
সাড়ে ১৫ বছর বিএনপি রাজপথে সোচ্চার ছিল দলীয় নিয়োগের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগের দলীয় নিয়োগের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ছিল স্পষ্ট। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা এই দলটি তাদের ৩১ দফায়ও এই দলীয় নিয়োগ না দেওয়ার কথা স্পষ্ট বলেছে। কিন্তু...
ক্ষমতার মসনদে বসলে হয়তো সব প্রতিশ্রুতি রাখতে নেই, কিংবা রাজনীতির কোনো গোপন বইতে এমন কোনো নির্দেশনা আছে কি না, তা আমরা জানি না। কিন্তু আমরা দেখেছি, গত ৬ মাসে দেশের প্রায় সবগুলো স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানে নগ্নভাবে দলীয়করণ।
যদি শুধুমাত্র কুমিল্লা জেলার দিকে তাকানো যায়, তাহলে দেখা যায়—কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কুউক) চেয়ারম্যান হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপি নেতা উদবাতুল বারী আবু। তিনি কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সভাপতি।
বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মোস্তাক মিয়াকে কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক পদে নিযুক্ত করা হয়েছে।
কুমিল্লা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে আশিকুর রহমান মাহমুদ (ওয়াসিম)কে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তিনি কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপুকে।
কুমিল্লার মডেলে বিএনপি সাজিয়েছে সারাদেশের নিয়োগ প্রক্রিয়া। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছে দলের লোকজন। বিশেষ করে সরকারি সংস্থা, করপোরেশন ও বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ করেছে।
বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান হিসেবে বিএনপির ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক এ টি এম আবদুল বারী ড্যানী, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে যুবদলের সাবেক সহসভাপতি জাকির হোসেন সিদ্দিকী এবং বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে বিএনপির পরিবেশ ও বনবিষয়ক সহসম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলামের নিয়োগের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে। ছয়টি সিটি করপোরেশনে বিএনপির ছয় নেতাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।
এর মধ্যে খুলনায় বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, গাজীপুরে মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকার এবং সিলেটে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী রয়েছেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন না দিয়ে নির্বাচিত মেয়রের পরিবর্তে সরাসরি দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে বসানো বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। মার্চে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জগন্নাথ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সহ সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগপ্রাপ্তরা বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠন, জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম বা সাদা দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরে দুই সহ-উপাচার্য হিসেবেও বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত দুই শিক্ষক নিয়োগ পান। মে মাসে ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্যের নিয়োগের মধ্যে ১৯ জনের বিএনপিপন্থী হিসেবে সরাসরি পরিচিতি।
ফলে গত ছয় মাসের নিয়োগের চিত্র নিয়ে মূল বিতর্কটি এখন শুধু ‘কে যোগ্য’—এ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; বরং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় আনুগত্য কতটা প্রভাব ফেলছে, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, উন্নয়ন সংস্থা, বিভিন্ন করপোরেশন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
জুলাই সনদ ও রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এসব নিয়োগ সাংঘর্ষিক; অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, যোগ্যতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ভিত্তিতেই নিয়োগ দেওয়ার যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে।
বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসের নিয়োগপ্রক্রিয়া সামনে এনে প্রশ্ন উঠছে—আওয়ামী লীগের আমলের দলীয়করণের সংস্কৃতি কি কেবল রাজনৈতিক পক্ষ বদলে নতুন রূপে ফিরে আসছে?
নেটিজেনরা বলছেন, কোটা না মেধা? কোটা কোটা…
Author