
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের মানুষ শুধু একটি নতুন সরকার নয়, বরং একটি নতুন রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতির প্রত্যাশা করেছিল। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান দাবি ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয়, বিচার বিভাগ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগে আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে এসেছে বিএনপি। এমনকি দলটির ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচিতেও স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অঙ্গীকার স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। প্রশাসন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়, নির্বাচন কমিশন এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনে ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক পরিচয়সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে এখন প্রশ্ন উঠছে—এটি কি প্রশাসনের গতি ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, নাকি অতীতে সমালোচিত দলীয়করণেরই নতুন সংস্করণ?
এই বিতর্কের সবচেয়ে বড় সূত্রপাত ঘটে জুলাই মাসে, যখন সরকার একযোগে ১১টি সরকারি সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। নিয়োগপ্রাপ্তদের বড় অংশই বিএনপির কেন্দ্রীয় বা বিভাগীয় পর্যায়ের নেতা। বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন, বিআইডব্লিউটিসি, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড, বাংলাদেশ জুট করপোরেশন, বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন, বিসিক, বোয়েসেল, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন এবং জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে এই নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রশাসন সংশ্লিষ্ট অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এত সংখ্যক সক্রিয় রাজনৈতিক নেতাকে একই সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়ার নজির বাংলাদেশের ইতিহাসে খুবই বিরল। যদিও সরকার এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময়ের প্রশাসনিক অচলাবস্থা কাটিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বস্ত ও প্রশাসনিকভাবে দক্ষ ব্যক্তিদের প্রয়োজন ছিল। তাদের ভাষ্য, অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন কার্যকর নেতৃত্বের অভাবে ছিল এবং আইনগতভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে কোনো বাধা নেই। সরকারের দাবি, এটি রাজনৈতিক পুরস্কার নয়; বরং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা।
তবে সমালোচকদের আপত্তি মূলত নিয়োগের ধরন নিয়ে। তাদের মতে, কোনো সিদ্ধান্ত আইনগতভাবে বৈধ হলেই তা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। বিশেষ করে যখন নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রায় সবাই একই রাজনৈতিক দলের সক্রিয় নেতা, তখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। শিল্প, কৃষি, জলবায়ু অর্থায়ন, শ্রম এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মতো জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপস্থিতি ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারণে দলীয় প্রভাব বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করতে পারে বলেও তারা মনে করেন।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে সাবেক কর্মকর্তা শামসুল আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে। সমালোচকদের দাবি, তিনি বিএনপির নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণ কমিটির সদস্য ছিলেন এবং অতীতে নির্বাচন-সংক্রান্ত তথ্য ফাঁসের অভিযোগে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। যদিও সরকার তার দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার বিষয়টি সামনে আনছে, বিরোধীরা বলছে, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকা ব্যক্তির নিয়োগ কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করবে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি প্রশাসনেও বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস শুরু করেছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে ১৭৯ কর্মকর্তার পদোন্নতি, ৩২ জন যুগ্ম সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসর, একাধিক সচিব পরিবর্তনের প্রস্তুতি, নতুন সচিব নিয়োগ এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সংখ্যা বৃদ্ধি। সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যেসব কর্মকর্তা অতীত সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের সরিয়ে প্রশাসনকে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। তবে প্রশাসনের ভেতরের অনেক কর্মকর্তা বলছেন, বাস্তবে জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার চেয়ে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাই এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
একই ধরনের বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও। সরকার এখন পর্যন্ত প্রায় ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রায় সবাই বিএনপি-সমর্থিত শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁদের অনেকেই ইউট্যাব, জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম কিংবা সাদা দলের নেতৃত্বে ছিলেন। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্চ কমিটির সুপারিশ ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং কিছু স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী সিনেট প্যানেলের বিধানও অনুসরণ করা হয়নি। "বিশেষ পরিস্থিতি" দেখিয়ে নিয়ম শিথিল করার অভিযোগও রয়েছে।
শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে রাজনৈতিক পরিচয় যদি প্রধান বিবেচ্য হয়ে ওঠে, তাহলে গবেষণা, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এই ইস্যুতে শুধু বিরোধী রাজনৈতিক দলই নয়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও প্রকাশ্যে আপত্তি জানিয়েছে। দলটির অভিযোগ, দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ উচ্চশিক্ষাকে আরও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অতীতের সঙ্গে এর তুলনা। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো দীর্ঘদিন ধরে করা হয়েছে—দলীয় উপাচার্য নিয়োগ, নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনে দলীয় পদোন্নতি এবং রাষ্ট্রীয় করপোরেশনে দলীয় চেয়ারম্যান নিয়োগ—বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেও প্রায় একই ধরনের অভিযোগ উঠছে। ফলে অনেকের প্রশ্ন, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কি বাস্তবায়িত হচ্ছে, নাকি শুধু ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তিত হয়েছে?
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজেদের ঘোষিত সংস্কার এজেন্ডার প্রতি আস্থা বজায় রাখা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন, উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, সার্চ কমিটির সুপারিশকে বাধ্যতামূলক করা, রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে যোগ্যতাকে প্রধান মানদণ্ডে পরিণত করা এবং নির্বাচন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা—এসব পদক্ষেপই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে ৫ আগস্টের পরিবর্তন কেবল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিতেও বাস্তব পরিবর্তনের সূচনা।
ছয় মাসের অভিজ্ঞতা বলছে, বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি কোনো রাজনৈতিক দলের সম্প্রসারিত কাঠামো হিসেবে পরিচালিত হবে, নাকি সংবিধান ও জনগণের প্রতি সমানভাবে দায়বদ্ধ, পেশাদার ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে? এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তন ইতিহাসে কীভাবে মূল্যায়িত হবে।
Author