
একটি ঘটনা যখন প্রশাসনকে এবং ক্ষমতার মসনদকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করায়, তখন সেটি আর কোনো মামুলি ঘটনা থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে একটি জাতীয় ইস্যু। দেশের একটি পরিচিত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হঠাৎ করে রাতের আঁধারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। এটি স্বাভাবিকভাবেই একটি মারাত্মক ঘটনা।
একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। যেখানে প্রতিদিন মা ও শিশুর চিকিৎসা হয়, দেওয়া হয় সরকারি কর্মসূচির টিকা। দীর্ঘদিন ধরে আশপাশের মানুষের কাছে জায়গাটি পরিচিত ছিল স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে। সেই প্রতিষ্ঠানটিই এক রাতের হামলায় পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে।
ভেঙে ফেলা হয়েছে ভবনের দেয়াল। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে টিকা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম। লুট হয়েছে ওষুধ, যন্ত্রপাতি, নগদ অর্থ ও বিভিন্ন সামগ্রী। চেয়ার-টেবিল থেকে শুরু করে এসি, ফ্রিজ, জেনারেটর—বাদ যায়নি কিছুই।
ঢাকার মিরপুরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ঘটে এই ঘটনা। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, দুই থেকে আড়াইশ মানুষের একটি দল সেখানে হামলা চালিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর ও লুটপাট করে। দুই নিরাপত্তারক্ষীকেও জিম্মি করা হয়েছিল বলে দাবি তাদের।
ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে রাতের আঁধারে ভেঙে ফেলার অধিকার কে দিল? আরেকটি প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ—এত বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটি প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালালেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা ঠেকাতে পারল না কেন?
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। ভবনের বাইরে সরকারি টিকাদান কর্মসূচির ব্যানার টাঙিয়ে কয়েকজনকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে স্বাস্থ্য কর্মীরা। ভেতরে কাজ করার মতো পরিস্থিতি না থাকায় বাইরে থেকেই টিকাদান চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের দাবি, হামলার সময় সরকারি ইপিআই কর্মসূচির টিকা ও ওষুধ, আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, ফ্রিজ, এসি, আসবাবপত্র ও নগদ অর্থ লুট করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, ভাঙচুর ও লুটপাটে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ টাকা।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের অবস্থান ছিন্নমূল শপিং কমপ্লেক্সের পেছনে। আশপাশে রয়েছে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাজার। ঘটনার পর সেখানে থাকা সাইনবোর্ডে লেখা ‘জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ থেকে বরাদ্দ পাওয়া এবং রেজিস্ট্রি মূলে ওই ১০ কাঠা জমির মালিক ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’।
স্থানীয়রা জানান জমিটি নিয়ে কয়েক বছর ধরেই বিরোধ চলছে। তবে সমিতিটির প্রকৃত মালিকানা, জমি বরাদ্দের ইতিহাস কিংবা রাড্ডা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জমির বিরোধের আইনি অবস্থান সম্পর্কে স্থানীয়ভাবে কেউ সঠিক তথ্য দিতে পারেন নি।
রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার শাহ আলী থানায় করা মামলায় দাবি করেছেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে সরকারি চুক্তির মাধ্যমে তারা ওই জমি ব্যবহার করছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সাল থেকে সরকারের কাছ থেকে জমিটি ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে সেখানে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। বিভিন্ন সময়ে চুক্তিও নবায়ন করা হয়েছে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বাদী হয়ে শাহ আলী থানায় মামলা করেছেন। মামলায় হানিফ মিয়া নামে একজনের পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০০ থেকে ২৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, হামলার পর প্রতিষ্ঠানটির দেয়ালে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নামে ব্যানার টাঙানো হয়।
অভিযোগের বিষয়ে সমিতির সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ বলছে, ঘটনাটি জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, কারা হামলায় অংশ নিয়েছে এবং লুটপাটের সঙ্গে কারা জড়িত—সবই তদন্তের আওতায় রয়েছে।
তিনি জানিয়েছেন, ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে। এ জন্য তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তার বক্তব্য, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের কার্যক্রম নতুন নয়। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর এলাকায় মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে এর কার্যক্রম শুরু হয়। প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা, শিশুদের টিকাদান এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে মিরপুর ও পল্লবী এলাকার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের একটি অংশ এই প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভর করে আসছে। ফলে একটি জমির মালিকানা বিরোধের মধ্যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবকাঠামো ধ্বংস এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম লুটের ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদের ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতাও জড়িত।
বিশেষ করে সরকারি টিকাদান কর্মসূচির সরঞ্জাম ও টিকা ক্ষতিগ্রস্ত বা লুট হয়ে থাকলে বিষয়টি আরও গুরুতর। এসব সামগ্রীর হিসাব, নিরাপত্তা এবং ব্যবহারের ধারাবাহিকতা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের বিষয় হওয়া প্রয়োজন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খানও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকতেই পারে; কিন্তু সেই বিরোধের সমাধান আদালতে হওয়া উচিত, রাতের আঁধারে ভাঙচুরের মাধ্যমে নয়।
Author