
শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী কবে হবে?
প্রশ্নটি আজ শুধু কোনো একটি দেশের নয়, যেন বিশ্বের নানা প্রান্তের বাস্তবতা থেকে উঠে আসছে। কোথাও যুদ্ধের বোমায় ছিন্নভিন্ন হচ্ছে শিশুদের শরীর, কোথাও ক্ষুধা ও অনাহারের নির্মমতায় হারিয়ে যাচ্ছে আগামী প্রজন্ম। আবার কোথাও মাত্র একটি ললিপপ কিংবা চকলেটের প্রলোভন দেখিয়ে শিশুকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হচ্ছে। কোথাও একটি মোবাইল ফোনের মতো সামান্য একটি জিনিসের জন্যও প্রাণ দিতে হচ্ছে একটি শিশুকে।
শিশুদের জন্য যে পৃথিবী নিরাপদ হওয়ার কথা, সেই পৃথিবীতেই আজ তাদের জীবন নানা ধরনের সহিংসতা, লোভ, যুদ্ধ, ক্ষুধা ও অপরাধের কাছে অনিরাপদ হয়ে উঠছে।
শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় মায়ের মোবাইল ফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয়েছিল ১৩ বছরের অপ্রতিম। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি সে। পরিবারের পাশাপাশি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় তাকে খুঁজতে থাকে। প্রায় ২১ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের পাশের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে এবং সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি কীভাবে ঘটল, অপ্রতিমের মৃত্যুর কারণ কী এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। শনিবার রাতে পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজসহ প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে তুহিন, আনাস ও ফাহিম নামে তিনজনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ বলেছে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং তদন্ত চলমান। অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
তবে আটক বা গ্রেপ্তার হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়; তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়াতেই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।
অপ্রতিমের ঘটনাটি তাই এই মুহূর্তে একটি তদন্তাধীন শিশুমৃত্যুর ঘটনা। কিন্তু ঘটনাটি সামনে আসতেই আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে আসে—দেশে শিশুদের এমন মৃত্যুর চিত্র কতটা বড়, এবং সেই ঘটনাগুলোর বিচার কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?
বাংলাদেশে শিশুদের ওপর সহিংসতা ও শিশুমৃত্যুর কোনো একক সরকারি, কেস-ভিত্তিক প্রকাশ্য জাতীয় ডেটাবেস খুজে পাওয়া যায় নি। ফলে শিশুদের মৃত্যু ও সহিংসতার প্রবণতা বুঝতে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নথি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। Ain o Salish Kendra (ASK) নিয়মিত সংবাদপত্র ও অন্যান্য প্রকাশিত সূত্রের ভিত্তিতে শিশু নিহতের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। তাদের ওয়েবসাইটে ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মাসভিত্তিক ও বার্ষিক পরিসংখ্যানের পৃথক তালিকাও রয়েছে।
ASK-এর নথি অনুযায়ী, ২০২১ সালে ৫৯৬, ২০২২ সালে ৫১৬, ২০২৩ সালে ৪৮৫, ২০২৪ সালে ৫৭৪ এবং ২০২৫ সালে ৪১০ শিশু নিহত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। পাঁচ বছরে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ২ হাজার ৫৮১।
জানুয়ারি-আগস্ট ২০২৬-এর নথিতে ২৫৪ শিশুর নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ৮১টি ঘটনায় মামলা দায়েরের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। নথিতে নিহত শিশুদের বয়স, মৃত্যুর ধরন এবং ঘটনার প্রকৃতিও আলাদাভাবে দেখানো হয়েছে।
শিশু মৃত্যুর সংখ্যা জানার পর স্বাভাবিকভাবেই পরের প্রশ্ন আসে—এসব ঘটনার কতগুলোর বিচার হয়েছে? এখানেই তথ্যের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়। একটি শিশুর মৃত্যু বা হত্যার ঘটনা সাধারণত প্রথমে পুলিশি তদন্তে যায়। এরপর মামলা, তদন্ত, গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ, ফরেনসিক পরীক্ষা, অভিযোগপত্র, সাক্ষ্যগ্রহণ, বিচারিক রায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স বা আপিল—এমন একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়।
কিন্তু এই প্রতিটি ধাপকে একই শিশুর ঘটনা ধরে এক জায়গায় যুক্ত করার মতো প্রকাশ্য জাতীয় কেস-ট্র্যাকিং ব্যবস্থা না থাকায়, পাঁচ বছরে কত শিশু নিহত হয়েছে—এমন একটি সংখ্যা পাওয়া গেলেও, সেই একই ঘটনাগুলোর কতটিতে মামলা হয়েছে, কতটিতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে,
কতটি বিচারাধীন, কতটিতে সাজা হয়েছে এবং কতটি মামলা শেষ পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে—তার একটি সমন্বিত চিত্র পাওয়া কঠিন।
মানবাধিকার সংগঠন, এনজিও এবং সংবাদ মাধ্যমের থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী গত ৫ বছরের ২৫৮১ শিশু হত্যা হলেও সাজা হয়েছে মাত্র ২৪ জনের।
Author