
একসময় বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জন এফ. ড্যানিলোভিচ মনে করেন, বাংলাদেশের ওপর ভারতের একক প্রাধান্যের যুগ স্পষ্টভাবেই শেষ হয়ে গেছে।
সম্প্রতি দ্য ডেল্টাগ্রাম-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, শেখ হাসিনার শাসনামল, আঞ্চলিক করিডোর, রোহিঙ্গা সংকট, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং বিএনপি সরকারের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলেন। অভিজ্ঞ মার্কিন কূটনীতিক ব্যাখ্যা করেছেন কেন ঢাকায় ভারতের প্রভাব কমছে এবং এতে কারা লাভবান হতে পারে। পলিসি পেপার-এর পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা হলো।
প্রশ্ন: শেখ হাসিনা মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন এবং ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। তবুও তিনি এখনো ভারতে অবস্থান করছেন। এমন পরিস্থিতিতে, যখন ভারত সক্রিয় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন দণ্ডিত ব্যক্তিকে আশ্রয় দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশ বাস্তবিক অর্থে ভারতের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে?
জন এফ. ড্যানিলোভিচ: বাংলাদেশ ও ভারত ভৌগোলিক অবস্থান এবং ইতিহাসের বন্ধনে গভীরভাবে যুক্ত। সরকার-সরকার পর্যায়ে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর উভয় দেশই সম্পর্ক পুনর্গঠনের আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের ভারত সফর ছিল বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে ধীর, স্থির এবং বাস্তববাদী উপায়ে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত।
একই সময়ে, ঢাকা দেখিয়েছে যে তারা একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চায়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক সমান গুরুত্ব পাবে। বাংলাদেশে ভারতের একক প্রভাব বা প্রাধান্যের যুগ স্পষ্টভাবেই শেষ হয়ে গেছে।
তবে সরকার-সরকার সম্পর্কের বাইরেও জনমতের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার শাসনামলে এবং ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় ভারতে বাংলাদেশের জনগণের আস্থা ও ইতিবাচক ধারণা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাসিনা এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের অনেকের ভারতে অবস্থান অবশ্যই উন্নত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পথে একটি বড় বাধা। দুই দেশ যখন তাদের সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে, তখন কোনো সরকারই এই জনমতকে উপেক্ষা করতে পারবে না।
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচনের আগে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর ও ভুয়া তথ্যের কারণে ভারতের জনগণের মধ্যেও বাংলাদেশ সম্পর্কে বিকৃত ধারণা তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশকে সম্ভাব্য চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত করার আলোচনা চলছে। বিষয়টিকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত? এটি কি বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বাংলাদেশের ভারসাম্য রক্ষার কৌশলকে কঠিন করে তুলবে?
জন এফ. ড্যানিলোভিচ: বাংলাদেশ যদি তার রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে চায় এবং নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়াতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই বিদেশি বিনিয়োগের দিকে তাকাতে হবে। এ ক্ষেত্রে চীন স্বাভাবিকভাবেই সম্ভাব্য বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস এবং একটি আকর্ষণীয় বাজার।
মিয়ানমার যদি স্থিতিশীল হয়, তবে বাংলাদেশের জন্য পূর্ব প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও সৃষ্টি হবে। দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার বাজারে প্রবেশ এবং সংযোগ বাড়াতে সহায়ক প্রকল্পগুলো বাংলাদেশ বিবেচনা করতেই পারে। বাংলাদেশ যদি দক্ষতার সঙ্গে তার কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা করতে পারে, তাহলে এ ধরনের উদ্যোগ ওয়াশিংটনের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনার কারণ হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন: রাখাইন রাজ্যে একটি করিডোর তৈরির প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা চলছে। এটি কি রোহিঙ্গা সংকটের বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ, নাকি মানবিক উদ্যোগের আড়ালে একটি কৌশলগত ঝুঁকি?
জন এফ. ড্যানিলোভিচ: রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক সহায়তা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ এই বিপুল শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে একীভূত করতে পারে না, যদিও দীর্ঘমেয়াদে সেটিই হয়তো সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হতে পারত।
তাই বাংলাদেশ নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির পথ খুঁজতে থাকবে। এই লক্ষ্য সামনে রেখে মিয়ানমারের সরকার এবং অন্যান্য রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা যেমন যৌক্তিক, তেমনি রাখাইন রাজ্যের মানুষের মানবিক চাহিদা পূরণেও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
আমি আগেও লিখেছি, তথাকথিত ‘মানবিক করিডোর’ নিয়ে যে সমালোচনার বড় অংশ হয়েছে, তা ছিল ভুল তথ্যনির্ভর এবং অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
প্রশ্ন: ঢাকা আসিয়ানের সঙ্গে কোনো ধরনের অংশীদারিত্বের কথা বলছে। এটি কি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ, নাকি দক্ষিণ এশিয়ার প্রচলিত প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে আসার একটি প্রতীকী প্রচেষ্টা?
জন এফ. ড্যানিলোভিচ: বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মধ্যে বৃহত্তর সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেছে এবং সেটি অব্যাহত রাখা সঠিক পদক্ষেপ। ভারত-পাকিস্তান বিরোধের কারণে সার্ক কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়লেও, বাংলাদেশ যে আঞ্চলিক সহযোগিতার চেতনা দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন করে এসেছে, সেটি অন্যদের মনে করিয়ে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের উচিত আসিয়ান এবং ডি-৮ জোটের মতো অন্যান্য আঞ্চলিক সহযোগিতার সুযোগও কাজে লাগানো। বহুপাক্ষিক কূটনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশের অনেক লাভ হতে পারে। সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া তারই একটি উদাহরণ।
প্রশ্ন: আপনি ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের পরিবর্তনকে ওয়াশিংটন কতটা গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে?
জন এফ. ড্যানিলোভিচ: যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে আগ্রহী। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশ ওয়াশিংটনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করার সিদ্ধান্তও এই সম্পর্ককে তারা কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা—উভয় ক্ষেত্রেই সম্পর্ক আরও বিস্তারের সুযোগ রয়েছে।
দুই দেশের রাজধানীতেই দক্ষ ও অভিজ্ঞ পেশাদার রাষ্ট্রদূত দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রাণবন্ত বাংলাদেশি-আমেরিকান প্রবাসী সম্প্রদায় দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আমি যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী।
জন এফ. ড্যানিলোভিচ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের (U.S. Department of State) একজন সাবেক কূটনীতিক। তাঁর কূটনৈতিক জীবনে তিনি বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন (Deputy Chief of Mission), দক্ষিণ সুদানে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত (Chargé d'Affaires ad interim) এবং পাকিস্তানের পেশোয়ারে যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল (Consul General) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
Author