
নিউইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েল বহু বছর ধরে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে একটি ইসরায়েলি গোয়েন্দা ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার গোপন পরিকল্পনা চালায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ লক্ষ্যে বিদেশে তাঁর সঙ্গে একাধিক গোপন বৈঠক, আর্থিক সহায়তা এবং সরকার পরিবর্তনের একটি বৃহত্তর পরিকল্পনা ছিল, যা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। প্রতিবেদনে এসব তথ্য মার্কিন, ইরানি ও ইসরায়েলি বিভিন্ন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার বরাতে তুলে ধরা হয়েছে। তবে ইসরায়েল এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি এবং আহমাদিনেজাদের পক্ষ থেকেও এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
পলিসি পেপারের পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটির বাংলায় অনুবাদ করা হলো।
ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে একটি গোয়েন্দা সম্পদ (ইন্টেলিজেন্স অ্যাসেট) হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইসরায়েলের বহু বছরব্যাপী গোপন প্রচেষ্টা যুদ্ধের শুরুর দিকে নাটকীয় এক পর্যায়ে পৌঁছায়। পরিকল্পনা ছিল তাঁকে নিরাপদে ইসরায়েলের একটি সেফ হাউসে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
লেখক: মার্ক মাজেত্তি, জুলিয়ান ই. বার্নস, ফারনাজ ফাসিহি এবং রোনেন বার্গম্যান
এর আগে এই প্রতিবেদকরাই প্রথম প্রকাশ করেছিলেন যে, ইরানে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় আনার লক্ষ্যে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল।
২০২৪ সালের শুরুর দিকে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর অধ্যাপক গেরগেলি ডেলি দেশটির সরকারের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার কাছ থেকে একটি বিস্ময়কর অনুরোধ পান।
ওই কর্মকর্তা তাঁকে জানান, লুডোভিকা ইউনিভার্সিটি অব পাবলিক সার্ভিসে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করতে হবে এবং সেখানে একজন অপ্রত্যাশিত অতিথিকে আমন্ত্রণ জানাতে হবে—ইরানের ব্যাপক বিতর্কিত ও সমালোচিত সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে।
এর চেয়েও বিস্ময়কর ছিল এর উদ্দেশ্য। ওই সরকারি কর্মকর্তা অধ্যাপক ডেলিকে জানান, জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলনটি আসলে একটি ছদ্মাবরণ মাত্র। প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল, বুদাপেস্টে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য শত্রু ইসরায়েলের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের গোপন বৈঠকের ব্যবস্থা করা।
অধ্যাপক ডেলি জানতেন, আহমাদিনেজাদকে আমন্ত্রণ জানালে তাঁর ব্যক্তিগত সুনাম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা—উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তাঁর বিশ্বাস ছিল, এ উদ্যোগের মাধ্যমে হয়তো বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।
তিনি বলেন, “আপনার যদি দুইজন শত্রু থাকে এবং তারা যদি একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে চায়, তাহলে তাদের সেই আলোচনার সুযোগ করে দিতে যা সম্ভব, সেটাই করা উচিত।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে লুডোভিকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আহমাদিনেজাদের সফর এবং পরের বছরের দ্বিতীয় সফর ছিল ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি একটি গোপন পরিকল্পনার অংশ। ওই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল আহমাদিনেজাদকে ধীরে ধীরে একটি গোয়েন্দা সম্পদ (ইন্টেলিজেন্স অ্যাসেট) হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে উপযুক্ত সময়ে তাঁকে ইরানের নতুন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্যের কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা এ তথ্য জানান।
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, আহমাদিনেজাদকে নিজেদের পক্ষে আনার বিষয়টিকে ইসরায়েল এতটাই গুরুত্ব দিয়েছিল যে, ২০২৪ সালে দেশটির তৎকালীন গোয়েন্দাপ্রধান ডেভিড বার্নেয়া ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে যান। এর কিছুদিন পর ইসরায়েলের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ)-কে জানায় যে, তারা আহমাদিনেজাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে।
আহমাদিনেজাদকে কেন্দ্র করে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনা সাজানোর ইসরায়েলের সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর মোড়। কারণ, প্রেসিডেন্ট থাকাকালে আহমাদিনেজাদ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি নিয়মিত ইসরায়েল রাষ্ট্র ধ্বংসের আহ্বান জানাতেন এবং হলোকাস্টের ঘটনাও অস্বীকার করতেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল গোপনে মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে আবাসন ও ভ্রমণ ব্যয়ের জন্য অর্থ সহায়তা দিয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুদাপেস্ট সফরসহ বিদেশে বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে একাধিকবার গোপন বৈঠক করেছেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের প্রথম দিকের দিনগুলোতে—এই দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা নাটকীয় এক পর্যায়ে পৌঁছায়। তেহরানে কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকা সাবেক এই নেতাকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য একটি সাহসী গোপন অভিযান পরিচালনা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে উৎখাতের পরিকল্পনা কার্যকর করে আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠা করা।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের একটি বিমান হামলায় আহমাদিনেজাদের আবাসন কমপ্লেক্সে আঘাত হানা হয়। হামলার লক্ষ্য ছিল তাঁর দেহরক্ষীদের ভবন এবং বুলেটপ্রুফ যান। হামলার পর চারজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি কালো রঙের পিউজো গাড়ি সেখানে এসে আহমাদিনেজাদকে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়।
অভিযান সম্পর্কে অবগত মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, গাড়িটি মোসাদের সদস্যরা চালাচ্ছিলেন। তাঁরা আহমাদিনেজাদকে ইরানের ভেতরে একটি গোপন সেফ হাউসে নিয়ে যান।
তবে ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের মতে, এই তড়িঘড়ি উদ্ধার অভিযানে আহমাদিনেজাদ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। একই সঙ্গে তাঁকে আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার ইসরায়েলি পরিকল্পনা নিয়েও তিনি আস্থা হারাতে শুরু করেন।
পরবর্তীতে তিনি ওই সেফ হাউস ত্যাগ করেন। তবে কী পরিস্থিতিতে তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এরপর দীর্ঘ সময় তাঁকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। সর্বশেষ গত সোমবার নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও শেষকৃত্যের শোভাযাত্রায় তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য প্রকাশ্যে আসেন।
বর্তমানে আহমাদিনেজাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে চারজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তার দাবি, ইসরায়েলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষ অবগত হওয়ার পর থেকে তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর গোয়েন্দা শাখার হেফাজতে রয়েছেন এবং তাঁকে গৃহবন্দি রাখা হয়েছে।
তেহরানের সরকারকে উৎখাতের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে ইরানের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
এই পরিকল্পনার আরেকটি অংশ ছিল উত্তর ইরাকভিত্তিক ইরানি কুর্দি বিরোধী যোদ্ধাদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে পশ্চিম ইরানে প্রবেশ করানো। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা সেখানে নির্দিষ্ট এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পরে রাজধানী তেহরানের দিকে অগ্রসর হবে। তবে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
নিউইয়র্ক টাইমস প্রথম আহমাদিনেজাদের ভূমিকা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত মে মাসে পিবিএসের টক শো ফায়ারিং লাইন-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান তামির হাইম্যান বলেন, “সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনায় ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকটি বিশেষ অভিযান পরিচালনার কথা ছিল, যা ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমধর্মী। আর সেই ধারাবাহিক পরিকল্পনারই একটি অংশ ছিলেন আহমাদিনেজাদ।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোন জবাব দেয়নি ইসরায়েলের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ।
অন্যদিকে আহমাদিনেজাদের মুখপাত্র আলি আকবর জাভানফেকরও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
প্রেসিডেন্ট-পরবর্তী অবস্থান পরিবর্তন
২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মাহমুদ আহমাদিনেজাদ দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী কট্টরপন্থী রাজনীতিকদের একজন ছিলেন। তিনি বারবার ইসরায়েলকে বিলুপ্ত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর শাসনামলে ইরান পুনরায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শুরু করে, যা দেশটি গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি চালাচ্ছে—এমন আন্তর্জাতিক সন্দেহকে আরও জোরালো করে।
২০০৯ সালের বিতর্কিত পুনর্নির্বাচনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যে গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, আহমাদিনেজাদ সেই আন্দোলন কঠোর শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করার নির্দেশ দেন। তাঁর শাসনামলে বিচার বিভাগ বহু ভিন্নমতাবলম্বীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও বিরোধীদের কারাবন্দি করে।
তবে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়ার পরের বছরগুলোতে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের অবস্থানে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে। তিনি আগের তুলনায় অনেক সংযত বক্তব্য দিতে শুরু করেন এবং প্রেসিডেন্ট থাকাকালে যেভাবে নিয়মিত ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্য দিতেন, সেই কড়া ভাষাও অনেকটাই পরিহার করেন।
নিজের নতুন, অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থী ভাবমূর্তি তুলে ধরতে তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেন এবং জনসভায় বক্তব্য রাখেন। এসব বক্তব্যে তিনি ইরানের জনপ্রিয় সংগীত সংস্কৃতি নিয়ে মতামত প্রকাশ করেন, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়চনার সমালোচনা করেন এবং শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন।
ব্যক্তিগত উপস্থিতিতেও পরিবর্তন আনেন আহমাদিনেজাদ। দীর্ঘদিনের পরিচিত ঢিলেঢালা খাকি রঙের জ্যাকেট পরা ছেড়ে তিনি পরিপাটি সেলাই করা স্যুট পরতে শুরু করেন। এলোমেলো দাড়িও ছেঁটে গোছানো রাখতেন। এমনকি তিনি বোটক্স চিকিৎসা নিয়েছেন বলেও ধারণা করা হয় এবং ইংরেজি ভাষা শেখাও শুরু করেন।
তেহরানে তাঁর কার্যালয়ে তিনি প্রায় প্রতিদিন সকালে দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে উন্মুক্ত বৈঠক করতেন। সেখানে মানুষ তাঁদের নানা অভিযোগ ও সমস্যার কথা জানাতেন, বিশেষ করে সরকারি প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে সহায়তা চাইতেন। কখনো কখনো তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখে আবেদনকারীদের ঋণ পাওয়ার সুপারিশও করতেন। একই সঙ্গে তিনি নিয়মিত দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামীণ এলাকায় সফর করে সমর্থকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন।
ইরানের শাসকব্যবস্থার সঙ্গে আহমাদিনেজাদের সম্পর্ক ছিল জটিল। দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব একদিকে তাঁকে প্রান্তিক করে রাখে এবং তাঁর চলাফেরায় বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ নেতাকে পরামর্শ দেওয়া উচ্চপর্যায়ের একটি পরিষদে অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁকে সদস্য হিসেবে বহাল রাখা হয়। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ওই পরিষদের বৈঠকেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন।
ইরানের অনেকেই আহমাদিনেজাদের এই পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দেখেছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, তিনি জনমুখী রাজনীতিক হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করতে এবং ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী থেকে নিজেকে আলাদা হিসেবে উপস্থাপন করতেই এ কৌশল নিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা বজায় ছিল। তাঁর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের বিশ্বাস ছিল, একদিন আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।
আহমাদিনেজাদের সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আবদোলরেজা দাভারি এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বলেন, “আহমাদিনেজাদ অর্থের জন্য এমন কিছু করবেন না। তাঁর অর্থের অভাব নেই; তাঁর বিস্তৃত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক রয়েছে। তিনি এটি করবেন ক্ষমতার জন্য। তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে যেতে চান।” তবে কয়েক বছর আগে তাঁদের দুজনের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
আহমাদিনেজাদের ঘনিষ্ঠ মহলের একজন সহযোগী, যিনি ব্যক্তিগত আলাপের বিষয় হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন, দাবি করেন যে আহমাদিনেজাদ তাঁর কয়েকজন বিশ্বস্ত সহযোগী ও আস্থাভাজন ব্যক্তিকে জানিয়েছিলেন—বিদেশি শক্তির সহায়তায় ভবিষ্যতে ইরানের নেতৃত্বে আসার আকাঙ্ক্ষা তাঁর রয়েছে।
ওই সহযোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, পরপর তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার পর আহমাদিনেজাদ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েন। তখন তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, বর্তমান শাসনব্যবস্থা বহাল থাকলে তাঁর পক্ষে আর কখনো ক্ষমতায় ফেরা সম্ভব নয়।
সহযোগীটির দাবি, আহমাদিনেজাদের আশঙ্কা ছিল—যদি যুদ্ধ এবং সরকার পরিবর্তনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বাইরে অবস্থানরত এমন কোনো বিরোধী নেতাকে বেছে নিতে পারে, যিনি দেশের বাস্তবতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। এতে ইরান আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠদের কাছে নিজেকে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের মতো একজন সংস্কারক হিসেবে উপস্থাপন করতেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, তিনি ক্ষমতায় এলে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবেন এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর অংশ হিসেবে ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করবেন।
সে সময় আহমাদিনেজাদ ও ইরানের শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব ও দ্বন্দ্ব ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল বলে দাবি করেছেন সে সময়কার গোয়েন্দা মূল্যায়নের সঙ্গে পরিচিত ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা খাতের দুই কর্মকর্তা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রতি আহমাদিনেজাদের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ—যারা তাঁকে পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেননি—ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে।
আহমাদিনেজাদের কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর গোয়েন্দা শাখার সন্দেহের কারণ হয়ে ওঠে। বিদেশি হস্তক্ষেপ থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখার দায়িত্বে থাকা এই সংস্থার দুই সদস্য এবং মামলাটির সঙ্গে পরিচিত একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার দাবি, ২০১৭ সালে আহমাদিনেজাদ প্রকাশ্যে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এবং পরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে চিঠি পাঠানোর পর তাঁদের সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। পরবর্তীতে ট্রাম্প ওই দুই নেতারই প্রশংসা করেছিলেন।
চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ইসরায়েলের বিমান হামলার ফলে আহমাদিনেজাদ সাময়িকভাবে আইআরজিসির নজরদারির বাইরে চলে যাওয়ার পর ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাঁর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্ভাব্য যোগাযোগের বিষয়টি তদন্ত শুরু করে এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত একত্র করে সেই সম্পর্কের সূত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা চালায়।
বিদেশে গোপন বৈঠক
ইসরায়েলি গোয়েন্দারা ঠিক কবে প্রথম আহমাদিনেজাদকে নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা শুরু করেছিল, তা স্পষ্ট নয়। তবে ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, অন্তত ২০২৩ সালে পরিবেশবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে গুয়াতেমালা সফরের সময় তাঁর সঙ্গে কিছু যোগাযোগ হয়েছিল। ওই সম্মেলনে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল গুয়াতেমালা সরকার—লাতিন আমেরিকার এমন একটি দেশ, যার সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক অঞ্চলটির অধিকাংশ দেশের তুলনায় ঘনিষ্ঠ।
তবে শুরুতে আহমাদিনেজাদের ওই সফরই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তেহরান বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে বোর্ডিং পাস দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং দেশ ছাড়ার অনুমতিও দেননি।
এর প্রতিবাদে তিনি বিমানবন্দরেই কয়েক ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। ঘটনাটি দ্রুত জনদৃষ্টিতে আসে। অবস্থান চলাকালে তিনি সাধারণ যাত্রী, বিমানবন্দরের কর্মী ও বিমান সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছবি তোলেন এবং নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেন।
শেষ পর্যন্ত ইরানি কর্তৃপক্ষ তাঁকে দেশত্যাগের অনুমতি দেয়। এরপর তিনি গুয়াতেমালায় গিয়ে সম্মেলনে অংশ নেন।
“কেউ কেউ আমাকে গুয়াতেমালা সফরে না যেতে বলেছিলেন। আমি তাঁদের বলেছি, আমার ভাই—যিনি দেশটির পরিবেশমন্ত্রী—আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন,” সফরকালে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে আহমাদিনেজাদকে এ কথা বলতে দেখা যায়। তিনি আরও বলেন, “লাতিন আমেরিকায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ।”
পরের বছর তিনি প্রথমবারের মতো হাঙ্গেরি সফর করেন লুডোভিকা ইউনিভার্সিটি অব পাবলিক সার্ভিসের একটি সম্মেলনে অংশ নিতে। ওই সফরেই বুদাপেস্টে তাঁর সঙ্গে পাঁচ বছর ধরে মোসাদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডেভিড বার্নেয়ার বৈঠক হয়। বার্নেয়ার দায়িত্ব শেষ হয় গত মাসে।
সে সময় হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ডানপন্থী নেতা ভিক্টর অরবান। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে হাঙ্গেরির সম্পর্ক ছিল সবচেয়ে ঘনিষ্ঠগুলোর একটি। অরবান ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একে অপরের দেশে একাধিকবার সফরও করেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে নেতানিয়াহুও লুডোভিকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য দেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়টি তাঁকে জনসেবায় অবদানের জন্য একটি সম্মাননা প্রদান করে।
এর দুই মাস পর, ইসরায়েল ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে আহমাদিনেজাদ আবারও বুদাপেস্ট সফর করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সফরটি ছিল মূলত ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর গোপন বৈঠকের আড়াল।
আইআরজিসির আনসার ইউনিটের সদস্যরা—যারা আহমাদিনেজাদের সব বিদেশ সফরে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন—তাঁদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের জুনের ওই সফরে অন্তত দুবার আহমাদিনেজাদ নিরাপত্তারক্ষীদের নজর এড়িয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য নিখোঁজ ছিলেন। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের দুই সদস্য ও একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি বলেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপকের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই সম্মেলনে আহমাদিনেজাদ ইংরেজিতে বক্তব্য দেন, যা উপস্থিত অনেককেই বিস্মিত করে। কারণ, তিনি তাঁর প্রেসিডেন্ট থাকাকালে প্রতিটি বক্তৃতার শুরুতে যে কোরআনের আয়াত পাঠ করতেন, এবার তা পরিহার করেন।
গাঢ় নীল রঙের পরিপাটি স্যুট পরে দেওয়া সেই বক্তৃতায় তিনি “মানবজাতির অভিন্ন স্বার্থ” এবং “পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থা” নিয়ে কথা বলেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও অনুযায়ী, নতুন একটি বিশ্বব্যবস্থা কীভাবে গড়ে উঠতে পারে, সে সম্পর্কেও তিনি তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
সম্মেলনে আহমাদিনেজাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর অধ্যাপক গেরগেলি ডেলিকে প্রাচীন পারস্যের মহাকবি ফেরদৌসীর বিখ্যাত মহাকাব্য শাহনামা (Book of Kings)-এর একটি কপি উপহার দেন। জবাবে অধ্যাপক ডেলি তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্মারকচিহ্ন প্রদান করেন।
গত মাসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ডেলি বলেন, আহমাদিনেজাদকে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে তিনি মূলত একজন স্ট্রোমান (Strohmann)-এর ভূমিকা পালন করেছিলেন। জার্মান এই শব্দটির অর্থ হলো—কোনো পরিকল্পনার আড়ালে থাকা আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি, মুখপাত্র বা ‘ফ্রন্টম্যান’।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে তেহরানে নিজের বাসভবন থেকে কালো রঙের একটি পিউজো গাড়িতে করে তাঁকে সরিয়ে নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় জনসমক্ষে দেখা যায়নি আহমাদিনেজাদকে।
অবশেষে গত সোমবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্যের শোভাযাত্রায় তিনি হঠাৎ সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য প্রকাশ্যে আসেন। শোভাযাত্রার ভিডিওতে দেখা যায়, প্রায় ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (প্রায় ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রার মধ্যেও তিনি একটি ভারী জ্যাকেট পরেছিলেন। তাঁর মুখে একটি সার্জিক্যাল মাস্ক ছিল, যা থুতনির নিচে নামানো ছিল।
অন্যদিকে ইরানের জীবিত সাবেক দুই প্রেসিডেন্ট—হাসান রুহানি ও মোহাম্মদ খাতামিকে—শেষকৃত্যের কোনো অনুষ্ঠানেই আমন্ত্রণ জানানো হয়নি এবং তাঁদের কোথাও দেখা যায়নি।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, আহমাদিনেজাদ মাথা নিচু করে নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চারপাশে নিরাপত্তারক্ষী বলে মনে হওয়া কয়েকজন ব্যক্তি ঘিরে ছিলেন।
Author