
সাড়ে ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল বিএনপি। এই দীর্ঘ সময়ে দলটির নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো, সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়া থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের বহু নেতাকর্মী মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েছেন।
এই বাস্তবতার মধ্যেই প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বিএনপি। আর সেই সরকারের নেতৃত্বে বসেন তারেক রহমান।
এটি নিছক একটি সরকার পরিবর্তন ছিল না। দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকা একটি রাজনৈতিক দলের সামনে একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, প্রশাসনিক সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের কঠিন দায়িত্ব এসে পড়ে।
তার ওপর উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া অর্থনীতি ছিল দুর্বল। উচ্চ সরকারি ঋণ, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের সংকট, বিনিয়োগের স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের ঘাটতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ—সব মিলিয়ে নতুন সরকারের জন্য পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন।
তারেক রহমান দেশে ফিরে বলেছিলেন, দেশ নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু একটি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা দলের জন্য ছয় মাসে সেই পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়—এটি বাস্তবতা।
তবে ছয় মাস একেবারে মূল্যহীন সময়ও নয়। বিশেষ করে একটি সরকারের ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই সময়ের মধ্যে তার দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হওয়ার কথা।
সেখানেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—তারেক রহমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে কী দেখা গেল?
সরকারের প্রথম অগ্রাধিকারই এখন বড় পরীক্ষা
১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল—
১. দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ
২. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি
৩. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা
১৮০ দিন পর এসে দেখা যাচ্ছে, সরকারের সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে এই তিন ক্ষেত্রেই।
দ্রব্যমূল্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ রয়েছে। আর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনীতিকে আঘাত করছে।
অর্থাৎ সরকারের ঘোষিত তিন অগ্রাধিকারের তিনটিই এখন সরকারের জন্য রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
বিদ্যুতে ডুবছে তারেকের স্বপ্ন
তারেক রহমান সরকারের ছয় মাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। মধ্যরাতের পরও অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।
এর প্রভাব পড়ছে শুধু সাধারণ মানুষের জীবনে নয়; ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষি, শিক্ষা এবং উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
বিদ্যুতের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ। বিশেষ করে জুন মাসের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে অনেক গ্রাহক স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি বিল পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
এ ধরনের ঘটনা মানুষের মধ্যে শুধু আর্থিক চাপ তৈরি করে না, সরকারের ওপর আস্থার সংকটও তৈরি করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যুতের মূল্য কী প্রক্রিয়ায় বাড়ানো হয়েছে, সেটি অনেক গ্রাহকের কাছে পরিষ্কার নয়। তাঁর মতে, ছয় মাসের মধ্যে অন্তত বিদ্যুৎ খাতকে স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসার উদ্যোগ দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন ছিল।
প্রশ্ন হলো—যে সরকার প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল, ছয় মাস পর কেন সেই খাতই সরকারের অন্যতম বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়াল?
বিদ্যুতের পর জ্বালানি সংকট
বিদ্যুৎ সংকটের চেয়েও বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে জ্বালানি খাতে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সংকট, বিশেষ করে ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাব জ্বালানি বাজারে পড়েছে। এর ফলে বাংলাদেশও জ্বালানি সরবরাহের চাপের মধ্যে পড়ে।
এরপর দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি পর্যন্ত গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ে।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ—দুটি খাতই অর্থনীতির মৌলিক অবকাঠামোর অংশ। তাই এ দুটি খাতে দীর্ঘস্থায়ী সংকট শুধু নাগরিক দুর্ভোগ তৈরি করে না; এটি উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকেও বাধাগ্রস্ত করে।
অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুনের বক্তব্যের সারকথা হলো—গ্যাস ও বিদ্যুৎ ছাড়া জীবন ও অর্থনীতি কার্যত অচল। ফলে এই খাতকে সরকারের পরবর্তী পর্যায়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে।
সংকট যখন রাজপথে
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের রাজনৈতিক প্রভাবও দেখা যাচ্ছে। আগস্টের শুরুতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে কর্মসূচি পালন করেছে। সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিও এসেছে।
এটি বিএনপি সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত। কারণ, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়, তখন তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধা ছিল জনগণের পরিবর্তনের প্রত্যাশা।
কিন্তু সেই প্রত্যাশার জায়গায় যদি বিদ্যুৎ, গ্যাস, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলার মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়, তাহলে সরকারকে দ্রুত রাজনৈতিকভাবে তার প্রতিক্রিয়া সামাল দিতে হবে।
প্রশাসনে অভিজ্ঞতার সংকট
বিএনপি সরকারের আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে প্রশাসনিক কাঠামো। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময়ে প্রশাসনে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাবের অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের। বিএনপি ও জাতীয়তাবাদী ঘরানার বহু কর্মকর্তা-কর্মচারীও নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বিভিন্নভাবে বঞ্চিত হয়েছেন—এমন অভিযোগ বিএনপির পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন করা হয়েছে।
এখন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে—দীর্ঘদিন প্রশাসনের বাইরে থাকা রাজনৈতিক নেতৃত্ব কতটা দ্রুত প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করতে পারছে?
একজন সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় উঠে এসেছে, ৫ আগস্টের আগে যারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের একটি অংশ রাতারাতি বিএনপিপন্থী হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
এই অভিযোগ সত্য হলে এটি শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার প্রশ্ন নয়; রাষ্ট্রের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার জন্যও বড় ঝুঁকি। কারণ, দল পরিবর্তন করে প্রশাসনিক আনুগত্য পরিবর্তন হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কখনোই নিরপেক্ষ হতে পারে না।
বিএনপির সামনে তাই একটি মৌলিক পরীক্ষা হলো—তারা কি আওয়ামী লীগের আমলের দলীয়করণের পুনরাবৃত্তি করবে, নাকি একটি পেশাদার, নিরপেক্ষ ও দক্ষ প্রশাসন তৈরি করবে?
অর্থনীতি: উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সংকট
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী অবস্থায় ছিল না। উচ্চ সরকারি ঋণ, মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগ সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং কর্মসংস্থানের ধীরগতি—সবকিছু মিলিয়ে অর্থনীতি ছিল চাপের মধ্যে।
এই পরিস্থিতির বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলের উত্তরাধিকার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও অর্থনৈতিক খাতে কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছিল।
কিন্তু নতুন সরকারের সামনে প্রশ্ন হলো—এই উত্তরাধিকার থেকে বের হয়ে আসার নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে?
ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ সামাজিক নিরাপত্তার কিছু উদ্যোগ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর কিছু উদ্যোগও প্রশংসিত হয়েছে।
সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি না নেওয়া কিংবা সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—বিনিয়োগ কোথায়? কর্মসংস্থান কোথায়? শিল্প উৎপাদন কীভাবে বাড়বে?
বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার বাস্তব ফলাফল এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়।
মূল্যস্ফীতি: সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় চাপ
গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা মূল্যস্ফীতি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই দ্রুত স্বস্তি প্রত্যাশা করে। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ব্যবস্থা, মুদ্রানীতি ও আমদানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমানো কঠিন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। উৎপাদন, সরবরাহ, প্রতিযোগিতা ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন।
এখানে বিএনপি সরকারের সামনে ছয় মাসের সাফল্যের চেয়ে বরং পরবর্তী এক বছরের কর্মপরিকল্পনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আইনশৃঙ্খলা: সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ছিল। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও সেই উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গণপিটুনি, রাজনৈতিক সংঘাত, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, কারাগারে মৃত্যু, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নারী নির্যাতনের মতো ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্যেও রাজনৈতিক সহিংসতা ও নারী নির্যাতনের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
এসব পরিসংখ্যানের প্রতিটি ঘটনার দায় সরাসরি বর্তমান সরকারের ওপর চাপানো অবশ্যই সঠিক হবে না। কারণ, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যা।
তবে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা থাকে—আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হবে এবং রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর হবে। সেই জায়গায় এখনো দৃশ্যমান পরিবর্তন প্রয়োজন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, খুন, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন কিংবা ধর্ষণের মতো অপরাধ কমাতে পুলিশের সক্ষমতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
কূটনীতিতে কিছু সাফল্য
অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়ে সরকারের সমালোচনা থাকলেও কূটনীতির ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক অর্জন রয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়াকে সরকার বড় কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখছে।
এ ছাড়া ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়া ও চীন।
চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা জানিয়েছে সরকার। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিস্তা প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত সম্ভাব্য অর্থনৈতিক করিডর নিয়েও আলোচনা হয়েছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সরকারের সক্রিয়তা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি ভারসাম্য তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
ভারত: অসমাপ্ত অধ্যায়
তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও পুরোপুরি কাটেনি।
ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সফরের আমন্ত্রণ জানানো হলেও ঢাকা জানিয়েছে, সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে আছে।
বাংলাদেশের জন্য ভারতকে বাদ দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
তাই নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হবে—ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা।
রাজনীতি, সংস্কার ও জুলাই সনদ
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের দাবি জোরালো হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন কমিশন গঠন করে। পরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে জুলাই সনদ তৈরি হয় এবং এ বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
কিন্তু গণভোটের ফলাফল ও সংস্কার বাস্তবায়নের প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি করেছে।
স্বাধীন বিচার বিভাগ, পুলিশ সংস্কার, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা—এসব প্রশ্নে জনগণের প্রত্যাশা ছিল ব্যাপক।
ছয় মাসে সব সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। কিন্তু কোন সংস্কার কীভাবে, কত সময়ের মধ্যে এবং কোন প্রক্রিয়ায় হবে—তার একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ জনগণের সামনে থাকা প্রয়োজন।
এখানেই সরকারের বড় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
তারেক রহমানের জন্য আসল পরীক্ষা এখন
তারেক রহমান সরকারের প্রথম ছয় মাসকে এককথায় ব্যর্থ বা সফল বলা সম্ভব নয়। একদিকে বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলা ও সংস্কার নিয়ে সরকারের সামনে বড় প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের মতো কিছু পদক্ষেপ ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
কিন্তু একটি সরকারের সাফল্য নির্ধারিত হয় তার ঘোষণায় নয়, মানুষের জীবনে তার প্রভাব দিয়ে।
তারেক রহমান সরকারের সামনে তাই এখন পাঁচটি জরুরি কাজ—
প্রথমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে স্থিতিশীল করা।
দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটানো।
চতুর্থত, প্রশাসনকে দলীয়করণের বাইরে রেখে দক্ষ ও নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি করা।
পঞ্চমত, জুলাই সনদসহ রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দেওয়া।
তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—তিনি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। কিন্তু এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও।
কারণ জনগণ শুধু সরকার পরিবর্তন চায়নি; তারা রাষ্ট্রের চরিত্রের পরিবর্তন চেয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনের পর বিএনপি যদি একই ধরনের দলীয়করণ, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতিতে ফিরে যায়, তাহলে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি অর্থহীন হয়ে পড়বে।
আর যদি বিএনপি একটি নিরপেক্ষ প্রশাসন, কার্যকর বিচারব্যবস্থা, নিরাপদ জনজীবন, নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি, স্থিতিশীল বিদ্যুৎ-জ্বালানি ব্যবস্থা এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে ছয় মাসের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে সরকার তার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভিত্তি শক্ত করতে পারবে।
ছয় মাস কোনো সরকারের চূড়ান্ত পরীক্ষার সময় নয়। কিন্তু ছয় মাসেই বোঝা যায়—সরকার কোন পথে হাঁটছে।
তারেক রহমান সরকারের সেই পথ এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—বিদ্যুৎ, জ্বালানি, অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলার সংকট সমাধান করতে না পারলে তারেক রহমানের যে পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, সেই স্বপ্নই ধীরে ধীরে অন্ধকারে ডুবে যেতে পারে।

Author