলায় তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা পেশাদার ও নিরপেক্ষ?
এটি কেবল দুটি থানার ওসির প্রশ্ন নয়। বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থার প্রশ্ন। আওয়ামী লীগ আমলের প্রশাসনিক কাঠামো, বিএনপির শাসন।
বর্তমান সরকারের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—বিএনপি ক্ষমতায় এলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের বড় অংশ আগের প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই কাজ করছে।
একটি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সচিবালয়, মাঠ প্রশাসন, পুলিশ, বিভিন্ন অধিদপ্তর, রাষ্ট্রীয় সংস্থা কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে নতুন লোক বসানো সম্ভব নয়। বরং রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পূর্ববর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় অংশকেই নতুন সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি হয়।
মাঠে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট
সরকারের ওপর চাপ শুধু আওয়ামী লীগের দিক থেকে নয়। বিগত ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে রাজ পথে এক সাথে আন্দোলন করা এবং জুলাই আন্দোলনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখা জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধী জোট ইতোমধ্যে ধারাবাহিক কর্মসূচি শুরু করেছে। ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের পর ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর লংমার্চের কর্মসূচি পালন করছে হয়েছে। জোটের ঘোষিত দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার কাউন্সিল গঠন ও সংস্কার বাস্তবায়ন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সারের সংকট সমাধান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ বন্ধ এবং দুর্নীতি-চাঁদাবাজি-দখলদারিত্ব বন্ধ করা।
১৯ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-রংপুর লংমার্চে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, কর্মসূচির লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট দলীয় দাবি নয়; বরং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং দুর্নীতি ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। অর্থাৎ সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে এখন দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
একদিকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ—যারা সাংগঠনিক অস্তিত্ব ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে সংসদের বিরোধী জোট—যারা বৈধ রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের ওপর নীতিগত ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে।
দুই পক্ষের রাজনৈতিক লক্ষ্য এক নয়। কিন্তু উভয়ের কর্মসূচি একই সময়ে তীব্র হলে সরকারের জন্য আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর: গুরুত্বপূর্ণ সময়েই বাইরে সরকারপ্রধান
এই রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন। তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের জাতীয় বক্তব্য দেবেন ২৪ সেপ্টেম্বর। সরকারি সূত্র ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সফরটি সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে এবং ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে তাঁর দেশে ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরটি তাঁর সরকারের জন্য কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘে এটি হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম বক্তব্য। সফরে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির দিক থেকে সময়টি বেশ সংবেদনশীল।
২০ সেপ্টেম্বর যুবলীগের ঘোষিত ‘ঢাকা লকডাউন’।
১৯ সেপ্টেম্বর জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ।
১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে ধারাবাহিক ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন।
এরপর প্রধানমন্ত্রী ২১ সেপ্টেম্বর বিদেশে যাচ্ছেন।
এই সময়সূচির মধ্যে সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—প্রধানমন্ত্রী বিদেশে থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
সরকারের পরীক্ষা কোথায়?
বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু ‘আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র’ অথবা শুধু ‘বিরোধীদের আন্দোলন’ হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত চরিত্র বোঝা কঠিন হতে পারে। কারণ সরকারের সামনে একই সঙ্গে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
প্রথমত, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতা মোকাবিলা করা।
দ্বিতীয়ত, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি মোকাবিলায় আইনসম্মত পদ্ধতি বজায় রাখা।
তৃতীয়ত, রাজধানীর নাশকতা ও জননিরাপত্তার বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা।
চতুর্থত, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে কোনো সন্দেহ তৈরি হলে তার দ্রুত অবসান ঘটানো।
পঞ্চমত, প্রধানমন্ত্রী বিদেশে থাকা অবস্থায় সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
‘অস্থিরতা’ কার স্বার্থে—আর দায় কার?
রাজনৈতিক উত্তেজনার সময় সবচেয়ে সহজ কাজ হলো প্রতিটি নাশকতার ঘটনার জন্য প্রতিপক্ষকে দায়ী করা। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো—অভিযোগ নয়, প্রমাণ।
রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে আগুন, ঝটিকা মিছিল এবং ‘লকডাউন’ কর্মসূচি—এসব ঘটনা যদি ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে, তাহলে জনমনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে সহিংসতা বা নাশকতা হলে সেটিও গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিসর সংকুচিত করে।
আবার সরকার যদি বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতাকে একই মাপকাঠিতে দেখে, তাতেও রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে।
তাই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন আইনের সমান প্রয়োগ।
কে কোন দলের, কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের কিংবা অতীতে কোন সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত তিনি বর্তমানে কী করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে কী প্রমাণ রয়েছে।
সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিন
বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য আগামী কয়েক দিন তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০ সেপ্টেম্বর—যুবলীগের ঘোষিত ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি।
২১ সেপ্টেম্বর—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক যাত্রা।
২৪ সেপ্টেম্বর—জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য।
২৫ সেপ্টেম্বর—সফর সংক্ষিপ্ত হলে প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময়।
আর ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ সামনে রেখে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাও ইতোমধ্যে রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে—সরকার কি এই উত্তেজনাকে রাজনৈতিক সংঘাতে পরিণত হতে দেবে, নাকি আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখবে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের জন্য নয়; আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ সব রাজনৈতিক শক্তির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের অংশ হতে পারে, কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি সহিংসতা, নাশকতা কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থায় রূপ নেয়, তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত কোনো একক দলের ওপর পড়ে না—পড়ে পুরো রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষের ওপর।
Author