
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থান, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সরকারের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচির কথা তুলে ধরেছেন। তিস্তা মহাপরিকল্পনার উল্লেখ থাকলেও এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়টি বক্তব্যে আসেনি।
এছাড়া গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার, পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার বিষয়েও বক্তব্যে উল্লেখ ছিল না।
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি দীর্ঘদিনের ‘ফ্যাসিবাদী শাসন’ অবসানের কথা উল্লেখ করে দেশ পুনর্গঠনে তাঁর সরকারের ‘রিকভারি, রিস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’ বা ‘থ্রি আর’ কৌশলের কথা তুলে ধরেন।
তবে ফ্যাসিবাদী শাসনামলের গুম, খুন, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করলেও এসব ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার, বিদেশে অবস্থানরত আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনা কিংবা প্রত্যর্পণের বিষয়ে কোনো পৃথক প্রস্তাব বা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়নি।
জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তিস্তা মহাপরিকল্পনার উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পানি সংরক্ষণের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধি, সারা দেশে খাল খনন এবং আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
তবে বক্তব্যে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি, এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে চলমান আলোচনা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমার উল্লেখ নেই। ফলে তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রসঙ্গ এলেও দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত পানিবণ্টন ইস্যুটি বক্তব্যে উঠে আসেনি।
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশিল্প, নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, শিক্ষা ও খেলাধুলায় সরকারি উদ্যোগের কথা বলেন। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুযোগ সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং নিরাপদ অভিবাসনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
তবে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্যতম আলোচিত বিষয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা কর্মপদ্ধতির সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের চাপ হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের দাবি এবং প্রত্যাবাসনের আগ পর্যন্ত তাদের জন্য জীবনরক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান ছিল।
ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতিও বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। সংঘাত নিরসনে আলোচনা ও কূটনীতির গুরুত্ব এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
প্রায় ২১ মিনিটের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট এবং বৈশ্বিক শান্তি ও সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার, জবাবদিহি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং তিস্তার পানিবণ্টনসহ দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আরও স্পষ্ট বক্তব্য বা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার উল্লেখ থাকলে বক্তব্যটি দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার সঙ্গে আরও বিস্তৃতভাবে সংযুক্ত হতো।
Author