
শরতের আকাশও বাংলাদেশের মতো এত দ্রুত রং বদলায় কি না, জানি না। এই আকাশের রং কখন যে নীল থেকে মেঘলা, মেঘলা থেকে বৃষ্টি আর বৃষ্টি থেকে আবার ঝকঝকে রোদ হয়ে যায়—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশের জাতীয় ইস্যুগুলোর অবস্থাও যেন এখন অনেকটা তেমনই।
সকালে যে বিষয়টি নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা, দুপুরে সেটিই হয়তো সামাজিক গাযোগমাধ্যমের দ্বিতীয় সারির খবর। সন্ধ্যার আগেই এসে যায় নতুন কোনো ঘটনা। রাতের টকশো, ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ভিডিও, সংবাদ শিরোনাম—সবকিছু দখল করে নেয় নতুন ইস্যু। পরদিন সকালে আগের দিনের উত্তেজনার অনেকটাই যেন আর থাকে না।
এ কারণেই মনে হয়, বাংলাদেশে এখন শুধু ইস্যু তৈরি হচ্ছে না; ইস্যু ভোগ করা হচ্ছে।
একটি ঘটনা ঘটে। মানুষ ক্ষুব্ধ হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরব হয়। রাজনৈতিক নেতারা বিবৃতি দেন। তদন্ত কমিটি হয়। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারপর আসে আরেকটি ঘটনা। আগের ঘটনাটি চলে যায় আড়ালে।
গত কয়েক দিনে ঢাকার ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালেই বিষয়টি চোখে পড়ে।
প্রথমে রাড্ডা MCH-FP Centre। রাতের আঁধারে শতাধিক মানুষের একটি দল স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা চালায়, নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে, ওষুধ, টিকা, চিকিৎসা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন সামগ্রী লুট করে এবং শেষ পর্যন্ত স্থাপনাটি ভেঙে ফেলে। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পরে আরও গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখনও সামনে—এত বড় একটি হামলা কারা সংগঠিত করেছিল, কারা নির্দেশ দিয়েছিল এবং কেন আগেই তা ঠেকানো গেল না?
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম ও ঘটনাস্থলে তাদের ভূমিকা নিয়ে নানা তথ্য এসেছে। সংশ্লিষ্ট একজন নারী সংসদ সদস্য অবশ্য কোনো সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। পুলিশও কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। ফলে এখানে অভিযোগ, তদন্ত ও প্রমাণ—এই তিনটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি। কিন্তু প্রশ্নটি থেকেই যায়: গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরাই কি পুরো ঘটনার উত্তর, নাকি তাদের ওপরে আরও কোনো স্তর আছে?
এর মধ্যেই জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে চলে এলো বারিধারা। ফুটপাতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন ২৪ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান। একটি দ্রুতগতির গাড়ি ফুটপাতে উঠে তাকে চাপা দেয়। তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। ঘটনাটি শুধু সড়ক দুর্ঘটনা নয়; এটি শহরের ফুটপাত, সড়ক নিরাপত্তা, শ্রেণিগত বৈষম্য এবং আইনের প্রয়োগ—সবকিছুকে সামনে নিয়ে আসে।
আরও প্রশ্ন ওঠে যখন ঘটনাস্থলে আটক এক কিশোরকে প্রথমে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয় এবং পরে সমালোচনার মুখে তাকে আবার পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। ভিডিও ফুটেজে গাড়ির চালকের আসন থেকে কিশোরকে নামতে দেখা গেছে—এমন তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
কিন্তু মেহেদীর মৃত্যুর প্রশ্নটি জাতীয় আলোচনায় কতক্ষণ টিকে থাকল? তার উত্তর আমরা খুব দ্রুতই পেয়ে গেলাম।
রাতের মধ্যেই নতুন ঘটনা—কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুর। আসবাব, টেলিভিশন, সরঞ্জামসহ স্টুডিওর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ছবি ছড়িয়ে পড়ল। পুলিশ কয়েকজনকে আটক ও গ্রেপ্তার করেছে। তদন্তে জমিসংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে; সালমান নিজেও ঘটনাটির পেছনে সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ বা চাঁদাবাজির অভিযোগের কথা বলেছেন। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্তেই নির্ধারিত হবে।
আবার শুরু হলো আলোচনা। টেলিভিশনে আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট। প্রতিবাদ। গ্রেপ্তার। তদন্ত। তারপর?
আজ সকালেই নতুন দৃশ্য। ফুটপাত দখলমুক্ত করতে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সিটি করপোরেশন। মিরপুর-১০ এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ভাঙচুর এবং সিটি করপোরেশনের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার গ্যাস ছুড়েছে বলেও প্রতিবেদন এসেছে।
অর্থাৎ মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে আমাদের সামনে দাঁড়াল—
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ধ্বংসযজ্ঞ,
নির্মাণশ্রমিক মেহেদীর মৃত্যু,
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা,
ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান,
এবং সেই অভিযান ঘিরে আবার সংঘর্ষ।
প্রতিটি ঘটনাই আলাদা করে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় বিতর্কের জন্ম দেওয়ার মতো। কিন্তু আমরা কি কোনো একটি বিতর্ককে তার শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারছি? এখানেই আসল সংকট।
বাংলাদেশে এখন অনেক ঘটনা আছে, কিন্তু ঘটনাগুলোর পরিণতি নিয়ে অপেক্ষা করার সময় যেন কারও নেই।
রাড্ডার ঘটনায় কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেই যদি আমরা সন্তুষ্ট হয়ে যাই, তাহলে তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি বাদ পড়ে যায়। কারণ ২০০-২৫০ জন মানুষ রাতের আঁধারে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভেঙে ফেলছে—এটি নিছক কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল মানুষের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ছিল, নাকি এর পেছনে পরিকল্পনা, সংগঠন ও স্বার্থ ছিল—সেটিই তদন্তের বিষয়।
আমাদের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় একটি পুরোনো প্রবণতা আছে—ঘটনার পর দ্রুত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এতে জনমনে তাৎক্ষণিক স্বস্তি তৈরি হয়। কিন্তু গ্রেপ্তার আর বিচার এক জিনিস নয়। গ্রেপ্তার তদন্তের শুরু। বিচার তার পরের ধাপ।
আর নির্দেশদাতা বা পরিকল্পনাকারী যদি থেকে যায় আড়ালে, তাহলে দৃশ্যমান কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও অপরাধের কাঠামো অক্ষত থাকে।
রাড্ডা ঘটনার ক্ষেত্রে পুলিশ ইতোমধ্যে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে তথ্য এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা আদালত ও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে শুধু হামলাকারী নয়—যদি পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা, নির্দেশদাতা বা সুবিধাভোগী কেউ থাকে, তাকেও আইনের আওতায় আনা।
ফুটপাত কার?
শহরের ফুটপাত পথচারীর হাঁটার জায়গা। কিন্তু বাস্তবে কোথাও দোকান, কোথাও নির্মাণসামগ্রী, কোথাও পার্কিং, কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে ফুটপাতের চরিত্র বদলে গেছে।
মেহেদী সেই ফুটপাতেই বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। একজন শ্রমজীবী মানুষ কাজের ফাঁকে কয়েক মিনিট বিশ্রাম নিতে গিয়ে প্রাণ হারালেন। তারপর আমরা ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান শুরু করলাম। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একজন শ্রমিক মারা যাওয়ার পরই কি ফুটপাত আমাদের মনে পড়ল?
আর ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান যদি সত্যিই হয়, সেটি যেন শুধু আজকের সংবাদ না হয়। আগামীকালও যেন থাকে। এক সপ্তাহ পরও থাকে। এক মাস পরও থাকে।
আরেকটি ঘটনা আমাদের দরজায় কড়া নাড়ল। সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনাও একই প্রশ্ন সামনে আনে।
ব্যক্তি যেই হোন—তিনি রাজনৈতিক কর্মী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, কনটেন্ট ক্রিয়েটর কিংবা সাধারণ নাগরিক—তার প্রতিষ্ঠান বা সম্পত্তিতে হামলার অধিকার কারও নেই। আইন থাকলে বিরোধের সমাধান হবে আইনে। জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে আদালত আছে। চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলে মামলা আছে। দখলের অভিযোগ থাকলে প্রশাসন আছে।
কিন্তু কোনো বিরোধের সমাধান যদি দলবল নিয়ে গিয়ে ভাঙচুরের মাধ্যমে করতে হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি ব্যক্তির ওপর হামলা নয়; এটি রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর ওপরও প্রশ্ন।
এই ঘটনার তদন্তে পুলিশ জমি নিয়ে বিরোধের কথা বলেছে। অন্যদিকে সালমানও চাঁদাবাজি বা সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধের অভিযোগের কথা বলেছেন। কোন অভিযোগ কতটা সত্য, সেটি তদন্তে নির্ধারিত হবে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়—আমাদের স্মৃতির মেয়াদ কমে যাচ্ছে। সমস্যা শুধু রাষ্ট্রের নয়। সমাজ হিসেবেও আমরা যেন দ্রুত ভুলে যাচ্ছি। একটি ঘটনা ভাইরাল হয়। আমরা ক্ষুব্ধ হই। পোস্ট লিখি। ভিডিও বানাই। হ্যাশট্যাগ দিই। তারপর নতুন ভিডিও আসে।
পুরোনো ঘটনার বিচার কোথায় গেল—সেটি আর কেউ জানতে চায় না। এ কারণেই হয়তো অপরাধীরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় আমাদের স্বল্পস্থায়ী ক্ষোভ থেকে। যে সমাজের ক্ষোভের মেয়াদ ২৪ ঘণ্টা, সেখানে অপরাধীকে শুধু ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। তারপর নতুন কোনো ঘটনা আসবে। নতুন শিরোনাম আসবে।
রাষ্ট্র কি এখন ঘটনাকে প্রতিরোধ করার বদলে ঘটনার পরে প্রতিক্রিয়া জানাতেই বেশি অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে?
কারণ কার্যকর রাষ্ট্র শুধু অপরাধের পরে ব্যবস্থা নেয় না। ঝুঁকি চিহ্নিত করে, আগাম ব্যবস্থা নেয়, নিয়মিত নজরদারি করে এবং একই ধরনের অপরাধ যাতে পুনরাবৃত্তি না হয় তার কাঠামো তৈরি করে।
Author