
তেলাপোকারও যে শক্তি আছে, আর সেই তেলাপোকারা একজোট হলে দিল্লির মসনদও কাঁপতে পারে—সেটিই যেন নতুন করে প্রমাণ করল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথ।
যাদের একসময় তাচ্ছিল্য করে ‘তেলাপোকা’ বলা হয়েছিল, আজ তারাই হাজার হাজার তরুণের কণ্ঠে পরিণত হয়েছে। হাতে হাত রেখে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা এমন এক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে, যা কেবল একটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ নয়; বরং ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা হিসেবে যাত্রা শুরু করা ককরোচ জনতা পার্টি (Cockroach Janata Party-CJP) আজ ভারতের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে। যে উপমা দিয়ে তরুণদের অপমান করা হয়েছিল, সেই উপমাকেই তারা প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করেছে। আর সেই প্রতীক এখন দিল্লির ক্ষমতার কেন্দ্রকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হওয়া ছাত্র-যুব আন্দোলন এখন আর কেবল একটি ভর্তি পরীক্ষা বা প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সরকারের জবাবদিহির দাবিকে সামনে রেখে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন ধীরে ধীরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে।
সোমবার ভোরে হাজারো শিক্ষার্থী ও তরুণ যন্তর মন্তরে জড়ো হয়ে পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রার চেষ্টা করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অংশুকা রুথ দাস। বন্ধুদের সঙ্গে প্ল্যাকার্ড হাতে তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগ দেন।
অংশুকা বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, তাদের জন্যই তিনি রাস্তায় নেমেছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের বিতর্কিত পরীক্ষার পর অন্তত ১২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।
আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারতের ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (NEET)। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগের জন্য প্রতিযোগিতা করে। কিন্তু চলতি বছর প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হওয়ার পর লাখো পরীক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়, যা দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
এই ক্ষোভ থেকেই দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)। শুরুতে এটি ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা। পরে সেটিই শিক্ষার্থী ও বেকার তরুণদের অসন্তোষের প্রতীকে পরিণত হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই সংগঠনটি লাখো তরুণের সমর্থন লাভ করে এবং একটি সংগঠিত আন্দোলনের রূপ নেয়।
সংগঠনটির নেতা অভিজিৎ দিপকে দেশে ফিরে আন্দোলনের নেতৃত্বে সক্রিয় হন। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেন।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। মেট্রো স্টেশন বন্ধ, সড়কে ব্যারিকেড এবং ইন্টারনেট সেবা সীমিত করার পাশাপাশি যন্তর মন্তরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। প্রশাসনের দাবি ছিল, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে পদযাত্রা শুরু হওয়ার পর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। অনেককে আটক করা হয় এবং অসংখ্য আন্দোলনকারী আহত হন। অন্যদিকে, পুলিশের দাবি, সহিংসতা, ভাঙচুর ও পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।
এর আগে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ২০ দিন ধরে অনশনরত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে পুলিশ জোরপূর্বক হাসপাতালে নিয়ে গেলে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, এই ঘটনা সরকারের কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনের তাৎপর্য শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার সংকটে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ভারতের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে তরুণদের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সাবা নাকভির মতে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থান কমে যাওয়া, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক বৈষম্য তরুণদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করেছে। তাঁর মতে, এই বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্ট সেইসব অঞ্চলে, যেখান থেকে বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক সমর্থন পেয়ে এসেছে।
এদিকে আন্দোলনের মুখপাত্র সৌরভ দাস জানিয়েছেন, সরকার আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে এবং আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে.পি. নাড্ডার বৈঠক হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জবাবদিহি এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
স্বাধীন রাজনৈতিক গবেষক আসিম আলীর মতে, সরকারের আলোচনায় বসার আগ্রহ পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধির ইঙ্গিত দেয়। তবে তাঁর মতে, আন্দোলনের মূল প্রশ্ন এখন শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানের দিকে বিস্তৃত হয়েছে। ফলে এটি বিজেপির জন্য কেবল প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জেও পরিণত হতে পারে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ছিল এই আন্দোলনের সূচনা, কিন্তু এখন এটি ভারতের তরুণদের ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির দাবির প্রতীকে পরিণত হয়েছে। যে তরুণদের একসময় 'তেলাপোকা' বলে অবজ্ঞা করা হয়েছিল, তারাই আজ সংগঠিত হয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রকে জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আন্দোলনটি যদি শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বৃহত্তর ইস্যুতে আরও বিস্তৃত হয়, তবে তা মোদি সরকারের জন্য সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
Author