
ঢাকার মিরপুর ও চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় গতরাতে যা ঘটলো তা সরকারের জন্যে সতর্কবার্তা। দুটি ঘটানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়, দায়িত্ব ও দক্ষতা পর্যালোচনার দাবি রাখে। দুটো ঘটনাই শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য পাশবিক হত্যা-নির্যাতন ঘিরে।
ঢাকার মিরপুরে রামিসার বাসায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গেছেন। নিজ অফিসে ডেকে না এনে দরিদ্র মা বাবার বাসায় হাজির হয়েছেন। স্বান্তনা দিয়েছেন। এটা খুবই ইতিবাচক। নতুন বাংলাদেশে এটাই কাম্য। কিন্তু এটা দিনের বেলা হলে ভালো হতো। ঘনবসতির মিরপুর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্যে রাতের বেলাটা নাজুক। বিশৃঙ্খলার পরিকল্পনাকারীদের বাড়তি সুবিধা দেয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গাড়ি ঘিরে ভুয়া ভুয়া স্লোগান যারা দিয়েছে তাদের পরিচয় জানা দরকার। তারা রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার বিচার চায় না এটাকে পুঁজি করে ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়। রাজনৈতিক মতলব হাসিলের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে চায় কিনা তা পরিষ্কার হওয়া দরকার।
বিএনপির অনেক নেতাকর্মী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারিদের জামায়াত-শিবির হিসেবে উল্লেখ করে কড়া প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। যদি তাই হয়, জামায়াত কাজটি ঠিক করেনি। অনভিপ্রেত। জামায়াত আমিরের আসন মিরপুরে। সে এলাকায় প্রধানমন্ত্রী একজন ভিক্টিমের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে গেছেন, সেখানে স্বাগত জানানো উচিত ছিলো। এটাকে এপ্রিশিয়েট করা সমীচীন ছিল। তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো কয়েকটি ভিডিওতে 'ভুয়া ভুয়া' স্লোগান দেওয়া বিক্ষোভকারিদের যে চেহারা দেখেছি তাতে আমার মনে হয়েছে ওদের একটা অংশ ভাড়াটে টোকাই, অন্য অংশ ছাত্রলীগের বখাটে তরুণ। হয়তো সব চেহারা আমার নজরে আসেনি।
রামিসার ঘটনাটি দেশের কোটি বিবেকবান মানুষকে নাড়া দিয়েছে। ক্ষোভে-কষ্টে আমিও অনেকটা নির্বাক হয়ে কিছু লেখিনি। এটি যতটা না আইনশৃঙ্খলাজনিত৷ তার চেয়ে বেশি সামাজিক অবক্ষয়ের ফল। ধর্ষক-খুনি গ্রেফতার হয়েছে। স্বীকারোক্তি দিয়েছে আদালতে। এখন দ্রুত বিচারের পালা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, রবি- সোমবারের মধ্যে পুলিশ চার্জশিট দেবে। আইনমন্ত্রী বলেছেন - দ্রুতব বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। আর কি করার আছে? 'ভুয়া'রা ক্ষমতায় না থেকে 'আসল'রা ক্ষমতায় থাকলে আর কী করতেন?
আসলে এসব সামাজিক অপরাধ ইস্যু করে পতিত ফ্যাসিবাদীরা রাজনীতির মাঠে ফেরার পাটাতন তৈরি করছে। সরকারি দলের মাঠ নেতাকর্মীরা বুঝে না বুঝে অনেক জায়গায় সুযোগ করে দিচ্ছে। প্রধান বিরোধী দলও অনেক ক্ষেত্রে একই পথে হাটছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। মিরপুরে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিরা যাবেন স্থানীয় বিএন কোথায় ছিলো? মন্ত্রীর গাড়ি যেভাবে ওরা ঘিরে রেখেছিল, আরও বড় অঘটনও ঘটতে পারতো।
আর চট্টগ্রামে ধর্ষণের আসামিকে পুলিশ আটক করে থানায় নেওয়ার জন্যে রাতভর যুদ্ধ করতে হয়েছে। রণক্ষেত্র হয়েছে বাকলিয়া ও আশপাশের এলাকা। সেখানেও পতিত শক্তি সুযোগ নিয়েছে। নেবেই। সুযোগ পেলে কে নেয় না? তবে সরিষায় ভুত আছে কিনা দেখার বিষয়। পুলিশ কি ঘটনাটি যথাযথভানে হ্যান্ডেল করতে পেরেছে? লোকজন কম থাকতে ফোর্স বাড়িয়ে আসামিকে নিয়ে যেতে পারতো। কিন্তু বিক্ষোভ সংগঠিত হওয়ার পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়েছে। তাতে যা হওয়ার তাই হয়েছে। গুলি, টিয়ার খরচ হয়েছে। মোটর সাইকেল আরোহী দুই পুলিশ সদস্যকে আটকে বাইকে আগুন দিয়ে পলিশ সদস্যদের সেই আগুনে পোড়ার চেষ্টা করতে দেখা গেছে একদল দুর্বৃত্তকে। পুলিশের পিকআপ গাড়িও পুড়েছে। অনেক আহত হয়েছে। ভাগ্যিস প্রাণহানি হয়নি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে এ ঘটনায় কয়েকটা লাশ পড়তো।
এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে সরকারের দক্ষ-প্রাজ্ঞ লোকজনের টিম থাকা দরকার। নইলে সামনের দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। পতিত- নিষিদ্ধদের সাহস ও মনোবল চাঙা হচ্ছে। সাথে লুটের বিপুল অর্থের প্রবাহ যুক্ত হয়ে বেসামাল পরিস্থিতি তৈরি হতে দেরি হবে না। সাধু সাবধান!
লেখক- সাংবাদিক
Author