
জ্বালাটা আসলে কার? এই প্রশ্নটি এখন শুধু কোনো একটি সংবাদপত্রের নয়, কোনো একজন সাংবাদিকেরও নয়। প্রশ্নটি এ দেশের সাধারণ নাগরিকের। সেই নাগরিকের, যিনি সংবিধানকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে মানেন। সেই নাগরিকের, যিনি ভোট দিয়ে সরকার নির্বাচিত করেন। সেই নাগরিকের, যাঁর করের টাকায় রাষ্ট্র পরিচালিত হয় এবং যাঁর দেওয়া ম্যান্ডেট নিয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসেন।
অতএব, কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে তাঁর নাগরিকত্ব, সাংবিধানিক যোগ্যতা কিংবা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সেটিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির স্বাভাবিক অংশ।
সম্প্রতি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেছেন। প্রশ্নের জবাবে তিনি সরাসরি নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি পরিষ্কার না করে বলেছেন, তিনি বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশি হিসেবেই কাজ করছেন। একই সঙ্গে সংবাদ প্রকাশের প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—“কার এত জ্বালা?”
এখানেই আসল প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জ্বালা কার—সাংবাদিকের, সংবাদপত্রের, নাকি নাগরিকের?
কোনো ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকেন, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি বিষয় সংবাদযোগ্য—এমন কথা কেউ বলছে না। কিন্তু তাঁর নাগরিকত্ব যদি সংবিধান নির্ধারিত সরকারি পদে থাকার যোগ্যতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে জনস্বার্থের বিষয়।
সাংবাদিকের কাজ হলো প্রশ্ন করা।
সংবাদপত্রের কাজ হলো তথ্য যাচাই করা, অস্পষ্টতা তুলে ধরা এবং জনস্বার্থের বিষয় জনগণের সামনে আনা। সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তির কাজ হলো সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া।
এই তিনটি ভূমিকা যদি আমরা গুলিয়ে ফেলি, তাহলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির কাঠামোটিই দুর্বল হয়ে যায়।
হুমায়ুন কবিরকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—তিনি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছিলেন কি না। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য বিএনপির একাধিক নেতা তাঁকে ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে চেনেন, কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, তা তাঁরা নিশ্চিত করতে পারেননি। একই প্রতিবেদনে সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করার তথ্যও তাদের কাছে নেই।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ সরকারি কোম্পানি নিবন্ধনের তথ্য নিয়েও সংবাদ প্রকাশ হয়েছে, যেখানে তাঁকে একটি ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক হিসেবে পাওয়া যায় এবং যুক্তরাজ্যে তাঁর আবাসিক তথ্যের উল্লেখ রয়েছে। এগুলো প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ হতে পারে। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির।
সাংবাদিক প্রশ্ন করলে সাংবাদিকের ওপর রাগ করার চেয়ে সহজ পথ হলো নথি দেখানো।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৬ ও ৬৬ অনুচ্ছেদ এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের নিয়োগ রাষ্ট্রপতি দেন। টেকনোক্র্যাট কোটাতেও এমন ব্যক্তিকে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, যিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য। আর সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতার বিষয়টি নির্ধারণে ৬৬ অনুচ্ছেদ গুরুত্বপূর্ণ।
৬৬ অনুচ্ছেদে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন বা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের বিষয়টি নিয়ে সাংবিধানিক অযোগ্যতার বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে আগে বিদেশি নাগরিকত্ব থাকলেও তা ত্যাগ করলে যোগ্যতার প্রশ্নে ভিন্ন অবস্থান তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ এখানে বিষয়টি হুমায়ুন কবির বাংলাদেশি কি না—সেটি নয়। তিনি বাংলাদেশি—এ নিয়ে বিতর্ক করার প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন হলো, তিনি একই সঙ্গে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিক কি না এবং যদি হয়ে থাকেন, তাহলে সাংবিধানিক যোগ্যতার শর্ত পূরণ করে কীভাবে তিনি রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগ পেলেন? এই প্রশ্নের উত্তর দেশবাসী পাওয়ার অধিকার রাখে।
কোনো নাগরিকের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা এক বিষয়, আর তাঁর সাংবিধানিক যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কেউ ব্রিটেনে বসবাস করেছেন, ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন কিংবা বিদেশে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন—এসব নিজে কোনো অপরাধ নয়।
বিদেশে বসবাস করা অপরাধ নয়। বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জন করাও সব পরিস্থিতিতে অপরাধ নয়। কিন্তু সংবিধান যদি রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট পদে থাকার ক্ষেত্রে কোনো যোগ্যতা বা অযোগ্যতার শর্ত নির্ধারণ করে, তাহলে সেই শর্ত মানা বাধ্যতামূলক।
সুতরাং “আমি বাংলাদেশি”—এই বক্তব্য নাগরিকত্বের একটি দিকের উত্তর হতে পারে; কিন্তু “আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছি কি না”—এটি একটি আলাদা এবং নির্দিষ্ট প্রশ্ন। এই দুটি প্রশ্নকে এক করে দেখলে মূল সাংবিধানিক বিষয়টি আড়াল হয়ে যায়।
হুমায়ুন কবির যখন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “কার এত জ্বালা?”, তখন স্বাভাবিকভাবেই পাল্টা প্রশ্ন আসে—কার জ্বালা হওয়ার কথা? যদি সংবাদটি ভুল হয়, তাহলে সংশোধনের সবচেয়ে শক্তিশালী পথ হলো তথ্য-প্রমাণ দেওয়া। যদি নাগরিকত্ব ত্যাগ করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই তথ্য প্রকাশ করলেই তো প্রশ্নের অবসান ঘটে।
যদি আনুষ্ঠানিকভাবে নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট নথি বা প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি পরিষ্কার করা সম্ভব। তাহলে সংবাদমাধ্যমকে আক্রমণ করার প্রয়োজন কোথায়? বরং প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার ফলে সন্দেহ আরও বাড়ে।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি হওয়া উচিত—যে প্রশ্নের উত্তর নথি দিয়ে দেওয়া যায়, সেটির উত্তর বক্তব্য দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।
এই বিতর্ককে কেবল একজন প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখলেও ভুল হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে সংসদ নির্বাচন, মনোনয়ন এবং রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও বিদেশি নাগরিকত্বের কারণে প্রার্থিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্বের কারণে শাম্মী আহমেদের মনোনয়ন বাতিল এবং আরেক প্রার্থী শামীম হকের নেদারল্যান্ডসের নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ এটি কোনো দল বা ব্যক্তিকে টার্গেট করার বিষয় নয়। এটি একটি সাংবিধানিক মানদণ্ডের প্রশ্ন। আজ যদি বিএনপির একজন মন্ত্রীর ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন ওঠে, বিএনপির উচিত হবে প্রশ্নটিকে দলীয় আক্রমণ হিসেবে না দেখে স্বচ্ছতার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা।
কারণ গত এক যুগে বিএনপি যে বিষয়গুলো নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করেছে, ক্ষমতায় এসে সেই একই মানদণ্ড নিজেদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে হবে। ক্ষমতার পরিবর্তন হলে জবাবদিহির সংজ্ঞা বদলে যেতে পারে না।
গণমাধ্যমকে ভয় দেখিয়ে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না।গণমাধ্যম সরকারের প্রতিপক্ষ নয়। গণমাধ্যম রাষ্ট্রেরও শত্রু নয়। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করা। যে সরকার প্রশ্ন সহ্য করতে পারে না, সে সরকার যতই জনপ্রিয় হোক, তার গণতান্ত্রিক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবে।
আর যে মন্ত্রী একটি কঠিন প্রশ্নের জবাব তথ্য দিয়ে দিতে পারেন, তিনি যদি তার বদলে সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আরও প্রশ্ন তৈরি হয়। এখানে সংবাদপত্রেরও দায়িত্ব আছে। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই করতে হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নিতে হবে এবং অভিযোগ ও প্রমাণের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখতে হবে। কিন্তু সংবাদপত্রের এই দায়িত্বের অর্থ কখনোই এই নয় যে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকবেন।
একজন সাধারণ মানুষ যদি প্রশ্ন করেন—“আমার দেশের একজন প্রতিমন্ত্রী কি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিক?”—তাহলে সেই প্রশ্নকে অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। কারণ ওই মানুষটির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নেই। তাঁর হাতে মন্ত্রণালয় নেই। তাঁর হাতে প্রশাসন নেই। তাঁর হাতে সরকারি পাসপোর্ট নেই। তাঁর হাতে রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার দায়িত্বও নেই। কিন্তু তাঁর হাতে একটি ভোট আছে। আর সেই ভোটের মাধ্যমেই তিনি সরকারকে ক্ষমতায় বসান। তাই নাগরিকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ক্ষমতাসীনদের দায়িত্ব।
একজন সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত নাগরিকত্ব নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে সেটি হয়তো তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু একজন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নাগরিকত্বের প্রশ্ন ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। কারণ তিনি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন।
তাঁর প্রতি রাষ্ট্রের আস্থা শুধু রাজনৈতিক আস্থার বিষয় নয়; এর সঙ্গে সাংবিধানিক যোগ্যতাও যুক্ত। এ কারণেই নাগরিকত্বের প্রশ্নটি পরিষ্কার হওয়া জরুরি। এখানে কারও দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট চাওয়া হচ্ছে না। চাওয়া হচ্ছে সাংবিধানিক স্বচ্ছতা।
হুমায়ুন কবিরের জন্য এই বিতর্ক শেষ করার পথ খুবই সহজ। তিনি যদি দায়িত্ব নেওয়ার আগে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকেন, তাহলে সেটি স্পষ্টভাবে জানানো হোক। কবে ত্যাগ করেছেন—জানানো হোক। কোন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ত্যাগ করেছেন—জানানো হোক। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করা হোক। তাহলেই প্রশ্ন শেষ।
আর যদি নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও জনগণকে জানাতে হবে। কারণ বিষয়টি তখন আর কোনো সংবাদপত্রের “জ্বালা” নয়; এটি সাংবিধানিক যোগ্যতার প্রশ্ন।
গণতন্ত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তখনই তৈরি হয়, যখন ক্ষমতাবানরা নাগরিকের প্রশ্নকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। প্রশ্ন করা মানে শত্রুতা নয়। সমালোচনা করা মানে দেশবিরোধিতা নয়। সংবাদ প্রকাশ করা মানে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নয়।
জ্বালাটা সেই নাগরিকের, যিনি চান—রাষ্ট্রের প্রতিটি পদে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও সাংবিধানিক বিধান সমানভাবে কার্যকর হোক। আর সেই নাগরিকের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। কারণ ক্ষমতার চেয়ার জনগণ দিয়েছে। কিন্তু চেয়ারটি সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়।
Author