Saturday, September 19, 2026 | আশ্বিন ৪, ১৪৩৩ | ৮ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
Policy Paper
হোমদেশরাজনীতি ও পলিসিঅর্থকড়িদুনিয়াসম্পাদকের বাছাইআমাদের সম্পর্কেযোগাযোগ
Policy Paper

নীতি বিশ্লেষণ, রাজনৈতিক ধারাভাষ্য এবং বৈশ্বিক খবরের জন্য আপনার বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যম।

জনপ্রিয় বিভাগ

  • দেশ
  • রাজনীতি ও পলিসি
  • অর্থকড়ি
  • দুনিয়া
  • সম্পাদকের বাছাই
  • খেলা
  • বিনোদন
  • মতামত
  • স্বাস্থ্য, পরিবেশ
  • শিক্ষা
  • ধর্ম ও দর্শন

যোগাযোগ

  • ৬ ইসরাত টাওয়ার, পুরানা পল্টন, ঢাকা
  • +8801316248159

নিউজলেটার

আপডেট পেতে চান? নিচে আপনার ইমেইল দিন — আমরা চালু হলেই খবর পাঠাব।

© 2026 Policy Paper। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

Developed by DataMart BD Limited

গোপনীয়তা নীতিপরিষেবার শর্তাবলী
মতামত

অসমাপ্ত জুলাই

অলিউল্লাহ নোমানঅলিউল্লাহ নোমান
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
অসমাপ্ত জুলাই

জুলাই এখন বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ। ২০২৪ সালে এই মাস ইতিহাস গড়েছে এবং বড় একটি আসন করে নিয়েছে। জুলাই ইতিহাসে জায়গা করে নেবে না-ই বা কেন! যদিও বিতর্ক চলছে জুলাই কি বিপ্লব, নাকি অভ্যুত্থান। নাকি সাধারণ একটা আন্দোলন মাত্র। যেভাবেই জুলাইকে মূল্যায়ন করা হোক না কেন; এই বিপ্লব বা অভ্যুত্থান এখনো চলমান রয়েছে। কেন চলমান রয়েছে এ বিষয়ে পরে আসছি। রাজনীতির আরেকটি অংশ জুলাইকে হিংসাত্মকভাবেও দেখেন। তাদের কথায় ও বক্তব্যে হিংসার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে দেখা যায়। তারা জুলাইয়ে চলমান গণহত্যা নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলার অপচেষ্টা করেন। প্রশ্নবিদ্ধ করার মতলব থাকে তাদের কথাবার্তায়। যেমন, একটি দলের সংরক্ষিত আসনের এক সদস্যকে স্নাইপার (অস্ত্র) নিয়ে প্রশ্ন তোলার অপচেষ্টা করতে দেখা গেছে। আরেকজন তো পুলিশ নিহত হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন হরহামেশা। প্রতিটি মার্ডার বা হত্যার ঘটনাই মর্মান্তিক। তবে অভ্যুত্থান চলাকালে জনরোষে যা ঘটে সেটা নিয়ে দুনিয়ার কোথাও এভাবে প্রশ্ন উঠতে দেখা যায় না। দীর্ঘ ১৭ বছরের নিপীড়নে পুলিশ ছিল ফ্যাসিবাদের প্রধান লাঠিয়াল বাহিনী।


টানা দীর্ঘ ১৭ বছর ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে ক্লান্ত রাজনৈতিক দলগুলো। নানামুখী জোট গঠন হয়েছে। বিদ্যমান জোট সম্প্রসারণ হয়েছে ১৭ বছরজুড়ে। রাজনৈতিক দলগুলোর নিরন্তর চেষ্টা এবং কৌশলের কমতি ছিল না। কিন্তু কিছুতেই ফ্যাসিবাদকে কাবু করা সম্ভব হচ্ছিল না। বরং ফ্যাসিবাদ দিনে দিনে যেন আরও জেঁকে বসছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে দফায় দফায় ঠেকিয়ে দিতে সক্ষম হয়ে একরকম নগ্ন উল্লাসে মেতেছিল ফ্যাসিবাদীরা। কর্মসূচি নিয়ে ওবায়দুল কাদেররা নানাভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও উপহাস কম করেনি। ২০২৪ সালের জুলাই তাদের সব হিসাব পাল্টে দেয়। সূচনা হয়েছিল চাকরিতে কোটা পদ্ধতি ও বৈষম্যকে ঘিরে। দাবি উঠেছিল কোটাপদ্ধতির সংস্কারের। স্লোগান উঠেছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে। বরাবরের মতোই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য এবং উপহাসমূলক বার্তা ফ্যাসিবাদের পক্ষ থেকে। নির্যাতন-নিপীড়ন ও সর্বোপরি গণহত্যা উপেক্ষা করে বৈষম্যবিরোধী স্লোগান ধীরে ধীরে রূপ নেয় গণআন্দোলনে। সবশেষে আগস্টের ৩ তারিখে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয় একদফা। শেখ হাসিনাকে বিদায় নিতে হবে।


রাজনৈতিক দলগুলোকে আড়ালে রেখে গড়ে উঠেছিল এই অবিশ্বাস্য গণআন্দোলন। দৃশ্যপটে কোনো রাজনৈতিক দল নেই। কোনো একক নেতৃত্বের চেহারা তো দূরে থাক, অবয়ব পর্যন্ত নেই। যেন রাজপথে নেমে আসা লাখো মানুষের প্রত্যেকেই এই আন্দোলনের নেতৃত্বে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ জীবনবাজি রেখে রাজপথ আগলে রাখার চেষ্টায়। এ আন্দোলন শুধু দেশে নয়; ছড়িয়ে পড়েছিল বিদেশের মাটিতেও। দিনরাত কর্মে ব্যস্ত থাকা প্রবাসীরাও বসে থাকেননি। এমনকি রাজপথে প্রকাশ্যে কর্মসূচি নিষিদ্ধের একনায়কতান্ত্রিক দেশেও প্রবাসীরা নেমে এসেছিলেন রাজপথে। পরিণতিতে তাদের খেসারতও দিতে হয়েছিল। ইউরোপ-আমেরিকার মতো গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে প্রতিদিনই কর্মসূচি ছিল। বাংলাদেশ অ্যাম্বেসি-হাইকমিশন ঘেরাও হয়েছে দেশে-দেশে। সর্বশেষ রেমিট্যান্স বন্ধ করে বড় ধাক্কা দিয়েছিলেন দেড় কোটি প্রবাসী। মোটকথা, সার্বজনীন অংশগ্রহণ বাংলাদেশকে এক নতুন স্বপ্ন দেখার সুযোগ এনে দেয় ৫ আগস্ট (২০২৪)। এই ৫ আগস্টকে ৩৬ জুলাই বলেও মূল্যায়ন করেন অনেকে।


জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত। বিরামহীন চলেছে জুলাইজুড়ে। মসনদ টিকিয়ে রাখতে ফ্যাসিবাদীরা খুনের নেশায় মেতে উঠেছিল রাজপথে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী ১৪ শতাধিক তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে ফ্যাসিবাদের বুলেট। এর মধ্যে রয়েছেন শিশু-কিশোর ও নারী। নিহতদের মধ্যে ছিলেন মসজিদের ইমাম, কোরআনে হাফেজ, সাংবাদিক, রিকশাচালক, মাদ্রাসাছাত্র, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণ। আহত হয়েছেন কুড়ি হাজারের বেশি। দুই চোখ হারিয়ে আজীবনের জন্য দৃষ্টিহীন হয়েছেন কয়েক শ’। আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করেছেন আরও কয়েক হাজার। নিহত-আহতদের মধ্যে দল পরিচয়হীন মানুষের সংখ্যাই বেশি। এসব পরিবারের কেউ কখনো দেশ পরিচালনা করার চিন্তাও করতে পারবে না। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অনেকের। তাদের প্রত্যাশা বৈষম্যহীন, ন্যায়বিচার ও ইনসাফের দেশ হবে। এটুকুই তাদের চাওয়া।


রাজপথে এরকম একটি সার্বজনীন অংশগ্রহণ নিকট অতীতে দেখা যায়নি। সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মতোই রাজপথে ছিল জনস্রোত। জনগণের বাঁধভাঙা জোয়ার দেখে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। তাঁর পলায়নে হতাশ হয়ে মন্ত্রিপরিষদ, মাত্র ৬ মাস আগে অপ্রতিরোধ্য একতরফা নির্বাচনে বিজয়ী সকল সংসদ সদস্য, এমনকি জাতীয় মসজিদের খতিব পর্যন্ত পালিয়ে যান। পালিয়ে গেছেন ফ্যাসিবাদের সহযোগী সামরিক ও বেসামরিক সরকারি চাকরিজীবী কর্তারাও।


৩৬ দিনের টানা অনবদ্য লড়াইয়ে বীর জনতা বিজয়ী হয়ে ঘরে ফেরেন। প্রতিটি থানা থেকে পালিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। ফ্যাসিবাদ পতনের পর দেশে কোনো পুলিশ ব্যবস্থা ছিল না কয়েক সপ্তাহ। দৃশ্যত এই লড়াই চলাকালে একক কোনো নেতৃত্বের অস্তিত্ব কোথাও দেখা যায়নি। ৩৬ দিনের লড়াইয়ে কোনো একটি স্পটে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর নামে স্লোগান দিতে শোনা যায়নি। একক নেতৃত্বের অস্তিত্ববিহীন, নেতা-নেত্রীর নামে স্লোগানবিহীন একটি লড়াই দেখেই সাধারণ মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিলেন। মনে করেছিলেন এবার হয়তো সঠিক পথে উঠবে দেশ।


কায়েমি স্বার্থবাদীরা দীর্ঘ ৫৪/৫৫ বছর নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে শাসন-শোষণ করেছে। আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন কিছু পরিবার ও শাসকগোষ্ঠীর চামচারা। সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র ছিল বহাল তবিয়তে। যে আমলাতন্ত্র ব্রিটিশরা তৈরি করেছিল শোষণের লক্ষ্যে। শোষণের কৌশলে ব্রিটিশদের তৈরি এ আমলাতন্ত্র ব্যবহার করেই স্বাধীনতা-পরবর্তী শাসকরা শোষণ করেছেন। যদিও খোদ ব্রিটেনে এরকম কোনো আমলাতন্ত্রের অস্তিত্ব নেই। সম্পূর্ণ জনকল্যাণমুখী শাসনব্যবস্থা তৈরি করেছে ব্রিটিশরা নিজেদের জন্য। উপনিবেশগুলোর জন্য ছিল শোষণমূলক আমলাতন্ত্র। যাক, এটি ভিন্ন বিষয়। আমার আলোচনা জুলাই নিয়ে। প্রসঙ্গক্রমে এখানে একটু টাচ দিলাম।


দীর্ঘ দুই শ’ বছরের ব্রিটিশ শোষণ ও শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। টানা ১৯০ বছরের লড়াইয়ে পূর্বপুরুষরা ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা আনেন ব্রিটিশদের থেকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল অধিকার রক্ষা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে। আমাদের ধর্মীয় সংস্কৃতি নিয়ে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার লক্ষ্যে ১৯৪৭ সালে অর্জিত স্বাধীন রাষ্ট্র দুই ভাগ হয় বৈষম্যকে কেন্দ্র করে। তৈরি হয় দুটি মানচিত্র নিয়ে দুই স্বাধীন রাষ্ট্র। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মাধ্যমে মানচিত্রের পূর্ব পাকিস্তান নামটি মুছে দিয়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ হয়েছিলাম। এরপর অতিক্রম করেছে দীর্ঘ ৫৪/৫৫ বছর। ১৯৭১ সালে যে লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মানুষ শোষণ থেকে মুক্তির জন্য লড়াই করেছিল তা অর্জনে ব্যর্থ হয় এই মানচিত্রের আমজনতা। ১৯৭১ সালের মুক্তির মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই মানুষকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এর কোনোটাই দেশে মানুষ অর্জন করতে পারেনি। বরং উল্টো পথে চলেছে শুরু থেকেই। সাম্যের বদলে বৈষম্য বেড়েছে দিনে দিনে। মানবিক মর্যাদার পরিবর্তে মানুষের জীবন হয়েছে দিনে দিনে আরও মূল্যহীন। সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিবর্তে অন্যায়-অবিচার বেড়েছিল। আদালতগুলো দলদাসত্বে আবদ্ধ হয়েছিল। বিচারকরা ন্যায়বিচার করতে চাইলেও পারতেন না। শাসকগোষ্ঠীর ইচ্ছার বাইরে গেলেই শাস্তি ছিল অবধারিত।


ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে শেখ হাসিনার পতনের পর মানুষ নতুন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখে। বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর ছিল মানুষের সার্বজনীন আস্থা ও বিশ্বাস। সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে ৩টি প্রতিশ্রুতি দিলেন তিনি। সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। মানুষ বুকভরা প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে থাকেন তাঁর এই প্রতিশ্রুতির দিকে। ঘুণেধরা শোষণতান্ত্রিক আমলাতন্ত্রের সংস্কার হবে। যে পদ্ধতিগুলোর ওপর ভিত্তি করে ৫৪ বছর মানুষ শুধু প্রতারিত হয়েছেন। শোষণের শিকার হয়েছেন। সংস্কারের মাধ্যমে সেগুলোকে দূর করা হবে। জনকল্যাণমুখী জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রপদ্ধতি তৈরি হবে।


মানুষের প্রত্যাশা ছিল প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যাসিবাদ আমলে গুম-খুন এবং জুলাই গণহত্যার সুষ্ঠু, ন্যায়বিচার হবে। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দ্বার উন্মোচিত হবে। সংস্কার এবং বিচার সম্পন্ন হওয়ার পরই সবশেষে অনুষ্ঠিত হবে একটি অবাধ ও জাতীয় নির্বাচন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এ প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন, সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় হয়েছে এখন। সাধারণ মানুষ বিচার ও বিবেচনা করবেন। না পারলে কেন পারেননি, সেটাও অনুসন্ধান এবং বিশ্লেষণের দাবি রাখে।


ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংস্কারের লক্ষ্যে দৃশ্যমান কিছু কমিশন গঠন করেন। কমিশনগুলো নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সুপারিশ পেশ করেছেন। এর মধ্যে প্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ পেশ করার আগেই ব্রিটিশদের তৈরি শোষণতান্ত্রিক আমলাতন্ত্র থেকে বিদ্রোহ দেখা গেছে। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন কী করা যাবে এবং কী করা যাবে না। মানে কর্তার ইচ্ছায় নয়, কর্মীর ইচ্ছাতেই হতে হবে কর্ম। তখনই ধরে নিয়েছিলাম এই জায়গায় সংস্কার হয়তো সহজ হবে না। তারপরও প্রশাসন সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন, নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিশন, দুর্নীতিদমন কমিশন সংস্কার কমিশনসহ প্রতিটি কমিশন তাদের সুপারিশে কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছে। সবমিলিয়ে একটি সনদ তৈরির জন্য আরেকটি উচ্চপর্যায়ের কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন খোদ প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। তৈরি হয় জুলাই সনদ। একটি দল কমিশনের সুপারিশের আলোকে আলোচনার মাধ্যমে তৈরি সনদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দেয়। মানে তারা আপাতত মানলেও এগুলো পুরোপুরি মানেন না। এই দলটি এখন ক্ষমতায়।


বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০০০ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার অন্যতম ছিল স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা। এরপর কোনো রাজনৈতিক সরকার এটি বাস্তবায়ন করেনি। নানা টালবাহানা দেখিয়ে সময় নিয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল। এটির কার্যক্রমও শুরু করেছিল।


উচ্চ আদালতে বিচার নিয়োগের বিধান তৈরি করার তাগিদ ছিল স্বাধীনতার পর থেকেই। কোনো রাজনৈতিক সরকার এটা তৈরি করেনি। উচ্চ আদালত নিজেদের কবজায় রাখতে দলীয় লোককে বিচারক নিয়োগের পথ খোলা রাখতে চেয়েছেন প্রতিটি সরকার। যদিও ১/১১-এর জরুরি আইনের সরকার একবার বিচারক নিয়োগ পদ্ধতি আইন তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে শেখ হাসিনা সরকার এসে এটা হাইকোর্টের মাধ্যমেই আবার বাতিল করায়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার দায়িত্ব নিয়েই এই আইন তৈরি করেন। এ আইনের আওতায় যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে দুই দফা বিচারকও নিয়োগ দেওয়া হয় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।


দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, তারেক রহমানের সরকার দায়িত্ব নিয়ে এই দু’টি আইন বাতিল করে দিয়েছে। কেন তারা বাতিল করে দিয়েছে, সেটা বিচার ও বিবেচনার ভার পাঠকের হাতেই ছেড়ে দিলাম।


মানুষের অধিকার সুরক্ষার তাগিদে জবাবদিহিতার জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনের দাবি ছিল দীর্ঘদিন থেকে। শেখ হাসিনা সরকার একটি নামমাত্র জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করেছিল। ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধিরাম সরদারের মতোই ছিল এ প্রতিষ্ঠান।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বাধীন তদন্তের জন্য সুযোগ দিয়ে জাতীয় মানবাধিকার আইনের সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। এ আইনের আওতায় কমিশনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের। তারেক রহমানের সরকার এ আইন বাতিল করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আগের জায়গায় নিয়ে গেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ দেওয়া চেয়ারম্যান-কমিশনারও পদত্যাগ করে চলে গেছেন। তারা ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সরদার হয়ে থাকতে চাননি।


গুমের স্বাধীন তদন্ত এবং বিচারের জন্য গুম অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এটিও বাতিল করেছে নির্বাচন-পরবর্তী সরকার।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শুরু করা সংস্কারগুলোকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ছিল সকলের। কিন্তু সেটার পরিবর্তে সরকার উল্টো পথে হাঁটছে শুরুতেই।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জনগণের অভিমত নেওয়া হয় গণভোটের মাধ্যমে। কাস্টিং ভোটের ৭০ শতাংশ জুলাই সনদ অনুমোদন করে বাস্তবায়নের পক্ষে রায় দেয়। নির্বাচনের পর দুটি শপথ নিয়ে নির্বাচিত সদস্যরা জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে সংবিধান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ছিল জুলাই সনদে। কিন্তু নির্বাচনের পর এ প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে বিএনপি। উল্টো গণভোট নিয়ে নানারকম তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যমূলক বক্তব্য শোনা যায় মন্ত্রীদের মুখে। জুলাই সনদ ৬ মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। সরকারের ৬ মাস পার হয়ে গেছে। তারা শুধু মুখেই বলছেন স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে। একদিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের শুরু করা সংস্কারগুলো বন্ধ করে পুরাতন পদ্ধতিতে ফিরে গেছে। আরেকদিকে বলছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে।


মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার প্রত্যাশিত সংস্কারগুলোকে বাস্তবায়ন করে গেলে এখন এতটা জটিলতা তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকত না। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার এই জায়গায় পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে গেছেন। এর জন্য একদিন হলেও তাঁকে মানুষের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।


বর্তমান সরকারের উল্টো পথে চলার নীতি দেখে স্পষ্ট করেই বলা যায়, জুলাই অভ্যুত্থান বা বিপ্লব অসমাপ্ত রয়ে গেছে। মানুষের প্রত্যাশিত রাষ্ট্র সংস্কার এবং জবাবদিহিমূলক জনকল্যাণমুখী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত জুলাই অভ্যুত্থান চলমান থাকবে। প্রয়োজনে মানুষ আবারও রাজপথে নামবে জুলাই শহীদদের রক্তের ঋণ আদায়ে।


লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন:
অলিউল্লাহ নোমান

অলিউল্লাহ নোমান

Author

সম্পর্কিত খবর

মক্কায় ড্রোন ও ইসরায়েল প্রসঙ্গ

মক্কায় ড্রোন ও ইসরায়েল প্রসঙ্গ

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পরিচ্ছন্ন পরিপাটি অর্থনৈতিক অগ্রগতি

পরিচ্ছন্ন পরিপাটি অর্থনৈতিক অগ্রগতি

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইগোর রাজনীতি নাকি জনস্বার্থ?

ইগোর রাজনীতি নাকি জনস্বার্থ?

৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আমার, আমাদের জুলাই

আমার, আমাদের জুলাই

৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভিডিও

সব দেখুন
সরকার কেমন করছে?

সরকার কেমন করছে?

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ভারত কেন তারেক রহমানকে দিল্লি নিতে মরিয়াি

ভারত কেন তারেক রহমানকে দিল্লি নিতে মরিয়াি

২৯ আগস্ট, ২০২৬
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে কৌতূহল

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে কৌতূহল

১৫ আগস্ট, ২০২৬

জনপ্রিয় খবর

মক্কায় ড্রোন ও ইসরায়েল প্রসঙ্গ

মক্কায় ড্রোন ও ইসরায়েল প্রসঙ্গ

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জুলাই বিপ্লবের আবাবিল পাখিরা

জুলাই বিপ্লবের আবাবিল পাখিরা

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
মক্কায় ড্রোন: সৌদির দাবি; হুতিদের না

মক্কায় ড্রোন: সৌদির দাবি; হুতিদের না

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
পুলক ভাগ‍্যবান!

পুলক ভাগ‍্যবান!

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ক্যাটাগরি

  • দেশ>
  • রাজনীতি ও পলিসি>
  • অর্থকড়ি>