প্রযুক্তিনির্ভর পাচার, ভুয়া চাকরির ফাঁদ ও দুর্বল বিচারব্যবস্থার সামনে বাংলাদেশের নতুন আইন

প্রতি বছর ৩০ জুলাই বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব মানবপাচার প্রতিরোধ দিবস। এবারও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে আয়োজিত এক জাতীয় সংলাপে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে পরিচালিত আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও স্ক্যাম চক্রের বিরুদ্ধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সময়ের সঙ্গে মানবপাচারের ধরন বদলেছে। একসময় নদী, সীমান্ত ও দালালচক্র ছিল পাচারের প্রধান মাধ্যম; এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, অনলাইন নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা। সরকারও পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এত আইন, নীতি ও সরকারি অঙ্গীকারের পরও বাংলাদেশে মানবপাচার বন্ধ হচ্ছে না কেন?
মানবপাচার নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই কাজ করছি। ২০১০ সালের দিকে টেকনাফে প্রথম মানবপাচারের নিউজ করার জন্য গিয়েছিলাম। তখন প্রযুক্তি এতটা কার্যকর ছিল না; নাফ নদী ব্যবহার করা হতো মানবপাচারের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে। পরে মালয়েশিয়ায় গিয়েও মানবপাচার নিয়ে রিপোর্ট করেছি ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য। কাছ থেকে দেখেছি পাচারের শিকার মানুষের দুর্ভোগ, অসহায়ত্ব এবং অনিশ্চিত জীবন। একই সঙ্গে দেখেছি, সময়ের সঙ্গে সরকারের নীতির পর নীতি পরিবর্তন হয়েছে, নতুন আইন হয়েছে, নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানবপাচার থামেনি; বরং এর ধরন ও পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। তাই এবারের বিশ্ব মানবপাচার প্রতিরোধ দিবসে শুধু সরকারের নতুন অঙ্গীকার বা নতুন আইনের আলোচনা যথেষ্ট নয়। বরং জরুরি প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের মানবপাচারবিরোধী আইন ও নীতিগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর? কোথায় ব্যর্থতা, কেন ব্যর্থতা এবং নতুন আইন কি সত্যিই সেই ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে পারবে?
মানবপাচার এখন আর শুধু সীমান্ত পেরিয়ে মানুষকে অবৈধভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠানোর অপরাধ নয়। ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মানবপাচারের ধরনও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, অনলাইন নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম, মেসেজিং অ্যাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এখন পাচারকারীরা সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের শনাক্ত, প্রলুব্ধ এবং নিয়ন্ত্রণ করছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অনলাইন স্ক্যাম সেন্টারে চাকরির নামে বাংলাদেশিদের নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করার ঘটনাও এই নতুন বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ২০১২ সালের আইন প্রতিস্থাপন করে ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। সরকারি গেজেট অনুযায়ী এটি ২০২৬ সালের ৫৫ নম্বর আইন এবং ১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত হয়।
নতুন আইনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো মানবপাচার এবং অভিবাসী চোরাচালানকে পৃথক অপরাধ হিসেবে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা। একই সঙ্গে অনলাইন প্রতারণা, ভুয়া বিদেশি চাকরির বিজ্ঞাপন, প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা এবং মুক্তিপণ আদায়ের মতো আধুনিক অপরাধকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
সরকারের দাবি, নতুন আইন বাংলাদেশের মানবপাচারবিরোধী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আইন কঠোর হলেই কি মানবপাচার কমবে? নাকি বাংলাদেশের আসল দুর্বলতা আইন প্রণয়নে নয়, আইন প্রয়োগ, তদন্ত, বিচার, আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা এবং ভুক্তভোগী সুরক্ষায়?
বাংলাদেশ একই সঙ্গে মানবপাচারের উৎস, গন্তব্য এবং ট্রানজিট দেশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দেশের নাগরিকদের একটি বড় অংশ বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে অভিবাসন করে। এই অভিবাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা, অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয়, দালালনির্ভরতা, ভুয়া চাকরির প্রতিশ্রুতি এবং বিদেশে কর্মসংস্থান সম্পর্কে তথ্যের ঘাটতি পাচারকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে।
২০২৫ সালের মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের Trafficking in Persons Report অনুযায়ী, বাংলাদেশে যৌন পাচার, শ্রম পাচার, জোরপূর্বক শিশুশ্রম এবং অভ্যন্তরীণ পাচার এখনো বড় সমস্যা। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাচারকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল মেসেজ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের আকৃষ্ট করছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাইবার-স্ক্যাম অপারেশনে বাংলাদেশিদের পাচারের ঝুঁকি বাড়ছে।
অর্থাৎ মানবপাচারের প্রচলিত মডেল—‘দালাল → বিদেশ → শ্রম শোষণ’—এর পাশাপাশি নতুন মডেল তৈরি হয়েছে:
ডিজিটাল বিজ্ঞাপন → ভুয়া চাকরি → বিদেশে যাত্রা → পাসপোর্ট/মোবাইল কেড়ে নেওয়া → আটকে রাখা → জোরপূর্বক অপরাধে বাধ্য করা।
এই পরিবর্তনই ২০২৬ সালের নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে স্পষ্ট করে।
২০১২ সালের আইন থেকে ২০২৬ সালের নতুন আইন
বাংলাদেশে মানবপাচার মোকাবিলার প্রধান আইনি কাঠামো ছিল Prevention and Suppression of Human Trafficking Act, 2012। আইনটি যৌন ও শ্রম পাচারকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে পাচারকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের বিধান রেখেছিল। তবে বাস্তবে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণে সমস্যা ছিল।
২০২৬ সালের নতুন আইনে এই জায়গায় একটি মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। সরকার বলছে, নতুন আইনে মানবপাচারের সংজ্ঞাকে জাতিসংঘের Trafficking in Persons Protocol এবং অভিবাসী চোরাচালানের সংজ্ঞাকে Smuggling of Migrants Protocol-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। মানবপাচারে মূল বিষয় হলো শোষণ। অন্যদিকে অভিবাসী চোরাচালানে মূল বিষয় হলো অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারে সহায়তা।
দুটি অপরাধ প্রায়ই একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংঘটিত হলেও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো এক নয়। ফলে আলাদা সংজ্ঞা ও আলাদা অপরাধ কাঠামো তদন্ত ও বিচারে স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে।
নতুন আইনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য
২০২৬ সালের আইন প্রথমবারের মতো এই দুই অপরাধকে স্পষ্টভাবে আলাদা করেছে। এর ফলে কোনো ব্যক্তি পাচারের শিকার হয়েছেন নাকি কেবল চোরাচালানের মাধ্যমে সীমান্ত পার হয়েছেন—তা নির্ধারণে আইনি ভিত্তি শক্তিশালী হওয়ার কথা।
নতুন আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তির মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা। সরকারের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী অনলাইন প্রতারণা, স্ক্যামিং এবং মুক্তিপণ-সংক্রান্ত অপরাধ নতুন আইনের আওতায় এসেছে।
বিশেষ করে ভুয়া বিদেশি চাকরির বিজ্ঞাপন এখন আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। এ ধরনের অপরাধের জন্য ৩ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধানের কথা আইনবিষয়ক অবহিতকরণ কর্মশালায় জানানো হয়েছে।
মানবপাচারকে কেবল ব্যক্তি-অপরাধ হিসেবে দেখলে এর মূল অর্থনৈতিক কাঠামো ধ্বংস করা সম্ভব নয়। পাচারকারীরা সাধারণত অর্থের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করে।
নতুন আইনে তদন্তকারীদের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ, সম্পদ যাচাই এবং সম্পত্তি জব্দের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বিদেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগও বাড়ানো হয়েছে।
এটি বাস্তবায়ন করা গেলে আইনটির সবচেয়ে কার্যকর অংশগুলোর একটি হতে পারে। কারণ পাচারকারীর অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করা গেলে অপরাধী নেটওয়ার্কের কার্যক্রমও দুর্বল করা সম্ভব।
নতুন আইনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার করার বিধান রাখা হয়েছে বলে সরকারি আইনবিষয়ক কর্মশালায় জানানো হয়েছে। আন্তঃদেশীয় মানবপাচারের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারণ পাচারকারী অনেক সময় বাংলাদেশ ছেড়ে অন্য দেশে অবস্থান করে।
তবে এই বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের মানদণ্ড নিশ্চিত করা জরুরি।
পাচারকারীদের সম্পত্তি ব্যবহার করতে দেওয়া বা গুরুত্বপূর্ণ নথি গোপন করার মতো কর্মকাণ্ডকেও শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে। এ ধরনের সহায়তার জন্য ৩ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে বলে প্রকাশিত আইনবিষয়ক ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পাচারের মাধ্যমে যৌন শোষণের জন্য ৩ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধানের কথা জানানো হয়েছে।
নতুন আইন শুধু শাস্তির দিকে নয়, ভুক্তভোগীর অধিকার ও পুনর্বাসনের দিকেও জোর দিয়েছে। ভুক্তভোগী বা সাক্ষীকে ভয়ভীতি দেখানো কিংবা আপস করতে বাধ্য করার বিরুদ্ধে পৃথক শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, পাচারের সময় ভুক্তভোগী যদি বাধ্য হয়ে কোনো নির্দিষ্ট অবৈধ কাজে যুক্ত হয়ে থাকেন, তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করার নীতিও আইনে গুরুত্ব পেয়েছে। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত non-punishment principle-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মৃত্যুদণ্ড কি সমাধান?
নতুন আইনেও মানবপাচারের গুরুতর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। একক বা সংঘবদ্ধ মানবপাচারের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকার কথা আইনবিষয়ক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কঠোর শাস্তি নিঃসন্দেহে অপরাধের ভয়াবহতা প্রকাশ করে। কিন্তু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, শাস্তির মাত্রা এবং শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা—এই দুই বিষয় এক নয়।
যদি মামলা বছরের পর বছর চলতে থাকে, তদন্ত দুর্বল হয়, সাক্ষী আদালতে না আসে, পাচারকারীর অর্থ ও সম্পদ শনাক্ত না হয় এবং শেষ পর্যন্ত আসামি খালাস পেয়ে যায়, তাহলে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও কার্যকর প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে না।
সুতরাং নীতিগত প্রশ্ন হওয়া উচিত: সর্বোচ্চ শাস্তি কত কঠোর—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অপরাধীর শাস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা নিশ্চিত।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা: আইন নয়, প্রয়োগ
২০২৫ সালের মার্কিন TIP Report বাংলাদেশের বাস্তব চিত্রটি বেশ পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সময়ে বাংলাদেশ সরকার ৮১১টি মানবপাচার মামলা তদন্ত করেছে, যেখানে আসামির সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৩৩৪। এর মধ্যে ১১৫টি যৌনপাচার, ২২৭টি শ্রমপাচার এবং ৪৬৯টি অন্যান্য বা অনির্দিষ্ট ধরনের পাচারের মামলা ছিল। সরকার ৪৫২ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরু করে এবং আদালত ১০৩ পাচারকারীকে দোষী সাব্যস্ত করে। আগের প্রতিবেদনের সময়ে ৪০৭ জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল।
এখানে একটি বড় সমস্যা হলো মামলার দীর্ঘসূত্রতা। প্রতিবেদনে অন্তত ৪,৪৮৪টি মানবপাচার মামলা বিচারাধীন থাকার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন আদালতের তথ্য নিয়েও উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে নিষ্পত্তি হওয়া ৩৬৩টি মানবপাচার মামলার মধ্যে মাত্র ২১টিতে দণ্ড এবং ৩৪২টিতে খালাস হয়েছে।
অর্থাৎ আইন কঠোর করার পাশাপাশি তদন্তের মান, প্রসিকিউশন এবং বিচারিক সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে নতুন আইনও আগের আইনের মতো কার্যকারিতা হারাতে পারে।
কেন মামলা আদালতে গিয়ে দুর্বল হয়ে যায়?
মানবপাচার সাধারণত একটি আন্তঃদেশীয় এবং সংগঠিত অপরাধ। একটি মামলায় একই সঙ্গে থাকতে পারে—
ভুয়া নিয়োগকারী;
স্থানীয় দালাল;
রিক্রুটিং এজেন্সি;
পাসপোর্ট ও ভিসা জালিয়াতকারী;
পরিবহনকারী;
বিদেশি সহযোগী;
অর্থ পাচারকারী;
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকারী;
এবং শেষ পর্যায়ে শোষণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান।
ফলে একটি কার্যকর তদন্তের জন্য শুধু থানার মামলা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আর্থিক তদন্ত, ডিজিটাল ফরেনসিক, আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়, ইমিগ্রেশন ডেটা, ব্যাংকিং তথ্য এবং বিদেশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়।
২০২৫ সালের TIP Report-এও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের অনেক ক্ষেত্রে মানবপাচার, অভিবাসী চোরাচালান ও প্রতারণামূলক শ্রম ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণে ঘাটতি ছিল। আন্তঃদেশীয় মামলায় বিদেশি তদন্ত সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়, আন্তর্জাতিক প্রমাণ সংগ্রহ এবং সন্দেহভাজনকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে।
ভুক্তভোগী শনাক্তকরণে অগ্রগতি
সরকারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির জায়গাগুলোর একটি হলো ভুক্তভোগী সুরক্ষা। ২০২৫ সালের TIP Report অনুযায়ী, সরকার ১ হাজার ৪৬২ জন মানবপাচারের শিকারকে শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ১৪৪ জন যৌনপাচারের, ২৮৫ জন জোরপূর্বক শ্রমের এবং ১ হাজার ৩৩ জন অন্যান্য ধরনের পাচারের শিকার। আগের সময়ে শনাক্ত ভুক্তভোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২১০।
সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে National Referral Mechanism (NRM) গ্রহণ করেছে। এর লক্ষ্য হলো পাচারের শিকার ব্যক্তিকে শনাক্ত করার পর দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা, আশ্রয়, মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের সঙ্গে যুক্ত করা।
২০২৬ সালে বিচারকদের জন্য মানবপাচার মামলার ওপর একটি Bench Book চালু করা হয়েছে। UNODC, আইন মন্ত্রণালয় ও IOM-এর সহযোগিতায় তৈরি এই নির্দেশিকাটির লক্ষ্য বিচারকদের আরও সমন্বিত, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক এবং trauma-informed পদ্ধতিতে মামলা পরিচালনায় সহায়তা করা।
এগুলো ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু NRM বা Bench Book তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; মাঠপর্যায়ে পুলিশ, হাসপাতাল, জেলা প্রশাসন, আদালত, দূতাবাস ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা থাকতে হবে।
নতুন আইনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা: সাইবার স্ক্যাম ও forced criminality
২০২৬ সালের আইন প্রণয়নের সবচেয়ে সময়োপযোগী কারণগুলোর একটি হলো forced criminality বা জোরপূর্বক অপরাধে বাধ্য করা।
বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মানুষকে বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে অনলাইন স্ক্যাম সেন্টারে আটকে রাখার ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানবপাচারের নতুন চেহারা তৈরি করেছে।
ভুক্তভোগীদের অনেক সময় বলা হয় তারা কাস্টমার সার্ভিস, আইটি, মার্কেটিং বা অনলাইন ব্যবসায় কাজ করবেন। বিদেশে যাওয়ার পর তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া, চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক নির্যাতন এবং ঋণের ভয় দেখিয়ে অনলাইন প্রতারণা করতে বাধ্য করা হয়।
এখানে ভুক্তভোগী নিজেই কখনো কখনো একটি অপরাধ সংঘটন করতে বাধ্য হন। ফলে প্রচলিত ফৌজদারি আইনে তাকে অপরাধী মনে করার ঝুঁকি তৈরি হয়।
নতুন আইনে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক এবং non-punishment নীতির গুরুত্ব তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে তদন্তের শুরুতেই নির্ধারণ করতে হবে—ব্যক্তি কি স্বেচ্ছায় অপরাধে যুক্ত হয়েছিল, নাকি পাচারের শিকার হয়ে বাধ্য হয়েছিল?
সরকারের নীতিগত অবস্থান: ‘Zero Tolerance’ থেকে বাস্তবায়ন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ৩০ জুলাইয়ের জাতীয় সংলাপে বলেছেন, সরকার প্রযুক্তির অপব্যবহার করে পরিচালিত আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও স্ক্যাম চক্রের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একই অনুষ্ঠানে তিনি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজকে নিয়ে সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।
সরকার ইতোমধ্যে নতুন আইন, জাতীয় রেফারেল ব্যবস্থা, ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগের কথা জানিয়েছে।
জাতিসংঘও বাংলাদেশে মানবপাচার সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। UNODC-এর সহযোগিতায় একটি Digital Data Collection Platform তৈরির কাজ চলছে, যার লক্ষ্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার তথ্যকে আরও সমন্বিত করা।
নীতিগতভাবে এটি সঠিক দিক। কারণ মানবপাচার মোকাবিলা শুধু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়।
এখানে জড়িত—
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় + পুলিশ + বিজিবি + কোস্টগার্ড + পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় + প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় + বেসামরিক বিমান চলাচল + ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান + টেলিকম অপারেটর + প্রযুক্তি কোম্পানি + আদালত + স্থানীয় প্রশাসন + এনজিও।
কিন্তু সরকারের সামনে পাঁচটি বড় ঝুঁকি
ডিজিটাল পাচারের তদন্ত করতে হলে সাধারণ পুলিশিং যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ডিজিটাল ফরেনসিক, ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্র্যাকিং, সোশ্যাল মিডিয়া বিশ্লেষণ, ডেটা রিকভারি এবং আন্তর্জাতিক সাইবার তদন্তের সক্ষমতা।
পাচারকারী বাংলাদেশে, ভুক্তভোগী মিয়ানমার বা মালয়েশিয়ায় এবং অর্থ অন্য কোনো দেশে—এমন পরিস্থিতিতে শুধু বাংলাদেশের আইন দিয়ে পুরো অপরাধ মোকাবিলা সম্ভব নয়।
২০২৫ সালের TIP Report সরকারি কর্মকর্তা ও সীমান্তসংক্রান্ত দুর্নীতিকে মানবপাচার মোকাবিলার অন্যতম উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার পাচার-অপরাধে জড়িত কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত, মামলা বা দণ্ডের তথ্য দেয়নি।
সুতরাং ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হবে নিজেদের ব্যবস্থার ভেতরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
বাংলাদেশের নীতিগত মনোযোগ দীর্ঘদিন বিদেশে শ্রম পাচারের দিকে বেশি ছিল। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে যৌনপাচার, শিশুশ্রম, গৃহস্থালি শ্রমে শোষণ এবং জোরপূর্বক শ্রমও গুরুতর সমস্যা। ২০২৫ সালের TIP Report বিশেষভাবে অভ্যন্তরীণ পাচার মোকাবিলায় ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছে।
হাজার হাজার মামলা বিচারাধীন থাকলে নতুন মামলা যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিচারব্যবস্থায় চাপ বাড়বে। ফলে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, বিশেষ প্রসিকিউটর, তদন্ত কর্মকর্তা এবং বিচারকদের সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া নতুন আইন কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
১১. বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর জাতীয় কৌশল কেমন হওয়া উচিত?
নতুন আইনকে কার্যকর করতে বিশেজ্ঞরা কিছু বিষয়ের দিকে নজর দিতে বলছেন:
ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, অনলাইন নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এবং দালাল নেটওয়ার্ককে আগেই শনাক্ত করতে হবে।
ভুক্তভোগী শনাক্ত হওয়ার পর তাকে অপরাধী নয়, প্রথমে সম্ভাব্য শোষণের শিকার হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে।
পাচারকারীর বিরুদ্ধে মামলা শুধু দায়ের করাই যথেষ্ট নয়; তদন্ত থেকে চূড়ান্ত রায় পর্যন্ত একটি বিশেষায়িত প্রসিকিউশন ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সরকার, এনজিও, আন্তর্জাতিক সংস্থা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, মোবাইল অপারেটর ও বিদেশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে স্থায়ী সহযোগিতা দরকার।
মানবপাচারকে শুধু অপরাধ হিসেবে নয়, শ্রমবাজার, অভিবাসন, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, শিক্ষা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে।
প্রতিটি মামলা, ভুক্তভোগী, পাচারকারী, রিক্রুটিং এজেন্ট, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, যাত্রাপথ এবং আদালতের ফলাফল একটি সমন্বিত ডেটাবেসে রাখতে হবে।
এছাড়া দৃর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আরও কিছু বিষয় বলা যায়, যা মানব পাচার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
১. জাতীয় মানবপাচার ডেটাবেস বাধ্যতামূলক করা
পুলিশ, আদালত, বিজিবি, বিমানবন্দর, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং এনজিওগুলোর তথ্য একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করতে হবে।
২. প্রতিটি বড় পাচার মামলায় Financial Investigation বাধ্যতামূলক করা
শুধু ভুক্তভোগী উদ্ধার নয়; পাচারের অর্থ কোথায় গেছে, কার ব্যাংক হিসাবে গেছে, কোন সম্পত্তি কেনা হয়েছে এবং বিদেশে অর্থ পাঠানো হয়েছে কি না—তা তদন্ত করতে হবে।
৩. Digital Trafficking Response Unit তৈরি করা
পুলিশের ভেতরে বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, সোশ্যাল মিডিয়া রিক্রুটমেন্ট, অনলাইন স্ক্যাম এবং ডিজিটাল পাচারের বিরুদ্ধে ২৪ ঘণ্টার নজরদারি ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৪. Human Trafficking Tribunal-এর সক্ষমতা বাড়ানো
বিচারাধীন হাজার হাজার মামলার চাপ কমাতে বিচারক, প্রসিকিউটর ও তদন্ত কর্মকর্তার সংখ্যা এবং প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। মামলা নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট performance indicators তৈরি করা যেতে পারে।
৫. ‘ভুক্তভোগী আগে, মামলা পরে’ পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিকে প্রথমেই জিজ্ঞাসাবাদ করে আসামি বানানোর পরিবর্তে তার পাচারের পরিস্থিতি, জোরপূর্বক শ্রম, যৌন শোষণ বা forced criminality-এর শিকার হওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করতে হবে।
আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন: বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে?
বাংলাদেশ ২০২৫ সালের মার্কিন TIP Report-এ Tier 2 অবস্থানে ছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশ মানবপাচার নির্মূলে আন্তর্জাতিক ন্যূনতম মান পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি, তবে তা পূরণের জন্য উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা করছে। বাংলাদেশ টানা ষষ্ঠ বছর Tier 2-তে রয়েছে।
এখানে দুটি বিপরীত বাস্তবতা রয়েছে।
একদিকে সরকার ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ, National Referral Mechanism, প্রশিক্ষণ, নতুন আইন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অগ্রগতি করেছে।
অন্যদিকে তদন্ত, বিচার, দণ্ড নিশ্চিত করা, অভ্যন্তরীণ পাচার, শ্রম পরিদর্শন এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা মোকাবিলায় দুর্বলতা রয়ে গেছে।
অতএব বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ এখন আইন তৈরি করা নয়; আইনের বিশ্বাসযোগ্য প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
নতুন আইন একটি সুযোগ, কিন্তু সমাধান নয়
বাংলাদেশের ২০২৬ সালের মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন সময়ের প্রয়োজনেই এসেছে। মানবপাচারের ধরন বদলেছে; ফলে আইনও বদলানো প্রয়োজন ছিল। মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালানকে পৃথক করা, অনলাইন প্রতারণা ও ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপনকে আইনের আওতায় আনা, সম্পদ জব্দ, ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা এবং non-punishment principle-এর মতো বিষয়গুলো নতুন আইনের ইতিবাচক দিক।
কিন্তু বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা একটি সতর্কবার্তাও দেয়। কঠোর আইন থাকা এবং কার্যকর বিচারব্যবস্থা থাকা এক বিষয় নয়।
যদি পুলিশ তদন্তে দুর্বল হয়, প্রসিকিউশন সমন্বিত না হয়, আদালতে বছরের পর বছর মামলা পড়ে থাকে, পাচারকারীর সম্পদ শনাক্ত না হয়, সীমান্ত ও নিয়োগ ব্যবস্থায় দুর্নীতি থেকে যায় এবং ভুক্তভোগীকে সুরক্ষার পরিবর্তে আবারও হয়রানির মুখে পড়তে হয়—তাহলে নতুন আইনও কাগজে শক্তিশালী কিন্তু বাস্তবে দুর্বল একটি কাঠামোতে পরিণত হতে পারে।
সুতরাং সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিকে এখন ‘জিরো ইমপিউনিটি’ বা অপরাধীর দায়মুক্তি শূন্যে নামানোর নীতিতে রূপান্তর করা প্রয়োজন।
মানবপাচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের লড়াইয়ের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন একজন তরুণ ভুয়া বিদেশি চাকরির বিজ্ঞাপনে প্রতারিত হওয়ার আগেই রাষ্ট্র তাকে সতর্ক করতে পারবে; পাচারকারী ভুক্তভোগীকে সীমান্ত পার করানোর আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে শনাক্ত করতে পারবে; বিদেশে আটকে পড়া বাংলাদেশিকে দ্রুত উদ্ধার করা যাবে; এবং শেষ পর্যন্ত পাচারকারী শুধু গ্রেপ্তার নয়—তার অর্থ, সম্পদ ও নেটওয়ার্কসহ আদালতের সামনে জবাবদিহির আওতায় আসবে।
২০২৬ সালের আইন বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন এমন একটি বাস্তবায়ন কাঠামো, যেখানে আইন, প্রযুক্তি, বিচার, অর্থনৈতিক তদন্ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং ভুক্তভোগী সুরক্ষা একই ব্যবস্থার অংশ হবে।
সেই বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে নতুন আইন মানবপাচার মোকাবিলায় সত্যিই একটি মাইলফলক হতে পারে; অন্যথায় এটি আরও একটি কঠোর আইন হিসেবেই থেকে যাবে—যার শাস্তি কঠিন, কিন্তু অপরাধীর কাছে ধরা পড়ার ঝুঁকি কম।

Author