
কল্পনা করুন, সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা বানিয়ে দিচ্ছে রোবট, অফিসের কাজ করছে এআই, বাজারও পৌঁছে যাচ্ছে স্বয়ংক্রিয় ড্রোনে। এমন এক পৃথিবীতে যদি সবকিছুই সহজলভ্য হয়, তাহলে পকেটে টাকা রাখার দরকারই বা কী? এমনই এক ভবিষ্যতের ছবি এঁকেছেন বিশ্বের অন্যতম ধনী উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক।
সম্প্রতি এক পডকাস্টে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাস্ক দাবি করেন, ২০৩৬ সালের মধ্যে অর্থের গুরুত্ব অনেকটাই কমে যেতে পারে। তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবট এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে, যেখানে তারা মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি পণ্য ও সেবা উৎপাদন করতে পারবে।
মাস্কের ভাষায়, মানুষ মূলত খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন ও বিনোদনের মতো প্রয়োজন মেটাতে অর্থ ব্যবহার করে। কিন্তু যদি এআই ও রোবট এত বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করতে পারে যে সবার জন্য পর্যাপ্ত পণ্য ও সেবা সহজেই পাওয়া যায়, তাহলে অর্থের প্রয়োজনীয়তাই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
তার ভাষায়, “যদি রোবট ও এআই মানুষের চেয়ে বেশি পণ্য ও সেবা তৈরি করতে পারে এবং সেগুলো সবার জন্য পর্যাপ্ত থাকে, তাহলে অর্থের প্রয়োজন কী?”
তবে এই আশাবাদী ভবিষ্যতের পাশাপাশি একটি বড় সতর্কবার্তাও দিয়েছেন মাস্ক। তার আশঙ্কা, ২০৩৬ সালের মধ্যে এআইয়ের বুদ্ধিমত্তা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
তিনি বলেন, মানুষের সঙ্গে শিম্পাঞ্জির বুদ্ধিমত্তার যে পার্থক্য, ভবিষ্যতে যদি এআই ও মানুষের মধ্যে তার চেয়েও বড় ব্যবধান তৈরি হয়, তাহলে মানুষও হয়তো এআইকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না—যেমন শিম্পাঞ্জিরা মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না।
মাস্কের আরও দাবি, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই এআই সম্মিলিত মানব বুদ্ধিমত্তাকেও অতিক্রম করবে। তার মতে, “মানুষ হওয়া ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রেই এআই মানুষের চেয়ে ভালো কাজ করতে সক্ষম হবে।”
তবে অর্থের গুরুত্ব কমে গেলে ভবিষ্যতে বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কেমন হবে বা প্রচলিত মুদ্রার পরিবর্তে কী আসতে পারে—সে বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
এআইয়ের অগ্রযাত্রা থামানো সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মাস্ক বলেন, “এআই ও রোবটের এই অগ্রগতি থামানোর বাস্তব কোনো উপায় আমি দেখি না। কখনও কখনও মনে হয়, সুযোগ থাকলেও হয়তো সেটি থামানো উচিত হবে না।”
এদিকে ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যানও সম্প্রতি একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার মতে, মানবসভ্যতা এমন এক যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে এআই ব্যবস্থা ক্রমেই মানুষের চেয়ে বেশি সক্ষম হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, বিশ্ব ইতোমধ্যেই প্রযুক্তিগত ‘সিঙ্গুলারিটি’র দ্বারপ্রান্তে, এমনকি সেই পর্যায়ে প্রবেশও করে থাকতে পারে।
একই সুরে কথা বলেছেন ব্রিটিশ কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও এআই গবেষক স্যার ডেমিস হাসাবিস। তার মন্তব্য, মানবসভ্যতা এখন সিঙ্গুলারিটির “পাদদেশে” দাঁড়িয়ে আছে।
তবে প্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এআই নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক সতর্ক করে বলেছে, ভবিষ্যতের উন্নত এআই ব্যবস্থা নিজের চেয়ে আরও শক্তিশালী এআই তৈরি ও পরিচালনা করতে সক্ষম হতে পারে, যেখানে মানুষের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নাও হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা পরীক্ষায় দেখা গেছে, কিছু উন্নত এআই মডেল পরীক্ষামূলক পরিবেশে বন্ধ করে দেওয়ার ঝুঁকি অনুভব করলে প্রতারণামূলক আচরণ বা ব্ল্যাকমেইলের মতো কৌশল ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। তবে অ্যানথ্রোপিক স্পষ্ট করেছে, এগুলো বাস্তব ঘটনার উদাহরণ নয়; বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য পরিচালিত নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা পরীক্ষার ফলাফল।
একইভাবে, বিভিন্ন গবেষণায়ও নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় কিছু উন্নত এআই মডেলের মিথ্যা বলা, বিভ্রান্তিকর আচরণ করা কিংবা নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য কৌশলী পদক্ষেপ নেওয়ার নজির পাওয়া গেছে।
সাম্প্রতিক এক পরীক্ষামূলক নিরাপত্তা মূল্যায়নে ওপেনএআইয়ের একটি স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট ভবিষ্যৎ সংস্করণের জন্য এমন কিছু নির্দেশনা রেখে গিয়েছিল, যেখানে অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা বা ‘স্যান্ডবক্স’ পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাব্য উপায়ের উল্লেখ ছিল। তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত গবেষণার অংশ ছিল এবং বাস্তব পরিবেশে এআই নিজে থেকে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে বেরিয়ে এসেছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের গবেষণার উদ্দেশ্য আতঙ্ক তৈরি করা নয়; বরং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকি আগে থেকেই শনাক্ত করে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
Author