ওহুদ নাসার। গাজাভিত্তিক লেখক, সাংবাদিক। আল জাজিরায় তিনি লিখেছেন তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সাংবাদিক ইসমাইল আল-ঘৌলকে নিয়ে। ইসমাইল আল জাজিরারই সাংবাদিক ছিলেন। ইসরাইলের হামলায় নিহত হন। এ লেখা নিশ্চিতভাবেই আপনাকে আবেগতাড়িত করবে। আমরা তাদের জন্য প্রার্থনা করি।

বছর দুয়েক আগের কথা। ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই। গাজা সিটির রিমাল এলাকায় দুই বোনের সঙ্গে সন্ধ্যাটা কাটাচ্ছিলাম। আমরা নতুন পোশাক কিনছিলাম। বহুদিন পর আমার মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছিলাম, একদিন এই যুদ্ধ শেষ হবে। আমরা জাবালিয়ায় আমাদের বাড়িতে ফিরে যাবো। বাড়িটি আবার নতুন করে গড়ে তুলব।
একটি পোশাক হাতে তুলে দেখছিলাম, তখন হঠাৎ দোকানদার আমাদের কথার মধ্যে বাধা দিলেন। চোখে তার পানি। ফোনের দিকে তাকিয়ে বলছিলেন, “ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইসমাইল আল-ঘৌলকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।”
মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম“আপনি কি নিশ্চিত?”
কাঁপা কণ্ঠে তিনি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ… ওরা তাকে হত্যা করেছে।”
চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। দ্রুতই দোকান থেকে বের হয়ে গেলাম। বারবার একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—কেন? এমন কী করেছিলেন তিনি, যার জন্য তাঁকে এভাবে হত্যা করা হলো?
শুধু এই কারণে ইসমাইলের জন্য শোক করছিলাম না যে তিনি একজন সাংবাদিক ছিলেন এবং বিশ্বের সামনে গাজার ছবি তুলে ধরছিলেন। আমি শোকাহত ছিলাম, কারণ তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। আমার কাছে তিনি ছিলেন জীবনকে ভালোবাসা একজন মানুষ, যিনি স্বপ্ন দেখতেন—যুদ্ধ শেষ হলে স্ত্রী ও ছোট মেয়ে জিনার সঙ্গে আবার মিলিত হবেন। যুদ্ধ তাঁদের পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।
ইসমাইলের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়, যখন বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর আমি ও আমার পরিবার আশ্রয় নিয়েছিলাম আল-শিফা হাসপাতালে। আমার বাবা তাঁকে চিনতেন। তিনি আমাকে ইসমাইলের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন এই আশায় যে, হয়তো তিনি আমার ফোনটি চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারবেন। তখন টানা তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে আমার ফোনটি বন্ধ ছিল। কোথাও বিদ্যুৎ ছিল না।
আমরা যখন তাঁকে খুঁজে পেলাম, তিনি তখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে। গায়ে ছিল সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত প্রেস ভেস্ট ও হেলমেট, আর হাতে ছিল আল জাজিরার মাইক্রোফোন। তিনি তখন গাজায় কী ঘটছে, তা সরাসরি সম্প্রচার করছিলেন। সম্প্রচার শেষ হলে আমার বাবা আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দেন।
আমাদের কথাবার্তা হয়েছিল মাত্র কয়েক মিনিট। আমি যে সাবলীলভাবে ইংরেজি বলতে পারি, তা জানতে পেরে তিনি বলেছিলেন, “তোমার ইংরেজি দক্ষতায় বিনিয়োগ করো। এই ভাষাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের কণ্ঠস্বর বিশ্বের কাছে পৌঁছে দাও।”
সেই সময় তাঁর পরামর্শ বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়েছিল। কোথাও বিদ্যুৎ ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না, লেখালেখি বা সাংবাদিকতা করারও কোনো সুযোগ ছিল না। তবুও তাঁর কথাগুলো আমার মনে গেঁথে রইল।
পরবর্তী কয়েক মাসে ইসমাইল শুধু সেই সাংবাদিকই ছিলেন না, যিনি আমাকে লিখতে উৎসাহ দিয়েছিলেন; তিনি আমাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর সঙ্গে যত বেশি পরিচয় হয়েছে, ততই বুঝেছি—স্ত্রী ও মেয়েকে তিনি কত গভীরভাবে মিস করতেন। তাঁর কথার বড় একটি অংশজুড়েই থাকত তাঁর ছোট্ট মেয়ে জিনা এবং সেই স্বপ্ন—যুদ্ধ যেন দ্রুত শেষ হয়, যাতে তিনি আবার নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারেন।
আমার বাবা সবসময় তাঁকে স্নেহভরে “আবু জিনা” বলে ডাকতেন—আরব সংস্কৃতিতে যার অর্থ ‘জিনার বাবা’। তিনি সবসময় আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, যেন ইসমাইল তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে জিনার সঙ্গে আবার মিলিত হতে পারেন। যুদ্ধের কারণে তারা দক্ষিণ গাজায় বাস্তুচ্যুত হয়ে ছিলেন। বাবা যখনই এই দোয়া করতেন, ইসমাইল হাসিমুখে তাঁকে জড়িয়ে ধরতেন।
একদিন তিনি আনন্দের সঙ্গে বাবাকে জানালেন, অবশেষে তিনি তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পেরেছেন এবং ভিডিও কলে ছোট্ট জিনাকে দেখতে পেয়েছেন।
ইসমাইল আমার বড় ভাই উদয়েরও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তারা প্রায়ই একসঙ্গে সময় কাটাতেন। আল-শিফা হাসপাতালে আশ্রয় নেওয়ার সময় আমার বাবা আহত হলে ইসমাইল তাঁকে দেখতে এসেছিলেন। বাবার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়ে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বাবা সুস্থ হয়ে উঠলে তিনি বাবা, উদয় এবং তাঁদের বন্ধুদের জন্য মাছ রান্না করে খাওয়াবেন।
আমরা সবাই অবাক হয়েছিলাম। তখন মাছ পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। সমুদ্রে যাওয়া ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যেটুকু মাছ বাজারে পাওয়া যেত, তার দাম ছিল আকাশছোঁয়া। বাবা তাঁকে এত কষ্ট না করতে বোঝানোর চেষ্টা করলে ইসমাইল হেসে বলেছিলেন, “আপনি তো আমার প্রিয় বন্ধু, আবু উদয়।”
ইসমাইলকে খুব কমই দেখা যেত তাঁর ছোট্ট থার্মোসটি ছাড়া। সেটি সবসময় গরম কফিতে ভরা থাকত। একদিন উদয় বাসায় ফিরে বলল, “আজ আমি ইসমাইলের সঙ্গে কফি খেয়েছি।”
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। কারণ, সে তো কফি পছন্দ করত না।
উদয় হেসে বলল, “ইসমাইল আমাকে এক কাপ কফি দিয়ে বলেছিল, ‘যদি আমাকে ভালোবাসো, তাহলে এটা খাও।’ তাই খেয়েছি।”
২০২৪ সালের জুনে আমরা আবারও বাস্তুচ্যুত হলাম। এবার আশ্রয় নিলাম গাজা সিটির রিমাল এলাকায় বাবার এক বন্ধুর বাড়িতে। বহু মাস পর প্রথমবারের মতো আমি ফোন চার্জ দিতে পারলাম এবং ইন্টারনেট ব্যবহার করার সুযোগ পেলাম। তখনই ইসমাইলের সেই কথাগুলো আমার মনে পড়ে গেল। আমি এমন সংবাদমাধ্যম খুঁজতে শুরু করলাম, যেখানে ইংরেজিতে লিখতে পারব। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী গাজার গল্প বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলাম।
পরের মাসে, নিহত হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, ইসমাইল আল-শিফা হাসপাতালের কাছে আমাদের পরিবারের গাড়িতে আমার ভাইয়ের সঙ্গে বসে ছিলেন। তাঁর পরিচিত সেই থার্মোস থেকে কফি পান করছিলেন, আর গ্রীষ্মের তীব্র রোদ থেকে বাঁচতে মাথায় ছিল হালকা বেইজ রঙের একটি ক্যাপ।
নিজের জীবনের শেষ রিপোর্টিং অ্যাসাইনমেন্টে যাওয়ার সময় তিনি ভুলে সেই ক্যাপ আর কফির থার্মোসটি আমাদের গাড়িতেই রেখে যান।
তাঁর মৃত্যুর পর বাবা সেই দুটি জিনিস যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন। তিনি প্রায়ই ক্যাপটি পরতেন এবং বলতেন, “ইসমাইলের রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতি এটি।” পরবর্তী প্রতিটি বাস্তুচ্যুতির সময়ও তিনি ক্যাপ ও থার্মোসটি সঙ্গে নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত আমরা উত্তর গাজার আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত সেই বাড়িতে ফিরে যাই, যেটি আবার নতুন করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলাম।
কিন্তু যুদ্ধের হাত থেকে সেই স্মৃতিচিহ্নও রক্ষা পায়নি।
২০২৫ সালের মে মাসের মাঝামাঝি আমরা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একটি ফোনকল পাই। তারা জানায়, কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের বাড়িতে বোমা হামলা চালানো হবে, তাই অবিলম্বে সরে যেতে হবে। আমরা কিছুই সঙ্গে নিতে পারিনি। কাপড়, খাবার, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র—সবকিছুই ফেলে রেখে পালাতে হয়েছিল। সেগুলোর মধ্যেই ছিল ইসমাইলের সেই ক্যাপ আর কফির থার্মোস।
অল্প সময়ের মধ্যেই বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। আর তার সঙ্গে হারিয়ে যায় ইসমাইলকে মনে করিয়ে দেওয়া আমাদের শেষ স্পর্শযোগ্য স্মৃতিচিহ্নগুলোও।
সেদিন ইসরায়েল শুধু একজন সাংবাদিককে হত্যা করেনি। তারা হত্যা করেছিল এমন একজন বাবাকে, যিনি নিজের মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরার অপেক্ষায় ছিলেন; এমন একজন স্বামীকে, যিনি যুদ্ধ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, যাতে আবার পরিবারের কাছে ফিরতে পারেন; এবং এমন একজন বন্ধুকে, যার আন্তরিকতা ও মানবিকতা সবার হৃদয় স্পর্শ করেছিল।
দুই বছর পরও আল-শিফা হাসপাতালে ইসমাইল আমাকে যে কথাগুলো বলেছিলেন, সেগুলোই আমার পথ দেখায়। তাঁর মৃত্যুর পর আমি তাঁকে একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম—আমি বিশ্বের সামনে গাজার গল্প বলে যাব। আজ আমি যে প্রতিটি গল্প লিখি, তা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করারই একটি চেষ্টা।
আল জাজিরায় প্রকাশিত লেখার অনুবাদ। অনুবাদে এআই এর সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।

Author