
চলমান জ্বালানি অস্থিরতা ও চরম আইনশৃঙ্খলা অবনতির মধ্যে সরকার দেশের ব্যাংক খাতকে মাফিয়াদের হাতে তুলে দিতে নতুন ষড়যন্ত্র করছে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ শ্রেণিকরণের মেয়াদ তিন মাস থেকে বাড়িয়ে নয় মাস করার কথা বিবেচনা করছে। আমরা এই বিপর্যয়কারী উদ্যোগের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি ও সকল বিবেচনাবোধের বাইরে এসে এমন সিদ্ধান্ত হচ্ছে দুর্বৃত্ত পোষার নির্লজ্ব মানুষিকতা। এটি ব্যাংকিং সংস্কারের বিপরীত পদক্ষেপ।
এক. সংজ্ঞা বদলে এক টাকাও আদায় হয় না
শ্রেণিকরণের মেয়াদ বাড়ালে ব্যাংকের একটি টাকাও ফেরত আসে না। আওয়ামীলীগ এসব করে ব্যাংক খাতকে বিপর্যস্ত করে গেছে। বিএনপি একই পথে হাঁটছে।
এতে কোনো খেলাপি ভালো ঋণগ্রহীতায় পরিণত হয় না, কেবল কাগজের সংখ্যাটি ছোট দেখাবে।
জুন ২০২৬ শেষে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। এই সংখ্যা এত বড় হয়েছে কারণ ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে কার্যকর কঠোর শ্রেণিকরণ বিধি এবং স্বাধীন সম্পদমান নিরীক্ষা মিলে এতদিনের লুকানো ক্ষত প্রকাশ করেছে। এটি নীতির ব্যর্থতা নয়, বরং নীতির সাফল্য।
এখন সংজ্ঞা শিথিল করার অর্থ দাঁড়ায়, স্বচ্ছতার শাস্তি হিসেবে স্বচ্ছতাকেই বাতিল করা।
সরকারকে বলতে চাই, থার্মোমিটার ভেঙে ফেললে জ্বর কমে না।
দুই. ভারত ঠিক উল্টো পথে হেঁটেছে
ভারত ২০০৪ সাল থেকে ৯০ দিনের আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করছে। ২০১৮ সালে দেশটির মোট এনপিএ অনুপাত ১১.১৮ শতাংশে উঠেছিল। রিজার্ভ ব্যাংক তখন সংজ্ঞা শিথিল করেনি।
তারা ধারাবাহিকভাবে চারটি পলিসি করেছিল।
-২০১৫ সালে সম্পদমান নিরীক্ষা (এসেট ইভালুয়েশন) চালু করে লুকানো ঋণ প্রকাশ্যে আনা।
-২০১৬ সালে দেউলিয়া আইন প্রণয়ন করে খেলাপি মালিকের হাত থেকে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া।
-২০১৯ সালে সময়াবদ্ধ সমাধান কাঠামো। এবং
-ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া থেকে নিষিদ্ধ করা।
ফল খুবই ভালো হয়েছিল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ভারতের মোট এনপিএ অনুপাত ২.১ শতাংশ, যা কয়েক দশকের সর্বনিম্ন। আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হলো, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনপিএ হ্রাসের ৪২.৮ শতাংশই এসেছে প্রকৃত আদায় ও মানোন্নয়ন থেকে, সংজ্ঞা পরিবর্তন বা কোনও পরিসংখ্যান কারসাজি থেকে নয়।
তিন. ভিয়েতনামও থার্মোমিটার ভাঙেনি
ভিয়েতনামে ৯০ দিনের বেশি বকেয়া ঋণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে খেলাপি শ্রেণিতে যায়। এই মান তারা কখনো শিথিল করেনি। খেলাপি বাড়লে তারা সংজ্ঞায় হাত দেয়নি, আদায়ের হাতিয়ারে হাত দিয়েছে। ২০১৭ সালে রেজল্যুশন ৪২ দিয়ে ব্যাংককে জামানত দখলের সরাসরি অধিকার দেওয়া হয়। মাসিক গড় আদায় বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়। ২০২৩ সালের শেষে ওই আইন মেয়াদোত্তীর্ণ হলে এবং নতুন আইনে দখলের অধিকার বাদ পড়লে আদায় আবার থমকে যায়। ভিয়েতনাম তখন সংজ্ঞা বদলায়নি। তারা ২০২৫ সালে আইন সংশোধন করে দখলের অধিকার ফিরিয়ে এনেছে। দুটি দেশের শিক্ষা অভিন্ন। মাপকাঠি ঠিক রাখো, আদায়ের ক্ষমতা বাড়াও।
চার. আমাদের দাবি
১। ৯০ দিনের শ্রেণিকরণ বিধি অপরিবর্তিত থাকতে হবে। মেয়াদ বাড়ানোর সব আলোচনা অবিলম্বে বন্ধ হোক এবং বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশ্যে অবস্থান জানাক।
২। ২০২৭ সালের মধ্যে আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হোক। IFRS-9 এ বকেয়ার বদলে ঝুঁকির মূল্যায়ন কাজ করে যা ৯ মাসের প্রস্তাবের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত। আইএফআরএস-৯ মতে, কিস্তি বন্ধ হওয়ার অপেক্ষা না করে ঝুঁকি বাড়ার মুহূর্তেই প্রভিশন রাখতে হবে। ব্যাংকং বিপর্যয়ের পরেও বাংলাদেশ ব্যাংক কিস্তি বন্ধ হওয়ার পরও নয় মাস অপেক্ষা করতে চায়। দুটি একসঙ্গে চলতে পারে না। মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য একটি পর্যায়ক্রমিক রূপান্তর পরিকল্পনা সহ বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৭ সালের মধ্যে আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। সংজ্ঞা পিছিয়ে দিয়ে সেই অঙ্গীকার রাখা সম্ভব নয়।
৩। খেলাপি ও পুনঃতফসিলকৃত ঋণগ্রহীতাকে নতুন ঋণে ঝুঁকিভিত্তিক অতিরিক্ত সুদ ও কঠোর শর্ত দিতে হবে। আজকের ব্যবস্থায় একজন খেলাপি এবং একজন নিয়মিত পরিশোধকারী প্রায় একই শর্তে ঋণ পান। এটিই নৈতিক বিপর্যয়ের উৎস। খেলাপির ইতিহাসের একটি দাম থাকতে হবে, এবং সেই দাম তাকেই দিতে হবে।
৪। ৩১ আগস্টের পুনঃতফসিল সার্কুলারের প্রয়োগ বড় এক্সপোজারের ক্ষেত্রে স্থগিত থাকুক (১০ কোটির উপর), যতক্ষণ না সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এর প্রভাব মূল্যায়ন করে।
৫। সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন এবং অর্থঋণ আদালত আইনের সংশোধনী আগে পাস হোক। আদায়ের আইন তৈরি না করে সংজ্ঞা শিথিল করার আলোচনা অগ্রহণযোগ্য।
৬। বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঘোষণার প্রক্রিয়া এবং সময়াবদ্ধ আইনি ব্যবস্থা চালু হোক।
খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি আমানতকারীর টাকার নিরাপত্তা, বিনিয়োগকারীর আস্থা এবং রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। যে সংখ্যা সংজ্ঞা বদলে খালাপি কমানো হয়, বাজার সেই সংখ্যা বিশ্বাস করে না। ঋণদাতা করে না, আমানতকারী করে না, বিদেশি অংশীদারও করে না। আমরা দাবি করছি, বাংলাদেশ ব্যাংক এই উদ্যোগ থেকে প্রকাশ্যে সরে আসুক এবং আন্তর্জাতিক প্রমিত মান থেকে বর্তমানে যেসব বিচ্যুতি রয়েছে, তার একটি পূর্ণ তালিকা ও সংশোধনের সময়সীমা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপন করুক।
স্বচ্ছতার শাস্তি হিসেবে স্বচ্ছতাকে বাতিল করবেন না, খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা বদলে সংকট আড়াল করার উদ্যোগ অবিলম্বে প্রত্যাহার করুন
(হাসনাত আবদুল্লাহ সংসদ সদস্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য। লেখকের ফেইসবুক থেকে নেয়া।)

Author