
ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ কখনও তীব্র হচ্ছে, কখনও আবার শান্ত হচ্ছে। কিন্তু একটি বিষয় এখন স্পষ্ট—এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী চীন।
বেইজিংকে একটি গুলিও ছুড়তে হয়নি, বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়নি কিংবা রাজনৈতিক পুঁজি খরচ করতে হয়নি। অথচ গত তিন দশকের মধ্যে এই সংকট থেকে চীন সম্ভবত সবচেয়ে বেশি লাভ করেছে। এই যুদ্ধ চীনের দীর্ঘদিনের তিনটি কৌশলগত লক্ষ্যকে আরও এগিয়ে দিয়েছে—একটি এমন মধ্যপ্রাচ্য, যা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কম নির্ভরশীল; এমন একটি বিশ্ব, যা চীনের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল; এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনকে একটি দায়িত্বশীল ও স্থিতিশীল পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
চীন কখনোই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিরাপত্তা-দাতার ভূমিকা নিতে চায়নি। কারণ, তা করতে গেলে বিপুল ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন। বরং তাদের লক্ষ্য ছিল অনেক সহজ এবং সূক্ষ্ম—উপসাগরীয় দেশগুলোকে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র প্রভাববলয় থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে আনা। আর এই কাজের বড় অংশই অনিচ্ছাকৃতভাবে করে দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্ররা দেখেছে, ওয়াশিংটন অত্যন্ত বিশৃঙ্খলভাবে এই যুদ্ধ পরিচালনা করেছে এবং তাদের শহর, অবকাঠামো ও অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি প্রায় উপেক্ষা করেছে। এর ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল ধীরে ধীরে দুটি ধারায় বিভক্ত হচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। কিন্তু সৌদি আরবের নেতৃত্বে কাতার, ওমান এবং সম্ভবত ইরাক ও তুরস্কসহ আরও বড় একটি গোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে পারে—অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে সংলাপ এবং চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
এটাই মূলত সেই আঞ্চলিক ব্যবস্থা, যা চীন দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন করে আসছে। ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে মধ্যস্থতা করেছিল চীন। এরপর থেকে রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন কিছু ডেটা সেন্টার ও কম্পিউটার চিপ প্রকল্পে যোগ দিতে অনীহা দেখিয়েছে। একই সঙ্গে তারা চীনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কিনেছে, চীনা নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়া করেছে এবং স্থানীয়ভাবে উইং লুং যুদ্ধ ড্রোন উৎপাদনের সম্ভাবনাও যাচাই করছে।
২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রতিরক্ষা রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি গেছে উপসাগরীয় দেশগুলোতে। কেউ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতা পুরোপুরি সরিয়ে দিতে চাইছে না, তবে সবাই বিকল্প রাখতে চায়। আর বিকল্প যত বাড়ে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব তত কমে।
চীনের আরও বড় সাফল্য এসেছে ভূ-অর্থনীতিতে। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, যে দেশ তার প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানি করে, সেই দেশই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু বাস্তবে চীন এই ধাক্কা তুলনামূলক ভালোভাবে সামাল দিয়েছে, কারণ তারা বহু বছর ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
চীন তেলের সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করেছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় কৌশলগত তেল মজুত গড়ে তুলেছে বলে ধারণা করা হয়, কয়লার ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছে এবং নজিরবিহীনভাবে অর্থনীতিকে বিদ্যুত্ভিত্তিক করেছে।
বর্তমানে চীনের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে বিদ্যুৎ থেকে, যা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে স্থাপিত নতুন বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতার অর্ধেকেরও বেশি একাই স্থাপন করেছে চীন। এসব কারণেই যুদ্ধ চলাকালে তারা দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল আমদানিকৃত তেলের ব্যবহার কমাতে সক্ষম হয়েছে।
এই যুদ্ধ কার্যত চীনের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগুলোর জন্য এক বিশাল বিজ্ঞাপনে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি, বায়ু বিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে চাইছে।
বিশ্বের সৌর প্যানেল উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৯১ শতাংশ এবং লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৮৯ শতাংশই চীনের নিয়ন্ত্রণে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অন্তত ৭০ শতাংশ উৎপাদন করে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, বিশ্ব তত বেশি চীনের আধিপত্য থাকা শিল্পগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।
এই যুদ্ধ চীনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যকেও এগিয়ে নিয়েছে—বিশ্ব বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের আধিপত্য দুর্বল করা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান কিছু তেলবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিয়েছিল এই শর্তে যে লেনদেন চীনা রেনমিনবি বা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে নিষ্পত্তি করতে হবে।
চীন এবং তার অংশীদার দেশগুলো ধীরে ধীরে রেনমিনভি-ভিত্তিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ করছে, যাতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমানো যায়। এই পরিবর্তন ধীরগতির হলেও প্রবণতাটি এখন স্পষ্ট—বিশ্ব ধীরে ধীরে ডলারের একক আধিপত্য থেকে সরে যাচ্ছে।
সবশেষে রয়েছে ভাবমূর্তিগত লাভ। ট্রাম্প প্রশাসন এই যুদ্ধে প্রবেশ করেছিল বড় বড় লক্ষ্য নিয়ে—ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিষ্ক্রিয় করা। কিন্তু স্থায়ীভাবে এসবের কোনোটিই তারা অর্জন করতে পারেনি। এখন তাদের লক্ষ্য কেবল হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া—যে প্রণালি যুদ্ধ শুরুর আগেও খোলা ছিল।
এই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ট্রাম্প নিজেই। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েক দশক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে, বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ক্ষয় হয়েছে, এশিয়া থেকে সামরিক সম্পদ সরিয়ে নিতে হয়েছে, মিত্রদের উদ্বিগ্ন করে তুলতে হয়েছে এবং এটিও প্রমাণ হয়েছে যে, সামরিক শক্তি যত বড়ই হোক না কেন, ভুল কৌশল ও বারবার পরিবর্তিত যুদ্ধনীতি শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না।
অন্যদিকে চীন খুবই সীমিত ভূমিকা নিয়েছে। তারা ইরানের কাছ থেকে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং ইরানকে রক্ষা করা বা উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যয়বহুল দায়িত্ব নেয়নি। এটাই বেইজিংয়ের পছন্দের কৌশল—বড় ধরনের সংঘাতে না জড়িয়ে ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব বিস্তার করা।
গত ২৫ বছরে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি বড় সামরিক অভিযানে বিপুল শক্তি ও সম্পদ ব্যয় করেছে। বিপরীতে চীন একই সময়ে তার উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক সম্পর্ককে ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী করেছে।
ওয়াশিংটন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়; বেইজিং অপেক্ষা করে। অবশ্য এই যুদ্ধের কারণে চীনও কিছু মূল্য দিয়েছে—জ্বালানির দাম বেড়েছে, সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়েছে এবং বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল হয়েছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির মূল্যায়ন সবসময় আপেক্ষিক। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য, জোট এবং বিশ্বাসযোগ্যতার যে ক্ষতি হয়েছে, তার তুলনায় এই সংঘাতের শেষে চীনই এগিয়ে রয়েছে।
(ফারিদ জাকারিয়া ভারতীয় বংশোদ্ভূত একজন মার্কিন সাংবাদিক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং বিশ্ব রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে লেখালেখি করে আসছেন। তিনি সিএনএন (CNN)-এর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান "Fareed Zakaria GPS"-এর সঞ্চালক এবং The Washington Post-এর নিয়মিত মতামত লেখক।
সম্প্রতি দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর মতামত বিভাগে প্রকাশিত তাঁর একটি নিবন্ধে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ভূরাজনৈতিক প্রভাব এবং এই সংকট থেকে চীনের কৌশলগত লাভ নিয়ে বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। পলিসি পেপার-এর পাঠকদের জন্য নিবন্ধটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।
Author