
অরাজনৈতিক সংগঠন—হেফাজত নিজেদের এভাবেই পরিচয় দেয়। এ অর্থে হেফাজত একধরনের সেক্যুলার সংগঠনও বটে। রাষ্ট্র এবং ধর্মের আলাদা পথ চলা।
কিন্তু আদতে রাজনীতি ঘিরে আছে হেফাজতকে। ২০১৩ সালে তারা শেখ হাসিনাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করেন হাজার হাজার নেতাকর্মী। প্রাণ হারান অনেকে।
পরে অবশ্য হেফাজতের একটি অংশ সরকারের সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটে। বিশেষ করে আল্লামা শফীর অনুগতরা। শেখ হাসিনা ‘কওমি জননী’ উপাধি পান। তখনকার প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব হেফাজত নেতৃত্বের সঙ্গে গভীর সখ্য গড়ে তোলেন। ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর হাটহাজারী সফর করেছিলেন—বিশ্বাসযোগ্য একটি সূত্র তেমন দাবিও করেছিল।
সর্বশেষ নির্বাচনেও হেফাজতের ভূমিকা ছিল স্পষ্ট। তখন বিএনপি প্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। হেফাজত আমির প্রকাশ্যে দফায় দফায় জামায়াতের সমালোচনা করেন। সর্বশেষ কৃতজ্ঞতা জানাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছুটে গেছেন হেফাজত আমিরের সকাশে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের গল্প তাই কেবল একটি ধর্মভিত্তিক সংগঠনের উত্থানের গল্প নয়; এটি একই সঙ্গে রাষ্ট্র, ধর্ম, রাজনীতি, নির্বাচন, রাজপথ এবং ক্ষমতার হিসাব-নিকাশের গল্প। এক দশকের বেশি সময় ধরে এই সংগঠন কখনো সরকারবিরোধী আন্দোলনের বিশাল জনসমাবেশের মুখ, কখনো ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সমঝোতার অংশীদার, আবার কখনো বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সম্ভাব্য মিত্র হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
২০১৩ সালের শাপলা চত্বর থেকে শুরু করে পরবর্তী বছরগুলোর নানা রাজনৈতিক সমীকরণ—হেফাজতের পথচলায় বারবার একটি প্রশ্ন ফিরে এসেছে: হেফাজত কি নিজেই একটি রাজনৈতিক শক্তি, নাকি বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের হাতে ব্যবহৃত একটি শক্তিশালী সামাজিক ও ধর্মীয় প্ল্যাটফর্ম?

এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ হেফাজতের শক্তির উৎস শুধু মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক বা ধর্মীয় নেতৃত্বে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের বৃহৎ ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর অনুভূতি, মাঠপর্যায়ের সংগঠন, ওয়াজ-মাহফিলের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং ধর্মীয় ইস্যুতে দ্রুত জনমত সংগঠিত করার সক্ষমতা। আর এই সক্ষমতাই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে হেফাজতকে করে তুলেছে আকর্ষণীয়—কখনো আশীর্বাদ, কখনো চাপ, কখনো দর-কষাকষির হাতিয়ার।
কিন্তু এই সম্পর্কের গল্প একতরফা নয়। হেফাজতও সময়ের সঙ্গে শিখেছে রাজনীতির ভাষা। কখন কোথায় শক্তি দেখাতে হয়, কখন দাবি তুলতে হয়, কখন সংলাপে বসতে হয় এবং কখন রাজনৈতিক দূরত্ব বজায় রাখতে হয়—সেই অভিজ্ঞতা তাদেরও বদলে দিয়েছে।
ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে হেফাজত এখন আর শুধু একটি আন্দোলনের নাম নয়। এটি একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। যে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না, আবার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করাও যায় না।
কেন ২০১৩ সালের হেফাজত আর আজকের হেফাজত এক নয়? কোন রাজনৈতিক শক্তি কখন তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, কে তাদের ব্যবহার করেছে, আর কখন হেফাজত নিজেই রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে? শাপলা চত্বরের সেই রাত থেকে আজ পর্যন্ত হেফাজতের পথচলায় কতটা আদর্শ, কতটা কৌশল আর কতটা ক্ষমতার অঙ্ক?
এই গল্প সেই হিসাবেরই—বাংলাদেশের রাজনীতিতে হেফাজতের উত্থান, আন্দোলন, ব্যবহার, পালাবদল এবং আজকের অবস্থান।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু সংগঠনের উত্থান ঘটে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে, কিছু সংগঠন রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থেকেও রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের গল্পটি দ্বিতীয় ধরনের। তারা কখনো নিজেদের একটি প্রচলিত রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেনি। নির্বাচনী প্রতীক নেই, সংসদে আসন দখলের ঘোষিত প্রকল্প নেই, কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো একক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সাংগঠনিকভাবে যুক্ত হওয়ার কথাও তারা বলে না। তবু গত দেড় দশকে বাংলাদেশের রাজনীতির এমন কোনো বড় অধ্যায় খুব কমই আছে, যেখানে কোনো না কোনোভাবে হেফাজতে ইসলামের উপস্থিতি দেখা যায়নি।
কখনো তারা আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছে। কখনো সেই আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গেই সমঝোতা করেছে। কখনো বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে একই রাজনৈতিক পরিসরে দাঁড়িয়েছে। কখনো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। কখনো নারী অধিকার সংস্কার নিয়ে সরকারের সামনে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। আবার ২০২৬ সালের নির্বাচনী রাজনীতিতে হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য সরাসরি একটি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন এবং অন্য একটি ইসলামপন্থী দলকে ঠেকানোর আহ্বানে পরিণত হয়েছে।

এই দীর্ঘ যাত্রার মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই সংগঠনটি কী—তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, হেফাজত বাংলাদেশের রাজনীতিতে কীভাবে এতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠল?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কে হেফাজতকে ব্যবহার করেছে, হেফাজত কাকে ব্যবহার করেছে, এবং শেষ পর্যন্ত এই পারস্পরিক নির্ভরতার রাজনীতি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
২০১০ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারীকে কেন্দ্র করে যে সংগঠনের জন্ম, ২০১৩ সালে সেই সংগঠন ঢাকার শাপলা চত্বরে লাখো মানুষের সমাবেশ ঘটিয়ে রাষ্ট্রের সামনে ১৩ দফা দাবি তুলে ধরে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই সমাবেশের পরিণতি ঘটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে। এরপর হেফাজত দুর্বল হয়েছে, ভেঙেছে, নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে পড়েছে, আবার সংগঠিত হয়েছে। ২০১৭-১৮ সালে একই সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও রাজনৈতিক সমঝোতার গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পেয়েছে। ২০২১ সালে আবার রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর সংগঠনটি নতুন পরিসর পেয়েছে। ২০২৫ সালে নারী অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিয়ে বড় সমাবেশ করেছে। আর ২০২৬ সালে এসে হেফাজতের আমিরের বক্তব্য সরাসরি নির্বাচনী সমীকরণে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করেছে।
শুরুটা কোথায়?
হেফাজতে ইসলামের জন্মকে শুধু ২০১৩ সালের শাহবাগবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করলে এর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। সংগঠনটির শিকড় আরও আগে।
২০১০ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও আশপাশের কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক আলেম সমাজের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়, তার অন্যতম বিষয় ছিল রাষ্ট্রীয় নীতি ও ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সরকারের সম্ভাব্য পরিবর্তন। সংগঠনের সঙ্গে শাহ আহমদ শফী, জুনায়েদ বাবুনগরীসহ হাটহাজারীকেন্দ্রিক কওমি আলেমদের নাম শুরু থেকেই জড়িয়ে যায়।
হেফাজতের জন্মের পেছনে নারী উন্নয়ন নীতি, শিক্ষানীতি, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ এবং কওমি মাদ্রাসার স্বাতন্ত্র্য নিয়ে উদ্বেগের কথা বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে এসেছে। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষও হয়। সংগঠনটি তখন থেকেই নিজেদেরকে মূলত ধর্মীয় ও সামাজিক দাবি আদায়ের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরতে থাকে।
এই পর্যায়ে হেফাজতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ছিল কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় নয়—কওমি মাদ্রাসার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। এখানেই সংগঠনটির শক্তির বিশেষত্ব।
বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর রয়েছে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, থানা ও জেলা কমিটি। কিন্তু হেফাজতের শক্তি গড়ে উঠেছে মসজিদ, মাদ্রাসা, আলেম সমাজ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং ধর্মীয় সামাজিক সম্পর্কের ওপর। এই নেটওয়ার্ক নির্বাচনী রাজনীতির প্রচলিত কাঠামোর বাইরে থেকেও দ্রুত জনসমাবেশ ঘটাতে পারে।
২০১৩ সালের আগে জাতীয় রাজনীতিতে হেফাজত খুব পরিচিত নাম ছিল না। কিন্তু ২০১৩ সালে এসে সেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
শাহবাগ এবং হেফাজতের বিস্ফোরণ
২০১৩ সালের শুরুতে বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়কে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন চলছিল। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগে শুরু হয় গনজাগরণমঞ্চ নামে একটি আন্দোলন। আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি।
শাহবাগ আন্দোলন দ্রুত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরের একটি প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু একই সময়ে এর বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াও তৈরি হয়।
হেফাজতের অভিযোগ ছিল, শাহবাগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্লগার ইসলাম ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননা করেছেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে তারা একটি বৃহৎ ধর্মীয় জনমত সংগঠিত করতে শুরু করে।
হেফাজতের উত্থান শুধু কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক প্রচেষ্টার ফল ছিল না। একই সঙ্গে এটি ছিল ডিজিটাল যুগে ধর্মীয় পরিচয় ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজের সাংস্কৃতিক উদ্বেগের একটি রাজনৈতিক প্রকাশ।
হেফাজত এমন একটি ভাষা ব্যবহার করেছিল যা মাদ্রাসার শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে দ্রুত গ্রহণযোগ্য হয়—ইসলাম রক্ষা, মহানবীর মর্যাদা রক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা এবং কথিত নাস্তিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচও ২০১৩ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, হেফাজত নিজেদের অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে পরিচয় দিলেও তাদের কিছু সদস্য বিরোধী রাজনৈতিক পরিসরের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। সংগঠনটি ১৩ দফা দাবি সামনে এনে ধর্মীয় বিধানকে রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠার দাবি করেছিল।
অল্প সময়ের মধ্যে হেফাজত একটি আঞ্চলিক মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন থেকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত শক্তিতে পরিণত হয়।
১৩ দফা: হেফাজতের রাজনৈতিক ভাষার জন্ম
২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল ঢাকামুখী লংমার্চের সময় হেফাজত যে ১৩ দফা দাবি সামনে আনে, সেটিই সংগঠনটির রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে পরিষ্কার দলিলগুলোর একটি।
দাবিগুলোর মধ্যে ছিল সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন, ইসলাম ও মহানবীকে অবমাননার জন্য কঠোর শাস্তি, কথিত নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, কওমি মাদ্রাসা ও আলেমদের ওপর চাপ বন্ধ, আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা, নারী নীতি ও শিক্ষানীতি বাতিল, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বন্ধ এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা।
বাংলাদেশের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম—এই বিভিন্ন উপাদানের একটি জটিল সমন্বয় তৈরি করেছে। হেফাজতের ১৩ দফা সেই সাংবিধানিক ভারসাম্যের মধ্যে আরও শক্তিশালী ধর্মীয় ব্যাখ্যার দাবি তুলেছিল।
অর্থাৎ হেফাজত শুরু থেকেই শুধু মাদ্রাসার স্বার্থ নিয়ে কথা বলেনি। তারা রাষ্ট্রের আইন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, নারীনীতি, নাগরিক আচরণ এবং ধর্মীয় পরিচয়—সবকিছুকে আলোচনায় এনেছিল। এ কারণেই ২০১৩ সালের পর হেফাজত আর কেবল আলেমদের সংগঠন হিসেবে দেখা সম্ভব ছিল না।
৫ মে: শাপলা চত্বরের রাত
৬ এপ্রিলের লংমার্চের পর হেফাজত ঘোষণা করে ৫ মে ঢাকায় বড় কর্মসূচি। সেদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সমর্থকেরা ঢাকায় আসেন। মতিঝিলের শাপলা চত্বর হয়ে ওঠে তাদের প্রধান অবস্থানস্থল। দিনের বেলা সমাবেশটি বিশাল আকার নেয়। কিন্তু সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
৫ মে রাত থেকে ৬ মে ভোরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শাপলা চত্বর খালি করার অভিযান চালায়। তারপরই শুরু হয় আরেকটি দীর্ঘ রাজনৈতিক বিতর্ক। কতজন মারা গিয়েছিল? সরকার কতজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছিল? হেফাজত কতজনের মৃত্যুর দাবি করেছিল? মানবাধিকার সংগঠনগুলো কী বলেছিল? আজও এই প্রশ্নের রাজনৈতিক উত্তর এক নয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০১৩ সালের তদন্তে ৫–৬ মে সংঘর্ষে উল্লেখযোগ্য প্রাণহানির কথা তুলে ধরে এবং স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানায়। সংগঠনটি একই সঙ্গে হেফাজত সমর্থকদের সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ—দুই দিকের ঘটনাই নথিভুক্ত করার চেষ্টা করে।
শাপলা চত্বরের রাত তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্মৃতিতে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বয়ানের জন্ম দেয়। একদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের বয়ান—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা এবং রাজধানীর নিরাপত্তা রক্ষায় অভিযান। অন্যদিকে হেফাজত ও তাদের সমর্থকদের বয়ান—ধর্মীয় সমাবেশে রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞ। এই দুই বয়ানের মধ্যবর্তী জায়গায় ছিল একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন: ঠিক কী ঘটেছিল এবং কতজন নিহত হয়েছিল?
শাপলার পর হেফাজত কি শেষ হয়ে গিয়েছিল?
অনেকে ২০১৩ সালের পর ধারণা করেছিলেন হেফাজতের রাজনৈতিক শক্তি শেষ। বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। সংগঠনটি রাজপথে কিছু সময়ের জন্য দুর্বল হলেও তার সামাজিক ভিত্তি অক্ষুণ্ন ছিল।
এর কারণ ছিল হেফাজতের সংগঠনটি কোনো একক কেন্দ্রীয় অফিসের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। হাটহাজারী, পটিয়া, চট্টগ্রাম এবং দেশের বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসার নেটওয়ার্কের মধ্যে তাদের সামাজিক যোগাযোগ বিস্তৃত ছিল। আর এখানেই হেফাজতের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। রাজনৈতিক সংগঠনকে যদি শুধু সমাবেশের আকার দিয়ে মাপা হয়, তাহলে হেফাজতের প্রকৃত শক্তি বোঝা যাবে না। তাদের শক্তি ছিল সামাজিক। তাদের নেতারা মসজিদে কথা বলতে পারেন। মাদ্রাসায় কথা বলতে পারেন। ওয়াজ মাহফিলে কথা বলতে পারেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মাধ্যমে বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে একটি সমাবেশ ভেঙে দেওয়া সম্ভব হলেও সামাজিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া সহজ ছিল না।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কের নাটকীয় মোড়
২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের পর আওয়ামী লীগ ও হেফাজতের সম্পর্ক ছিল সংঘাতপূর্ণ। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক বদলাতে শুরু করে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
আওয়ামী লীগ বুঝতে পারে, হেফাজতকে শুধু বিরোধী শক্তি হিসেবে দেখলে রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকি আছে। অন্যদিকে হেফাজতও বুঝতে পারে, রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সংঘাতে থেকে তাদের সব দাবি আদায় সম্ভব নয়। ফলে শুরু হয় যোগাযোগ। এক পর্যায়ে এই যোগাযোগ পৌঁছে যায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পর্যায়ে।
শাপলা থেকে শুকরানা—আনাস মাদানীর হাত ধরে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ
শাপলা চত্বরের সেই রাতের পর দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করল। যে হেফাজতকে একসময় আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়েছিল, কয়েক বছরের মধ্যেই সেই হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক হয়ে উঠল অনেকটাই ঘনিষ্ঠ।
এই পালাবদলের কেন্দ্রে আলোচিত একটি নাম—আনাস মাদানী। হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমির শাহ আহমদ শফীর ছেলে এবং সংগঠনের প্রচার সম্পাদক হিসেবে তিনি শুধু ধর্মীয় সংগঠনের ভেতরের একজন নেতা ছিলেন না; বাবার বয়স ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে হেফাজত ও হাটহাজারী মাদ্রাসার নানা সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব নিয়েও তখন আলোচনা ছিল।
২০১৩ সালের পর যে সরকার হেফাজতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল, সেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে হাটহাজারী মাদ্রাসায় নিয়মিত যোগাযোগ তৈরি হয়। ২০১৩ সালের আন্দোলনের পর সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী হাছান মাহমুদসহ চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা হাটহাজারী মাদ্রাসায় গিয়ে শাহ আহমদ শফীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসব বৈঠকের প্রায় সবকটিতেই আনাস মাদানী উপস্থিত ছিলেন। এখানেই হেফাজতের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

রাজপথের আন্দোলন থেকে দর-কষাকষির টেবিলে বসে যায় দুই পক্ষই। সরকারও বুঝতে শুরু করল, হেফাজতকে সরাসরি মোকাবিলা করার চেয়ে তাদের সঙ্গে সমঝোতার পথ অনেক সময় রাজনৈতিকভাবে বেশি লাভজনক হতে পারে। আর হেফাজতের একটি অংশও বুঝে গেল, রাজনীতির মাঠে শুধু দাবি তুললেই হয় না; দাবি আদায়ের জন্য ক্ষমতাকেন্দ্রের দরজায়ও যেতে হয়।
এই সম্পর্কের সবচেয়ে প্রতীকী ঘটনাগুলোর একটি ছিল কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস সনদের স্বীকৃতি। ২০১৭ সালে সরকার কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তরের শিক্ষা সনদকে মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। সংশ্লিষ্ট বৈঠকেও শাহ আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানী উপস্থিত ছিলেন।
এরপর আসে আরও নাটকীয় অধ্যায়—‘শুকরানা মাহফিল’।
যে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে কয়েক বছর আগেই হেফাজত রাজপথে বিস্ফোরক আন্দোলন করেছিল, সেই সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে কওমি সনদের স্বীকৃতির জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আয়োজিত হয় ‘শুকরানা মাহফিল’। হেফাজতের ভেতরেই এ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়। সংগঠনের একাংশের অভিযোগ ছিল, এই আয়োজন ছিল সরকারের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার প্রকাশ। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, আনাস মাদানীসহ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল এবং শুকরানা মাহফিল আয়োজনেও সরকারি সহযোগিতার অভিযোগ করা হয়েছিল। তবে আনাস মাদানী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
অর্থাৎ গল্পটি শুধু সরকার হেফাজতকে ব্যবহার করেছে—এমন সরল সমীকরণে আটকে থাকে না। হেফাজতের নেতৃত্বের একটি অংশও রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ককে নিজেদের সাংগঠনিক ও সামাজিক দাবিদাওয়া আদায়ের একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে—এমন অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ তখন সামনে আসে।
রাজনীতির যে পক্ষই ক্ষমতায় থাকুক, হেফাজতের দরজায় যাওয়ার কারণ আছে। কারণ তাদের হাতে আছে এমন একটি সামাজিক প্রভাব, যা নির্বাচনী রাজনীতিতে উপেক্ষা করা কঠিন। আবার হেফাজতেরও প্রয়োজন ক্ষমতার সঙ্গে যোগাযোগ। ফলে সম্পর্কটি কখনো আদর্শের, কখনো কৌশলের, কখনো সুবিধা আদায়ের—আবার কখনো টিকে থাকার।
শাহ আহমদ শফীর জীবনের শেষ দিকে হেফাজতের ভেতরে আনাস মাদানীর প্রভাব নিয়েও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। ২০২০ সালে হাটহাজারী মাদ্রাসার ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে আনাস মাদানীকে মাদ্রাসা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তাঁকে ঘিরে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, বাবুনগরী-শফী বিরোধ এবং নেতৃত্বের প্রশ্ন সামনে চলে আসে।
যে আনাস মাদানী একসময় সরকারের সঙ্গে হেফাজতের যোগাযোগের অন্যতম দৃশ্যমান মুখ ছিলেন, কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি নিজ সংগঠনের ভেতরেই প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়েন।
এটি হেফাজতের রাজনীতির একটি বড় বৈপরীত্য। বাইরে থেকে শক্তিশালী, ভেতরে বিভক্ত। সরকারের সঙ্গে দর-কষাকষিতে সক্ষম, কিন্তু নিজের ঘরের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে দুর্বল। রাজপথে লাখো মানুষের সমাবেশ ঘটাতে পারে, আবার সেই সংগঠনের নেতৃত্ব নিয়েই আলেমদের মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দিতে পারে।
তাই হেফাজতের ইতিহাসকে শুধু ‘সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় উত্থান’ কিংবা ‘সরকারবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস’—কোনো একটিমাত্র ফ্রেমে দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়ে না। বরং এটি ক্ষমতা ও প্রতিবাদের এক অদ্ভুত সহাবস্থানের গল্প।
যেখানে একদিন সরকারকে চাপে ফেলতে পারে হেফাজত, আর অন্যদিন সেই সরকারের কাছ থেকেই নিজের দাবি আদায় করতে পারে। একদিন রাজপথে সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান, অন্যদিন সেই সরকারের প্রধানের জন্য শুকরানা মাহফিল। একদিন রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত, অন্যদিন রাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা।
আর এই দ্বৈততার মধ্যেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে হেফাজত হয়ে উঠেছে সেই ‘গরিবের সুন্দরী বউ’—যাকে সবাই ঘরে তুলতে চায়, কিন্তু যার সঙ্গে সম্পর্কের আসল হিসাবটা কখনো প্রকাশ্যে বলে না কেউ।
কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি: একটি বড় রাজনৈতিক সমঝোতা
কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি দেওয়া ছিল হেফাজত ও কওমি আলেমদের দীর্ঘদিনের দাবি। ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার এই স্বীকৃতির ঘোষণা দেয় এবং ২০১৮ সালে তা আইনগত কাঠামো পায়। এটি হেফাজতের জন্য বড় সাফল্য।
কারণ যে কওমি শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় মূলধারার বাইরে ছিল, তার সর্বোচ্চ ডিগ্রি রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। গবেষণামূলক বিশ্লেষণেও এই ঘটনাকে হেফাজতসহ ইসলামপন্থী আলেম সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হয়েছে।
২০১৮ সালে কওমি স্বীকৃতিকে কেন্দ্র করে ঢাকায় বড় ধরনের শুকরানা মাহফিলও অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন এবং কওমি আলেমদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের নতুন চিত্র প্রকাশ্যে আসে। রাজনীতির ভাষায় এটি ছিল একটি বড় বার্তা।
২০১৩ সালে যে সংগঠন ঢাকায় সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, কয়েক বছরের মধ্যে সেই সংগঠনের প্রধান আলেমদের সঙ্গে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এটি ছিল সংঘাত থেকে সমঝোতার যাত্রা।
ভাস্কর্য বিতর্ক: রাজনীতিতে হেফাজতের আরেক বিজয়
২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপিত লেডি জাস্টিসের ভাস্কর্য নিয়ে হেফাজত আপত্তি তোলে। তাদের বক্তব্য ছিল, এটি ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। হেফাজতের চাপের মধ্যে সরকার ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালের মে মাসে ভাস্কর্যটি সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনা হেফাজতের রাজনৈতিক প্রভাবের একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। কারণ প্রশ্নটি শুধু একটি ভাস্কর্যের ছিল না। প্রশ্ন ছিল—রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক সিদ্ধান্ত কি একটি ধর্মীয় সংগঠনের দাবির কারণে পরিবর্তিত হতে পারে?
হেফাজতের সমর্থকদের কাছে এটি ছিল ধর্মীয় মূল্যবোধের বিজয়। সমালোচকদের কাছে এটি ছিল রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে একটি অনির্বাচিত ধর্মীয় সংগঠনের প্রভাবের উদাহরণ। এই বিতর্ক আজও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ।
নেতৃত্বের ভেতরের ফাটল
হেফাজতের শক্তির অন্যতম উৎস যেমন ছিল ঐক্যবদ্ধ কওমি আলেম সমাজ, তেমনি সেই শক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও ছিল নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ বিভাজন।
প্রতিষ্ঠাতা আমির শাহ আহমদ শফী ছিলেন ঐতিহাসিকভাবে সংগঠনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখ। তার নেতৃত্বের সময় হেফাজত ছিল মূলত হাটহাজারীকেন্দ্রিক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে জুনায়েদ বাবুনগরীসহ অন্য নেতারা শক্তিশালী হয়ে ওঠেন।
২০১৯-২০ সালে নেতৃত্বের বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়। হাটহাজারী মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়। ২০২০ সালে শাহ আহমদ শফীর মৃত্যু সেই দ্বন্দ্বের একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটালেও নতুন নেতৃত্বের প্রশ্ন সামনে আসে। এরপর জুনায়েদ বাবুনগরী হেফাজতের আমির হন।
কিন্তু নেতৃত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে সংগঠনের ভেতরের বিভাজন পুরোপুরি শেষ হয়নি। বরং হেফাজতের রাজনীতি তখন আরও বেশি ব্যক্তি-নেতৃত্বনির্ভর ও উপদলভিত্তিক হয়ে ওঠে।
মোদিবিরোধী আন্দোলন
২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর ছিল কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হেফাজতের কাছে এই সফর ছিল রাজনৈতিক প্রতিবাদের একটি সুযোগ। মোদির ভারতের মুসলিম নীতি, গুজরাটের ২০০২ সালের দাঙ্গা এবং ভারতে মুসলিমদের পরিস্থিতি নিয়ে হেফাজতের ক্ষোভ ছিল।
২৬ মার্চ ২০২১ থেকে আন্দোলন শুরু হয়। হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত হন। তৎকালীন প্রতিবেদনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১১ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
এই আন্দোলনে হেফাজতের রাজনৈতিক চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০১৩ সালে তাদের মূল স্লোগান ছিল ধর্মীয় মূল্যবোধ। ২০২১ সালে তার সঙ্গে যুক্ত হয় ভারতবিরোধী ভূরাজনীতি।
মোদি সফর থেকে মুজিব ভাস্কর্য
২০২০ সালের শেষ দিকে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপন নিয়েও হেফাজত নেতারা আপত্তি জানিয়েছিলেন। ভাস্কর্যকে তারা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয় বলে বক্তব্য দেন। এই বিতর্ক আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে হেফাজতের পূর্ববর্তী সমঝোতার সীমাও স্পষ্ট করে দেয়।
২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্টের ভাস্কর্য সরানোর ক্ষেত্রে যে সমঝোতার চিত্র দেখা গিয়েছিল, ২০২০-২১ সালে শেখ মুজিবের ভাস্কর্য প্রশ্নে সরকার আর সেই অবস্থান নেয়নি। অর্থাৎ সম্পর্কের ভেতরের ভারসাম্য বদলে যায়। হেফাজত বুঝতে শুরু করে, রাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতারও সীমা আছে।
আর আওয়ামী লীগ বুঝতে পারে, হেফাজতকে ছাড় দেওয়া মানেই সংগঠনটি সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে—এমন নয়।
মামুনুল হক: হেফাজতের নতুন প্রজন্মের মুখ
২০২১ সালে হেফাজতের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত মুখ হয়ে ওঠেন মামুনুল হক। তিনি ছিলেন তরুণ প্রজন্মের বক্তা, ওয়াজ মাহফিলের জনপ্রিয় মুখ এবং ইসলামপন্থী রাজনৈতিক পরিসরের সক্রিয় নেতা। তার বক্তৃতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ত।
হেফাজতের পুরোনো নেতৃত্বের তুলনায় মামুনুল হকের রাজনৈতিক ভাষা ছিল আরও সরাসরি, আরও জনমুখী এবং ডিজিটাল যুগের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি শুধু মাদ্রাসার আলেমদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; শহুরে তরুণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী এবং দলীয় রাজনীতিতে আগ্রহী ইসলামপন্থী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও তার প্রভাব তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু ২০২১ সালের এপ্রিলের একটি ব্যক্তিগত ঘটনা তার রাজনৈতিক উত্থানকে নাটকীয়ভাবে বদলে দেয়। সোনারগাঁর একটি রিসোর্টে এক নারীকে নিয়ে অবস্থানকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। এরপর তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বিভিন্ন মামলায় দীর্ঘ সময় আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকতে হয়। এই ঘটনাটি শুধু ব্যক্তিগত বিতর্ক ছিল না। এটি হেফাজতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি নতুন বাস্তবতা প্রকাশ করে:
২০২১: হেফাজতের কমিটি ভেঙে দেওয়া
মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তী গ্রেপ্তারের মধ্যে হেফাজতের সাংগঠনিক কাঠামো বড় ধাক্কা খায়। ২০২১ সালের ২৫ এপ্রিল জুনায়েদ বাবুনগরী কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। এরপর নতুন কমিটি গঠিত হয়।
কিন্তু সংগঠনের ভেতরে একাধিক ধারা ও নেতৃত্বের কেন্দ্র তৈরি হয়। রাষ্ট্রীয় দমন এবং নেতৃত্বের বিভাজন—দুটিই হেফাজতের সাংগঠনিক শক্তিকে দুর্বল করে। তবু সংগঠনটি বিলীন হয়নি।
এখানেও একই শিক্ষা: হেফাজতকে শুধু কেন্দ্রীয় কমিটি দিয়ে বোঝা যায় না। কমিটি ভেঙে যেতে পারে। নেতা গ্রেপ্তার হতে পারেন।
কিন্তু কওমি মাদ্রাসা নেটওয়ার্ক, আলেম সমাজ এবং ধর্মীয় সামাজিক যোগাযোগ অক্ষুণ্ন থাকলে সংগঠনটির পুনরুত্থানের সম্ভাবনা থেকেই যায়।
২০২২-২৪: নীরব পুনর্গঠন
২০২১ সালের পর কয়েক বছর হেফাজত তুলনামূলকভাবে নীরব ছিল। কিন্তু এই নীরবতাকে সংগঠনের পতন বলা যাবে না। বরং এই সময়টি ছিল পুনর্গঠনের। ২০২৪ সালে হেফাজত তাদের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ককে শুধু মাদ্রাসা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিস্তৃত করার পরিকল্পনার কথা সামনে আনে।
হেফাজতের অভ্যন্তরিন তথ্য অনুযায়ী, হেফাজত নন-মাদ্রাসা সদস্যদের যুক্ত করে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন বিস্তারের পরিকল্পনা করেছিল। এই পরিকল্পনার রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক বড়। কারণ হেফাজত যদি শুধু মাদ্রাসার সংগঠন থাকে, তাহলে তার প্রভাব সীমিত থাকে ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা ও আলেম সমাজে।
কিন্তু যদি সাধারণ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে কমিটি তৈরি হয়, তাহলে সংগঠনটি একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক-রাজনৈতিক চাপগোষ্ঠীতে পরিণত হতে পারে। ২০২৪ সালে হেফাজতের চিন্তার মধ্যে এই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৫ আগস্ট ২০২৪: নতুন পরিস্থিতি
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতন বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ বদলে দেয়। দীর্ঘ ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনের অবসানের পর রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় হেফাজত আবার প্রকাশ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
এর সবচেয়ে প্রতীকী ঘটনা হলো—অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে হেফাজতের একজন শীর্ষ নেতা এ এফ এম খালিদ হোসেনের অন্তর্ভুক্তি। খালিদ হোসেন হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির ছিলেন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গেও রাজনৈতিকভাবে যুক্ত ছিলেন। ৮ আগস্ট ২০২৪ শপথ নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা তালিকায় তার নাম ছিল।
এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ২০১৩ সালে হেফাজত ছিল সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথের শক্তি। ২০১৭ সালে তারা সরকারের সঙ্গে সমঝোতার শক্তি। ২০২১ সালে তারা আবার সরকারের সঙ্গে সংঘর্ষে যায়। আর ২০২৪ সালে এসে হেফাজতের একজন শীর্ষ নেতা সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনার উপদেষ্টা পরিষদে। এই পরিবর্তনকে হেফাজতের রাজনৈতিক যাত্রার একটি নতুন পর্যায় বলা যায়।

২০২৫: নারী সংস্কার কমিশন এবং নতুন সংঘাত
২০২৫ সালে হেফাজতের রাজনীতিতে নতুন একটি অধ্যায় শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকার নারী অধিকার ও নারী উন্নয়ন নিয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। নারী সংস্কার কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশে উত্তরাধিকার, পারিবারিক আইন ও নারী-পুরুষের সমতার বিষয় ছিল। হেফাজত এসব প্রস্তাবকে ইসলামী শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখায়।
৩ মে ২০২৫ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বড় সমাবেশ করে সংগঠনটি। সেখানে ১২ দফা ঘোষণা করা হয়।
প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল নারী সংস্কার কমিশন বাতিল, কমিশনের প্রতিবেদন বাতিল, হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ এবং ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনার বিচার।
এখানে হেফাজতের রাজনৈতিক ভাষায় আরেকটি বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ২০১৩ সালে তাদের মূল বক্তব্য ছিল ইসলাম অবমাননার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। ২০২৫ সালে তারা রাষ্ট্রের আইন সংস্কার নিয়ে সরাসরি অবস্থান নেয়। অর্থাৎ হেফাজত এখন শুধু ধর্মীয় আবেগের রক্ষক নয়; তারা রাষ্ট্রীয় আইন কী হবে, সেটি নিয়েও মত দিতে চায়।
২০২৬: জামায়াতের বিরুদ্ধে হেফাজতের অবস্থান
২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে হেফাজতের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর বক্তব্য বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করে।
৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, মুসলমানদের জন্য জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়া অনুমোদনযোগ্য নয়। একই অনুষ্ঠানে তিনি বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সারওয়ার আলমগীরের প্রতি সমর্থনের কথা প্রকাশ করেন।
এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ হেফাজত এতদিন নিজেদেরকে দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখার দাবি করলেও ২০২৬ সালের নির্বাচনে সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য সরাসরি ভোটের আচরণ প্রভাবিত করার আহ্বানে পরিণত হয়েছে।
এখানে হেফাজত ও জামায়াতের সম্পর্কের আরেকটি দিক প্রকাশ পায়। দুই পক্ষ একই ধর্মীয় রাজনৈতিক জনসমাজের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। একটি সংগঠন চাইছে ধর্মীয় মূল্যবোধের সামাজিক কর্তৃত্ব ধরে রাখতে।
অন্যটি চাইছে সেই ধর্মীয় জনসমর্থনকে সরাসরি নির্বাচনী ভোটে রূপান্তর করতে। ফলে হেফাজত ও জামায়াতের সম্পর্ক শুধু সহযোগিতার নয়—প্রতিযোগিতারও।
বিএনপির দিকে হেফাজতের ঝুঁকে পড়া
২০২৬ সালের নির্বাচনী পর্যায়ে হেফাজতের কিছু শীর্ষ নেতার বিএনপির প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে নতুন বার্তা দেয়। এখানে বিএনপির জন্য হেফাজতের গুরুত্বও স্পষ্ট।
বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে বড় রাজনৈতিক দল হলেও গ্রামীণ ধর্মীয় ভোটব্যাংকের একটি অংশ ধরে রাখার জন্য ইসলামপন্থী আলেমদের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে হেফাজতের জন্যও বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ হেফাজত নিজেরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের নির্বাচনী প্রকল্পে না গিয়ে একটি বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে তাদের দাবিগুলো রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রতিফলিত করার সুযোগ পেতে পারে।
এই সম্পর্ক তাই পারস্পরিক। বিএনপি চায় ধর্মীয় ভোট ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। হেফাজত চায় রাজনৈতিক প্রভাব ও নীতিনির্ধারণে প্রবেশাধিকার।
হেফাজত কি নিজে রাজনৈতিক দল হয়ে উঠবে?

এ প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। কিন্তু কয়েকটি লক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, হেফাজতের বহু নেতা বিভিন্ন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। দ্বিতীয়ত, তাদের নেতারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তৃতীয়ত, সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে নির্দিষ্ট প্রার্থীর প্রতি সমর্থন প্রকাশ করছে।
চতুর্থত, হেফাজত এখন শুধু ধর্মীয় ইস্যু নয়—রাষ্ট্রীয় সংস্কার, নারী আইন, নির্বাচন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ এবং বিচারব্যবস্থা নিয়েও অবস্থান নিচ্ছে। এগুলো একটি রাজনৈতিক সংগঠনের বৈশিষ্ট্যের কাছাকাছি।
তবু হেফাজত নিজে রাজনৈতিক দল হয়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্ত এখনো নেই। সম্ভবত তাদের জন্য বর্তমান কাঠামোটিই বেশি লাভজনক। কারণ রাজনৈতিক দল হলে ভোটের হিসাব দিতে হয়। প্রার্থী দিতে হয়। ব্যর্থতার দায় নিতে হয়। কিন্তু চাপগোষ্ঠী হিসেবে থাকলে তারা বিভিন্ন দলকে একই সঙ্গে চাপ দিতে পারে।
হেফাজতের শক্তি কোথায়?
হেফাজতে ইসলামের শক্তিকে মূলত পাঁচটি স্তরে দেখা যায়। প্রথমত, কওমি মাদ্রাসা—যা তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি ও মানবসম্পদের প্রধান উৎস। দেশে বিস্তৃত কওমি মাদ্রাসা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হেফাজত দ্রুত কর্মী, সমর্থক ও যোগাযোগের একটি বড় কাঠামো সক্রিয় করতে পারে। দ্বিতীয়ত, আলেমদের সামাজিক প্রভাব। বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলাদেশে ইমাম, খতিব, মাদ্রাসাশিক্ষক ও ওয়ায়েজদের ধর্মীয় ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তৃতীয়ত, ধর্মীয় আবেগ—ধর্ম অবমাননা, মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা, ইসলামবিরোধী আইন বা নীতি, নারী অধিকার এবং ভাস্কর্যের মতো ইস্যু খুব দ্রুত মানুষের আবেগকে নাড়া দিতে পারে। ফলে একটি নির্দিষ্ট ইস্যুকে কেন্দ্র করে হেফাজত অল্প সময়ের মধ্যে বড় পরিসরে জনসম্পৃক্ততা তৈরি করতে সক্ষম হয়।
চতুর্থত, রাজপথে জনসমাবেশ ঘটানোর সক্ষমতা হেফাজতের বড় শক্তি। ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর এবং ২০২১ সালের আন্দোলন দেখিয়েছে, নির্দিষ্ট ইস্যুতে তারা বড় সংখ্যক মানুষকে দ্রুত সংগঠিত করতে পারে। আর পঞ্চম ও সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো কোনো একক রাজনৈতিক দলের অধীন না থাকা। এই অবস্থান তাদের দর-কষাকষির সুযোগ বাড়িয়েছে। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, হেফাজত প্রয়োজন অনুযায়ী তার সঙ্গে যোগাযোগ ও সমঝোতার পথ খোলা রাখতে পারে; একই সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। ফলে হেফাজতের শক্তি শুধু তার জনসমর্থনে নয়—বরং ধর্মীয় সামাজিক প্রভাব, সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক, দ্রুত জনমত সংগঠনের ক্ষমতা এবং রাজনৈতিকভাবে একাধিক দরজা খোলা রাখার কৌশলের সমন্বয়ে।
হেফাজতের দুর্বলতা
যে সংগঠনের এত শক্তি, তার দুর্বলতাও কম নয়। হেফাজতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো নেতৃত্বের বিভাজন। শাহ আহমদ শফী, জুনায়েদ বাবুনগরী এবং পরবর্তী নেতৃত্বকে ঘিরে মতপার্থক্য ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সংগঠনটিকে একাধিক ধারায় বিভক্ত করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অরাজনৈতিক পরিচয়ের সংকট—হেফাজত নিজেকে অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে তুলে ধরলেও এর নেতাদের বিভিন্ন সময়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা সেই দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ফলে সংগঠনটি একই সঙ্গে ধর্মীয় আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম এবং রাজনৈতিক দর-কষাকষির শক্তি—এই দুই পরিচয়ের মাঝখানে অবস্থান করছে। অন্যদিকে ২০১৩ ও ২০২১ সালের আন্দোলনকে ঘিরে সহিংসতার অভিযোগ ও সংঘর্ষ হেফাজতের ওপর একটি কঠোর রাজনৈতিক ইমেজ তৈরি করেছে, যা সংগঠনটির বৃহত্তর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হেফাজতের আরেকটি বড় দুর্বলতার জায়গা নারী ও সংখ্যালঘু প্রশ্নে তাদের অবস্থান। নারী অধিকার, নারী-সম্পর্কিত আইন ও সামাজিক নীতির বিষয়ে সংগঠনের বিভিন্ন দাবি দেশের নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশের সমালোচনার মুখে পড়েছে। একইভাবে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে অতীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার প্রত্যেকটির জন্য হেফাজতকে সরাসরি দায়ী করার মতো প্রমাণ সব ক্ষেত্রে নেই; তবে ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা যে কখনো কখনো সামাজিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে, সেই বাস্তবতাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ফলে হেফাজতের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ শুধু সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখা নয়; বরং ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, সহিংসতার অভিযোগ এবং বহুত্ববাদী সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক—এই চারটি বিষয়কে একই সঙ্গে সামলানো।
Author