
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ছিল একটি জাতির বিবেকের জাগরণ। এই অভ্যুত্থান আমাদের এমন কিছু শিক্ষা দিয়েছে, যা শুধু একটি সরকার বা একটি রাজনৈতিক দলের জন্য নয়—রাষ্ট্র, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সমাজের প্রতিটি স্তর, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি দায়িত্বশীল মানুষের জন্য এটি এক অনন্য শিক্ষা।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ক্ষমতা, প্রভাব ও প্রতিপত্তি কারও জন্যই চিরস্থায়ী নয়। মহান স্রষ্টা তাঁর প্রতিটি সৃষ্টির জন্য যেমন জীবন ও মৃত্যুর সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তেমনি ক্ষমতারও একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে রেখেছেন। তাই ক্ষমতার অহংকার, অন্যায়, জুলুম কিংবা রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহার কখনোই স্থায়ী হতে পারে না।
গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে কিংবা ‘আগেই ভালো ছিলাম’—এ কথা বলার কোনো সুযোগ নেই। বরং বাস্তবতা হলো, গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে বলেই দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটেছে এবং জনগণ রাষ্ট্রের ওপর নিজেদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছে। গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে বলেই আজকের সরকারি দল ও বিরোধী দলের বহু নেতা—যারা একসময় নিপীড়িত, নির্যাতিত ও মাজলুম ছিলেন—তারা আজ সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন। আপসহীন নেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ কারাবাস ও বন্দিজীবন থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
লাখো মানুষ অশ্রুসিক্ত নয়নে তাঁর জানাজায় অংশ নিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পেয়েছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে এসে জনগণের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতাসহ বহু রাজনৈতিক নেতা-কর্মী দীর্ঘদিনের জেল-জুলুম, মামলা, হামলা ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হয়েছেন। আজকের সংসদেও এমন অনেক সংসদ সদস্য রয়েছেন, যারা একসময় রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের সাফল্য না হলে তাঁদের অনেকেরই হয়তো আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ফিরে আসা সম্ভব হতো না।
গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে বলেই দীর্ঘ ১৭ বছর পর ১২ ফেব্রুয়ারি এ দেশের আপামর জনগণ ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছেন। মানুষ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরেছে—এটিও গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম বড় অর্জন। তাই গণঅভ্যুত্থানের সাফল্যকে অস্বীকার করা মানে শুধু ইতিহাসকে অস্বীকার করা নয়; বরং সেইসব মানুষের আত্মত্যাগ, নির্যাতন ও সংগ্রামকেও অস্বীকার করা, যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আজকের এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। তবে এখানেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ? নিশ্চয়ই নয়।
গণঅভ্যুত্থান আমাদের একটি নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে। এখন দায়িত্ব হলো—এই অর্জনকে টেকসই করা, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং জনগণের ভোট, অধিকার ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
হ্যাঁ, এটিও সত্য—গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আমরা জুলাইকে যথাযথভাবে ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছি। শুধু তা-ই নয়, এই ব্যর্থতার দায়ও যেন ধীরে ধীরে আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে দেওয়া হচ্ছে; কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবেই আমাদের ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই সবকিছু ভুলে যাচ্ছি, নাকি আমাদের ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে? মনে হচ্ছে, বিগত ১৭ বছরের জুলুম-নির্যাতন, দমন-পীড়ন ও কর্তৃত্ববাদের দিনগুলো মানুষের স্মৃতি থেকে ধীরে ধীরে মুছে যেতে বসেছে। নইলে কেন গত দুই বছরে আমরা অতীতের সেই দুঃসহ ইতিহাস নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা করছি না? কেন সেই সময়ের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতন্ত্রহীনতার একটি পূর্ণাঙ্গ ও নির্মোহ মূল্যায়ন হচ্ছে না? কেনই বা আমরা আগামী দিনের একটি নতুন ধারার বাংলাদেশ নির্মাণে ঐক্যবদ্ধ হতে পারছি না?
আমরা ভুলতে বসেছি আওয়ামী লীগের পতনের পর ৫ থেকে ৮ আগস্টের সেই অস্থির দিনগুলোকে—যখন দেশে কার্যত কোনো কার্যকর সরকার ছিল না, আর জনগণই অনেকটা অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকে সচল রাখার চেষ্টা করেছিল। আমরা ভুলতে বসেছি কীভাবে দীর্ঘদিনের একটি নতজানু পররাষ্ট্রনীতি দেশের সার্বভৌম স্বার্থকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল এবং কীভাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ ও মর্যাদা বারবার উপেক্ষিত হয়েছিল।
সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, আমরা এখনো ফ্যাসিবাদের দিনগুলোর ওপর একটি গভীর, নির্মোহ ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা করতে পারিনি। পতিত সরকারের রাজনৈতিক কাঠামো, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা এবং পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা—কোনোটিই যথাযথভাবে বিশ্লেষণের আওতায় আসেনি।
অন্যদিকে, ফ্যাসিবাদবিরোধী জুলাই ঐক্যের স্টেকহোল্ডাররা আজ অনেকাংশে ক্রেডিটের প্রতিযোগিতা এবং একে অপরকে হেয় প্রতিপন্ন করার রাজনীতিতে ব্যস্ত। কার অবদান কতটুকু—তা জাতির সামনে তুলে ধরাই যেন অনেকের প্রধান লক্ষ্য। অথচ জুলাইযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং জুলাই শহীদদের হত্যার বিচার নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো কার্যকর অগ্রাধিকার হয়ে উঠতে পারেনি।
রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের তরুণরাও নিজ নিজ প্ল্যাটফর্ম ও কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত।
ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলো জুলাই সনদ ও জুলাই ঘোষণাপত্রের বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো একটি ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকর কর্মসূচি দিতে পারেনি। অথচ বাস্তবতা বড় নির্মম। এখনো বহু অবুঝ সন্তান তার শহীদ বাবার লাশ কবর থেকে তুলে শেষবারের মতো চুমু খেতে চায়। এখনো অনেক মা দূর-দূরান্তে ছুটে যান—হয়তো কোনো গণকবরের মাটির নিচে তাঁর সন্তানের সন্ধান মিলবে, এই আশায়। অনেক বাবা-মা তাঁদের ছোট্ট সন্তান হারিয়ে আজও দিশেহারা। এখনো বহু আহত জুলাইযোদ্ধা সুচিকিৎসার আশায় বুক বেঁধে আছেন। এই বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি সত্যিই জুলাইকে ধারণ করতে পেরেছি?
আমরা ভুলে যাচ্ছি—জুলাই শুধু ক্ষমতার পটপরিবর্তনের নাম নয়; এটি কেবল চেয়ার ও চেহারা পরিবর্তনের আন্দোলনও নয়। জুলাই-পরবর্তী গণঅভ্যুত্থানের অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্রকাঠামোর মেরামত ও প্রয়োজনীয় সংস্কার। জনগণের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে থাকবে না; বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান স্বাধীন, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলকভাবে কাজ করবে।
বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে টেকসই করতে হলে তাই ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। ফ্যাসিবাদ যাতে আর কখনো ফিরে আসতে না পারে—সেই লক্ষ্যেই জুলাই-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার ভিত্তিতে জুলাই চার্টার প্রণয়ন ও গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত গ্রহণের উদ্যোগ একটি ঐতিহাসিক সম্ভাবনার দ্বার খুলেছিল। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ইনসাফভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।
কিন্তু সেই ঐতিহাসিক সুযোগ যদি গণভোটের রায় ও জুলাই চার্টারের মৌলিক চেতনাকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পরিবর্তে পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তকে বহাল রাখা বা আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার মধ্য দিয়ে শেষ হয়, তাহলে আমাদের আশঙ্কা করতেই হবে—আমরা হয়তো ইতিহাসের একটি বড় শিক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ হচ্ছি। কারণ অতীতে যে কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো বারবার কর্তৃত্ববাদ, স্বেচ্ছাচারিতা ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতার জন্ম দিয়েছে, সেগুলো যদি অক্ষুণ্ণ থাকে, তাহলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের রাজনৈতিক পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যাবে।
চেয়ার বদলালেই রাষ্ট্র বদলায় না। চেহারা বদলালেই শাসনব্যবস্থা বদলায় না। রাষ্ট্র বদলাতে হলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বদলাতে হয়; ক্ষমতার কাঠামোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হয়।তাই জুলাইকে শুধু একটি বিজয়ের স্মৃতি হিসেবে নয়, একটি অসমাপ্ত দায়িত্ব হিসেবেও দেখতে হবে।একটি পুরোনো ও ব্যর্থ সিস্টেমের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ন্যায়-ইনসাফ, বৈষম্যহীনতা এবং নাগরিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই ছিল চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-শ্রমিক-জনতা ও মেহনতি মানুষের গণআকাঙ্ক্ষা।
সেই আশা ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বরং এখনো সুযোগ আছে—জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে অর্থবহ করার, শহীদদের রক্তের মর্যাদা রক্ষা করার এবং একটি নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের।
জনগণের প্রবল আকাঙ্ক্ষা—আর যেন ‘অশান্ত জুলাই’ ফিরে না আসে। আর যেন রাজপথে তাজা রক্ত না ঝরে। কোনো মায়ের কোল যেন আর খালি না হয়। কোনো সন্তান যেন আর বাবার লাশ খুঁজে না ফেরে। কোনো পরিবার যেন আর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার না হয়।
জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই—ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক পরিবর্তনই হতে হবে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। আর সেই পরিবর্তনের পথ হতে হবে ন্যায়, ইনসাফ, জবাবদিহি, গণতন্ত্র ও নাগরিক মর্যাদার পথ। জুলাইকে ভুলে গেলে শুধু শহীদদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হবে না—ইতিহাসের কাছেও আমরা দায়ী হয়ে থাকব। কারণ জুলাই কোনো অতীতের অধ্যায় নয়; জুলাই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি অসমাপ্ত অঙ্গীকার।
লেখক
কলামিস্ট ও রাজনীতি পর্যবেক্ষক
Author