
১০০ দিনের কিছু বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেই শিরোনামে চলে এসেছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। সর্বশেষ তিনি আলোচনায় এসেছেন নিজ এলাকায় ইউনিয়নের নামকরণ আর তার অদ্ভুত ব্যাখ্যা দিয়ে। তাঁর নির্বাচনী এলাকায় দুটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয় তাঁর দুই সন্তানের নামে। সংসদে এ নিয়ে সমালোচনা হলে তিনি জবাব দিয়েছেন। বলেছেন, এটা কাকতালীয়। যদিও ডকুমেন্ট ভিন্ন কথা বলে।
সাংবাদিক আকবর হোসেন প্রশ্নটি তুলেছেন। যদিও মাস কয়েক ধরেই এটি আলোচনায় ছিল। বগুড়ার স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী হলেও জাতীয় পর্যায়ে কখনও তাঁর নাম শোনা যায়নি। অথচ নির্বাচনের পর তিনিই পেলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়। যদিও মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, কিন্তু কান পাতলেই প্রতিমন্ত্রীর ক্ষমতার আওয়াজ পাওয়া যায়। সালাহউদ্দিন আহমেদও নিশ্চিত করছেন, সবচেয়ে ক্ষমতাবান প্রতিমন্ত্রীর নাম মীর শাহে আলম।
প্রথমত, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অতিবৃষ্টির পর নগরীর বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। অথচ প্রতিমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাকে ‘ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও কাল্পনিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। কোনো সমস্যা থাকলে তা অস্বীকার করার পরিবর্তে সমস্যার মাত্রা, কারণ এবং সমাধানের রূপরেখা তুলে ধরা একজন দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধির কাজ। বাস্তবতার সঙ্গে মানুষের অভিজ্ঞতার যখন ফারাক দেখা যায়, তখন সরকারি বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, রাজধানীর দিয়াবাড়ি এলাকায় মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে গরুর হাট বসানোর ঘটনা নিয়েও তাঁর বক্তব্য বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, কেবল বৃষ্টির কারণে কিছু ব্যবসায়ী সাময়িকভাবে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং পরে তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরেজমিন পর্যবেক্ষণ, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া এবং ভাইরাল হওয়া ভিডিওচিত্র ভিন্ন চিত্রই তুলে ধরে। এখানে মূল প্রশ্ন হলো—ঘটনাটি কেন ঘটল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগে থেকে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলো কেন? সেই জবাব না দিয়ে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করা সমস্যার মূল কারণ আড়াল করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। নিজ এলাকায় পারিবারিক পরিচয় ও সন্তানদের নামে বিভিন্ন ইউনিয়নের নামকরণের অভিযোগ জনমনে স্বজনপ্রীতি ও ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয় সরকারব্যবস্থার মূল দর্শন হলো জনগণের অংশগ্রহণ ও স্থানীয় ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান। সেখানে কোনো জনপ্রতিনিধির পারিবারিক পরিচয়কে সরকারি কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে আলোচনা হওয়াই স্বাভাবিক।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমালোচনা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বরং সমালোচনাকে গ্রহণ করে ভুল-ত্রুটি সংশোধনের মধ্যেই নেতৃত্বের পরিপক্বতা প্রকাশ পায়। একজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব কেবল সরকারের সাফল্য প্রচার করা নয়; বরং বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হওয়া এবং জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা তুলে ধরা। বারবার বিতর্কিত বক্তব্য ও ঘটনাপ্রবাহের কারণে মীর শাহে আলম এখন বিরোধীদের সমালোচনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রশ্নেরও মুখোমুখি।
রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো জনগণের আস্থা। সেই আস্থা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু হারানো সহজ। তাই তথ্য অস্বীকার নয়, বরং বাস্তবতা স্বীকার করে কার্যকর সমাধানের পথ দেখানোই প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এ বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) পাওয়ার পর দুই উপজেলার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করে চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠনের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। নামকরণের আগে এলাকাবাসীর মতামত গ্রহণের জন্য গণশুনানি করা হয়।’
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পক্ষ থেকে দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন-এর সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক, প্রতিবেদক ও বগুড়া প্রতিনিধিসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বগুড়া প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ তানভীর আলম বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়, অভিযুক্তরা পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী এবং বাদীর ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করেছেন। বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়।
আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট থানাকে আদেশ দিয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের একের পর এক রসিকতায় তাঁর দম্ভই প্রকাশ পাচ্ছে। এতে তাঁর ইমেজের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকারের ইমেজ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এমন আচরণের পরিণতি ভালো হয় না। প্রধানমন্ত্রীর উচিত, অনতিবিলম্বে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
Author