
কদিন ধরে টানা বৃষ্টি। এর মধ্যেই সোমবার এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। পানি ডিঙিয়ে যেতে হয়েছে পরীক্ষার হলে।
এ ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষত শিক্ষামন্ত্রীর সমালোচনা শুরু হয়। ঘটনাপ্রবাহে বাড়তি মাত্রা যোগ করে পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নের জটিলতা।
মঙ্গলবার দিনটি নাটকীয়ভাবে সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। এদিন সকাল থেকেই ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করে। তারা শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবি জানাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদল নেতারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
আকস্মিকভাবে সরকারের জন্য কিছুটা হলেও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সরকার এখন পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয়, সেটাই দেখার বিষয়। মন্ত্রী কি পদত্যাগ করবেন? আন্দোলন কি চলবে? শিক্ষার্থীরা কি পরীক্ষার হলে ফিরবে?
ভালো দিক হচ্ছে, কোথাও পুলিশ কিংবা সরকারি দল শক্তিপ্রয়োগ করেনি। মমতা দিয়েই শিক্ষার্থীদের হলে ফেরাতে হবে। সামনে অন্য কোনো পথ নেই।
মঙ্গলবার যা ঘটছে
মঙ্গলবার সকালে এই আন্দোলন শুধুমাত্র সাইন্সল্যাব কেন্দ্রীক থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে তা বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল, বগুড়া, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, মিছিল, সমাবেশ এবং শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও কর্মসূচি পালন করছে শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবি, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তের দায় স্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন পদত্যাগ করবেন। পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল ও অস্বাভাবিক কঠিন প্রশ্নের অভিযোগ তুলে পুনর্মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানানো হয়।
গত সোমবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বৃষ্টিতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। অনেক এলাকায় সড়ক ডুবে যাওয়ায় পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেকেই সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি, কেউ কেউ রাস্তায় পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন, আবার কারও অ্যাডমিট কার্ড বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় না এনে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে "অমানবিক" বলে আখ্যা দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
তাদের অভিযোগ, শুধু আবহাওয়াজনিত দুর্ভোগই নয়, পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রেও একাধিক ভুল ছিল। শিক্ষার্থীদের দাবি, আটটি প্রশ্নের মধ্যে দুটি প্রশ্নে স্পষ্ট ত্রুটি রয়েছে এবং বাকি প্রশ্নগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার মানের মতো কঠিন ছিল, যা এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য অস্বাভাবিক।
রাজধানীতে আন্দোলনের সূচনা হয় সকাল থেকেই। বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব মোড়ে অবস্থান নিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করেন। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত মিরপুর সড়কে যান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
আন্দোলনে অংশ নেয় ঢাকা সিটি কলেজ, ঢাকা আইডিয়াল কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, লালমাটিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বিএফ শাহীন কলেজসহ প্রায় ১২ থেকে ১৫টি কলেজের শিক্ষার্থীরা।
অবরোধ শেষে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পরে তারা নীলক্ষেত ও পলাশী মোড় হয়ে বকশীবাজারে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন।
বেলা পৌনে তিনটার দিকে শত শত শিক্ষার্থী ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে জড়ো হন। সেখানে তারা ’ভুয়া, ভুয়া, দফা এক, দাবি এক—শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম‘সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।
একপর্যায়ে উত্তেজিত কিছু শিক্ষার্থী শিক্ষা বোর্ডের গেট লক্ষ্য করে ইট নিক্ষেপ করেন এবং গেটে ধাক্কাধাক্কি করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বোর্ডের সামনে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। তবে বড় ধরনের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি।
রাজধানীর উত্তরায় বিএনএস সেন্টারের সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সকাল থেকেই অবরোধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। এতে মহাসড়কে যান চলাচল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে এবং কয়েক কিলোমিটার এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়।
বরিশালে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে শিক্ষা বোর্ডের সামনে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করেন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। এতে মহাসড়কের দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে এবং যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন।
ময়মনসিংহ নগরের টাউন হল এলাকায় শিক্ষার্থীরা ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ব্যারিকেড দিয়ে অবস্থান নেন। এর ফলে ওই সড়কেও যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
কুমিল্লা নগরের কান্দিরপাড়ে ‘কুমিল্লার সচেতন শিক্ষার্থী সমাজ‘ এর ব্যানারে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড প্রাঙ্গণে গিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
বগুড়ায় সাতমাথা থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। সমাবেশে তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং শিক্ষাসচিবের অপসারণ দাবি করেন। একই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন।
বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাত বলেন, পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে দুটি প্রশ্ন ভুল ছিল এবং বাকি প্রশ্নগুলো ছিল অত্যন্ত কঠিন। তার ভাষায়, আমি যদি এই পরীক্ষায় ফেল করি, তার দায় কি শিক্ষামন্ত্রী নেবেন?
ঢাকা আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী আহনাফ মুনজি বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে বহু শিক্ষার্থী সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেনি। অনেকের অ্যাডমিট কার্ড নষ্ট হয়েছে, কেউ রাস্তায় পড়ে আহত হয়েছে। তিনি বলেন, যিনি শিক্ষার্থীদের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করতে পারেন না, আমরা এমন শিক্ষামন্ত্রী চাই না।
পুলিশ জানিয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা মূলত শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করেছেন। কোথাও কোথাও সড়ক অবরোধের কারণে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটলেও পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়েছে।
রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার রব্বানী হোসেন জানান, সায়েন্স ল্যাব এলাকায় শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি শেষে সড়ক ছেড়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। অন্যদিকে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আসাদুজ্জামান শাকিল বলেন, শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা মূলত তিনটি দাবিতে আন্দোলন করছেন—
বৈরী আবহাওয়ায় পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তের দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। পদার্থবিজ্ঞান প্রশ্নপত্রে ভুল এবং অতিরিক্ত কঠিন প্রশ্নের তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের জন্য ন্যায়সঙ্গত সমাধান নিশ্চিত করা।
দেশজুড়ে চলমান এই আন্দোলনের ফলে শিক্ষা প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছে। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা আন্তঃশিক্ষা বোর্ড থেকে শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তবে বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে এবং দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর আন্দোলনের ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা।
Author