
বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে এসেছে। বন্ধুত্ব, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, পারস্পরিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের পররাষ্ট্রনীতিগত নীতিমালা দ্বারা পরিচালিত হয়ে দেশটি এ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশ আঞ্চলিক প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার ধারণার পথিকৃৎ হিসেবে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উত্থাপন করে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক দূরদর্শিতা এ উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং তাঁর নেতৃত্বেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে একটি অভিন্ন আঞ্চলিক কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসা সম্ভব হয়।
সর্বাধিক কার্যকর সময়ে সার্ক বাণিজ্য, কৃষি, উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার একটি অপরিহার্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে। যদিও সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিপক্ষীয় বিরোধ নিয়ে আলোচনা করে না, তবুও এটি প্রায়ই সংলাপের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যা পরোক্ষভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের, মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে সহায়ক হয়েছে।
সার্ক কেন এখনো গুরুত্বপূর্ণ
বঙ্গোপসাগরীয় বহুমুখী কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগ (বিমসটেক), দক্ষিণ এশিয়া উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা (সাসেক) এবং বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল (বিবিআইএন)-এর মতো বিকল্প আঞ্চলিক উদ্যোগের আবির্ভাব সত্ত্বেও, সার্ক এখনো বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রাসঙ্গিকতা বহন করে। এর প্রধান কারণ হলো, অন্যান্য উদ্যোগগুলো উপ-আঞ্চলিক প্রকৃতির, অথচ সার্কই সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াকে অন্তর্ভুক্তকারী একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম।
এই প্রেক্ষাপটে, সার্কের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাতন্ত্র্য শুধু এর কাঠামোগত প্রাসঙ্গিকতাকেই শক্তিশালী করে না, বরং সদস্য রাষ্ট্রগুলো—বিশেষ করে বাংলাদেশ—কীভাবে তাদের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে, তাও প্রভাবিত করে। ‘পাথ-ডিপেনডেন্সি’ (ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার প্রভাব) দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, সার্কের প্রতি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অঙ্গীকার এখনো দেশটির আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে চলেছে। এই উত্তরাধিকার বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর শাসনামলে, যে দলটি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিএনপির রাজনৈতিক কাঠামো সমতা, ন্যায্যতা, বাস্তববাদ, পারস্পরিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করে। একই সঙ্গে দলটি আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সার্ককে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
আঞ্চলিক পুনরুজ্জীবনের সুযোগ
সার্কের পুনরুজ্জীবন একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ—উভয়ই সৃষ্টি করে। গঠনবাদী (Constructivist) দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সামাজিক আন্তঃসংযোগ এবং অভিন্ন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা সমষ্টিগত পরিচয় ও সামাজিক শিক্ষার মাধ্যমে আঞ্চলিক সংহতি গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে। একই সময়ে, নব্য-কার্যকরিতাবাদী (Neo-functionalist) তত্ত্ব বৃহত্তর আঞ্চলিক সংহতির সূচনাবিন্দু হিসেবে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে।
দক্ষিণ এশিয়ায় অভিন্ন ভোগের ধারা, ভৌগোলিক নৈকট্য এবং অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতার কারণে বাণিজ্যের বিপুল সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। সার্কের মাধ্যমে আঞ্চলিক বাণিজ্যকে অগ্রাধিকার দিলে পারস্পরিক সংযোগ আরও গভীর হতে পারে এবং অবকাঠামো উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্রস্তাবিত সার্ক মোটরযান চুক্তির (SAARC Motor Vehicle Agreement) মতো উদ্যোগ নেপাল ও ভুটানের মতো স্থলবেষ্টিত দেশগুলোর জন্য উল্লেখযোগ্য সুফল বয়ে আনতে পারে, পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্যও সম্প্রসারিত করতে পারে।
পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও নতুন করে আঞ্চলিক সহযোগিতার যৌক্তিকতাকে আরও জোরালো করেছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে, কারণ এ অঞ্চল এখন সংযোগ, বাণিজ্য করিডর, জ্বালানি নেটওয়ার্ক এবং সামুদ্রিক রুটের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। একটি কার্যকর সার্ক সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য অধিকতর সমষ্টিগত দর-কষাকষির সক্ষমতা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে পারে, যার মাধ্যমে তারা বহিঃশক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ অনুসরণ করতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে, পুনরুজ্জীবিত আঞ্চলিক সহযোগিতা অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি করবে এবং অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
সার্ক পুনরুজ্জীবনের প্রতিবন্ধকতা
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক উত্তেজনা সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার পথে এখনো একটি বড় বাধা। তবে উভয় দেশই সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (Shanghai Cooperation Organisation-SCO)-এর মতো অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে, যা প্রমাণ করে যে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা আঞ্চলিক সম্পৃক্ততার সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণভাবে নাকচ করে দেয় না।
অতিরিক্ত প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে সীমান্ত-পারাপার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, পারস্পরিক অবিশ্বাস, ভ্রান্ত তথ্য প্রচার এবং কঠোর ভিসা নীতি, যা আঞ্চলিক আস্থাকে দুর্বল করে। দক্ষিণ এশিয়ার গণমাধ্যমগুলোরও এ ক্ষেত্রে দায় রয়েছে, কারণ চাঞ্চল্যকর উপস্থাপনা এবং ভুল তথ্য প্রায়ই আঞ্চলিক বোঝাপড়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আস্থা গড়ে তোলা
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় একাডেমিক বিনিময়, ব্যবসায়িক সহযোগিতা, নাগরিক সমাজের সম্পৃক্ততা, সাংবাদিকতা, সাংস্কৃতিক কূটনীতি, ক্রীড়া কূটনীতি এবং পর্যটনের মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে জনগণের সংযোগ আরও বিস্তৃত করতে হবে। গবেষক, পেশাজীবী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের জন্য ভিসা-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করা হলে আঞ্চলিক সংহতির জন্য একটি ‘সফট উইন্ডো’ সৃষ্টি হতে পারে এবং ট্র্যাক-টু কূটনীতির মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠিত হতে পারে।
রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানোর একটি কৌশলগত উপায় হিসেবে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে। চীন ও ভারতের উদাহরণ, যেখানে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাণিজ্য অব্যাহত রয়েছে, দেখায় যে অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে। অনুরূপ একটি পদ্ধতি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াজুড়েও প্রয়োগ করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের অনুঘটক ভূমিকা
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিকতাকে পুনরুজ্জীবিত করার সময় এখন এসে গেছে। আঞ্চলিক সহযোগিতা ও গণতান্ত্রিক উন্নয়নের প্রতি দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারের কারণে বাংলাদেশ সার্ক পুনরুজ্জীবনে একটি অনুঘটকের ভূমিকা পালনের জন্য অনুকূল অবস্থানে রয়েছে। রাজনৈতিক সংলাপ, অর্থনৈতিক সংহতি এবং সফট ডিপ্লোমেসি বা নরম কূটনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার পথে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনে সহায়তা করতে পারে।
পরিশেষে, সার্কের পুনরুজ্জীবন কেবল বাংলাদেশের নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি সকল সদস্য রাষ্ট্রের সম্মিলিত রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। এরই মধ্যে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সম্পৃক্ততার পথ উন্মুক্ত রেখে, সংলাপের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এবং বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে ধীরে ধীরে ঐকমত্য গড়ে তোলার মাধ্যমে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে যেতে পারে, যা আঞ্চলিকতাবাদের চেতনাকে টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হবে। নবায়িত রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতা আবারও এ অঞ্চলের ভবিষ্যৎ রূপান্তরের একটি শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
ইসরাফিল খসরু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসনের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির বিশেষ সহকারী।
The wire থেকে অনূদিত
Author