
ভারতের চলমান ‘আরশোলা‘ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশটির মূলধারার কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক সংবাদ প্রচারের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ ও আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার পরিবর্তে কিছু টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদমাধ্যম আন্দোলনকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছে। এর প্রতিবাদেই আন্দোলনস্থলে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন বিক্ষোভকারীরা।
গত কয়েক দিন ধরে রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তর এলাকাকে কেন্দ্র করে চলমান আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ অংশ নিচ্ছেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাদের দাবি-দাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরার পরিবর্তে বিজেপি-সমর্থিত কিছু সংবাদমাধ্যম আন্দোলনকে "দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র" বা "দেশভাগের পরিকল্পনা" হিসেবে প্রচার করছে। এতে সাধারণ মানুষের কাছে আন্দোলন সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি হচ্ছে।
গত কয়েক দিন ধরেই আন্দোলন পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রিপাবলিক টিভি, আজতক, জি নিউজ, এবিপি নিউজ, এনডিটিভি এবং এএনআইসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের ঘিরে বিক্ষোভ দেখান আন্দোলনকারীরা। এ সময় তারা স্লোগান দেন—‘“চোর হ্যায়, চোর হ্যায়... গদি মিডিয়া চোর হ্যায়।‘
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন সাংবাদিক নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক টেলিভিশন রিপোর্টার সাময়িকভাবে একটি এটিএম বুথে আশ্রয় নেন। অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, যন্তর মন্তর এলাকায় এনডিটিভির এক প্রতিবেদককে উত্তেজিত জনতার ভিড় থেকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন এক নারী পুলিশ সদস্য। একই সময়ে এএনআই-এর একজন প্রতিবেদককেও নিরাপদ স্থানে সরে যেতে দেখা যায়।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের কিছু সংবাদমাধ্যম সরকারের পক্ষে একপেশে সংবাদ পরিবেশন করছে। তাদের ভাষ্য, সরকারবিরোধী যেকোনো আন্দোলন বা সমালোচনাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের কর্মকাণ্ডকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এবার সেই ক্ষোভ সরাসরি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের ওপর প্রকাশ পেয়েছে।
ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে বহুল ব্যবহৃত ‘গদি মিডিয়া‘ বা ‘গোদি মিডিয়া’শব্দটি এসেছে হিন্দি (গোদি) শব্দ থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ ‘কোল’। রাজনৈতিক ভাষ্যে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয় এমন সংবাদমাধ্যমকে বোঝাতে, যাদের সমালোচকদের মতে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি অতিরিক্ত অনুগত বা সহানুভূতিশীল।
সমালোচকদের দাবি, এসব সংবাদমাধ্যম সরকারের সমালোচনার পরিবর্তে তাদের অবস্থানকে সমর্থন করে, বিরোধী মতকে সীমিতভাবে প্রচার করে এবং সরকারের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ডকেও ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। অন্যদিকে এসব সংবাদমাধ্যম বা তাদের সমর্থকদের দাবি, তারা জাতীয় স্বার্থ ও তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা অনুসরণ করছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
আন্দোলন ঘিরে সাংবাদিকদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি ভারতের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা এবং জনআস্থার প্রশ্নকে আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার—দুই বিষয়ই সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
Author