
দেশের ইতিহাসে বেসরকারি ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বড় দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগের ক্ষেত্রে। এত বড় অনিয়মের মাধ্যমে ৮ হাজারের বেশি নিয়োগের ঘটনা পৃথিবীতেও বিরল। আর এটি আরও বিরল ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়, যখন সেই নিয়োগের পক্ষে দেশের সরকার ও বিরোধী দলের নেতারাও একসঙ্গে সমর্থন জানান।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতার উদ্যোগে ১৯৮৩ সালে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে কোম্পানি আইন, ১৯১৩-এর অধীনে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী ব্যাংক।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর বেসরকারি খাতের এই ব্যাংকটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিভিন্ন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরই অংশ হিসেবে এস আলম গ্রুপের মাধ্যমে দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় আওয়ামী লীগ।
এরপর একের পর এক শুরু হয় ব্যাংকটিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০১৭ থেকে আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত এস আলম গ্রুপ নিজস্ব ব্যবসা ও বিভিন্ন ‘শেডো ফার্ম’-এর মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যায়।
এরপরই সামনে আসে এই ব্যাংকের নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ পাওয়া ১০ হাজার ৮৩২ জনের মধ্যে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে বিজ্ঞপ্তি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, ওই সময়ে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে। তাদের কোনো ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি এবং নেওয়া হয়নি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্তের মধ্যে ৫ হাজারের বেশি এস আলমের নিজ উপজেলা পটিয়ার বাসিন্দা। অর্থাৎ, ওই সময়ে ব্যাংকটির মোট নিয়োগের প্রায় ৪৮ শতাংশই হয়েছে একটি উপজেলা থেকে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়ে নিয়োগপ্রাপ্তদের মেধা ও যোগ্যতা পুনরায় যাচাইয়ের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে একটি ‘বিশেষ যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষা’ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রাথমিকভাবে এতে ৫ হাজার ৩৭৩ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেন মাত্র ৪০২ জন। অংশগ্রহণকারী সবাই উত্তীর্ণ হন এবং চাকরিতে বহাল আছেন। অন্যদিকে, ৪ হাজার ৯৭২ জন পরীক্ষা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।
তাদের বিরুদ্ধে কর্মবিরতি পালন, কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্যাংকের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে অসত্য তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়। তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন না করেই ব্যাংক তিন মাসের বেতন পরিশোধ করে চাকরিচ্যুত করে।
এই চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়াকে ‘অস্বচ্ছ’ ও ‘অমানবিক’ বলে আখ্যায়িত করেন দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদরা। তাদের মধ্যে বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, দলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম-১৬ আসনের এমপি জহিরুল ইসলাম‘সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা চাকরিচ্যুতির বিষয়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও সংসদে বক্তব্য দেন।
এমনকি ক্ষমতায় এলে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার আশ্বাসও দেন কেউ কেউ। সংসদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন জনসমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়া হয়।
৯ আগস্ট রাতে চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লু বে ভিউ হোটেলে নগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সভায় বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন— ‘দশ হাজারের মতো মানুষকে তারা বের করে দিল। তার মানে কত বড় জুলুমবাজ তারা দেখেন। জুলুমবাজ না হলে নিরীহ এতগুলো মানুষকে তারা চাকরিচ্যুত করে?’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ৯ জুন ২০২৬ জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আলোচনায় বলেন, ব্যাংকে ‘অন্যায়ভাবে যাদেরকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তাদের সবাইকে চাকরি ফেরত দেওয়ার জন্য একটা তদন্ত পরিচালনা করা হোক।’
চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের জামায়াতের এমপি এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জহিরুল ইসলাম, ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর বাঁশখালীর শীলকূপ ইউনিয়নে চাকরিচ্যুত ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বলেন, জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করলে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতাসহ চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
সর্বশেষ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকে ১০ হাজার ৮৩২ জন নিয়োগের মধ্যে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে অবৈধভাবে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরই প্রশ্ন উঠেছে—যারা এত দিন ইসলামী ব্যাংকের আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের চাকরিচ্যুতির বিরোধিতা করেছেন, তারা এখন কী বলবেন?
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে যখন এসব নিয়োগে গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে, তখন চাকরিচ্যুতদের বিষয়ে রাজনৈতিক নেতাদের অবস্থান কি পরিবর্তন হবে? তারা কি নতুন তথ্য-প্রমাণের আলোকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করবেন, নাকি আগের অবস্থানেই থাকবেন?
প্রশ্নটি এখন শুধু ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নয়; প্রশ্নটি নিয়োগে স্বচ্ছতা, মেধার মূল্যায়ন এবং ব্যাংক খাতে জবাবদিহিরও।
Author