যে জুলাইয়ের আন্দোলনে পালিয়েছিল শেখ হাসিনা, সেই জুলাইয়ের নেতারাই আজ হামলার শিকার

ছেলেটির রক্তাক্ত মুখের দিকে তাকানো যায় না। চোখের পাশ বেয়ে ঝরছে রক্ত। যে মুখ একদিন ছিল আন্দোলনের প্রতীক, আজ সেই মুখই রাজনৈতিক সহিংসতার নির্মম সাক্ষী। ইতিহাস যেন নিষ্ঠুর এক বৃত্তে ফিরে এসেছে। যে জুলাই একদল তরুণকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছিল, সেই জুলাইয়ের আরেক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আজ তারাই হামলার শিকার।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী দলগুলোর জন্য রাজপথ ছিল কঠিন। শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলো বারবার আন্দোলনের ডাক দিলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার পতনের মতো কোনো গণআন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। একের পর এক নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু ক্ষমতার পালাবদল হয়নি।
পরিবর্তনের সূচনা ঘটে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর নেতৃত্বে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন দ্রুত রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে। আন্দোলনের সমন্বয়কদের আটক করা হয়, নানা চাপ আসে, কিন্তু তারা পিছু হটেননি। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট (আন্দোলনকারীদের ভাষায় ‘৩৬ জুলাই’) গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যান। সেই আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীদের মতো তরুণ নেতারা।
দেড় বছর পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। আর এক সময়ের আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বসে বিরোধী রাজনীতির আসনে।
কিন্তু ইতিহাস যেন আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্তি করল
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) হবিগঞ্জে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি শেষে দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহরে হামলার ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—ক্ষমতা বদলেছে, নাকি শুধু পতাকা বদলেছে?
সমাবেশ শেষে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সারজিস আলমের গাড়িবহরে স্থানীয় ছাত্রদল ও বিএনপির নেতা-কর্মীরা হামলা চালান। ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়, ধাওয়া দেওয়া হয় এবং সারজিস আলমকে শহরের একটি ব্যাংক ভবনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হতে হয়। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়।
এনসিপির অভিযোগ, পুলিশের উপস্থিতিতেই হামলাকারীরা তাদের মিডিয়া টিমের গাড়িতে ভাঙচুর চালায় এবং সাংবাদিকদের ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। হামলায় দলের একাধিক নেতা-কর্মী আহত হন। সারজিস আলম দাবি করেছেন, আহত কর্মী আলিফের একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেছে।
অন্যদিকে হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এনসিপির নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
যে কারণই থাকুক, রক্তাক্ত হয়েছে আবারও রাজপথ
সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রশ্ন হলো—যে তরুণেরা একসময় রাজনৈতিক সহিংসতার অবসান, গণতন্ত্র ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তারাই যদি আজ রাজনৈতিক হামলার শিকার হন, তাহলে পরিবর্তনের অর্থ কী?
বাংলাদেশের মানুষ ভেবেছিল, ৫ আগস্টের পর অন্তত রাজনীতির ভাষা বদলাবে। প্রতিপক্ষকে দমন নয়, সহাবস্থান হবে নতুন রাজনীতির ভিত্তি। কিন্তু হবিগঞ্জের ঘটনা সেই আশায় বড় ধরনের আঘাত দিয়েছে।
জুলাই শুধু একটি মাস নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি প্রতীক। সেই জুলাইয়ের নেতারাই যদি আরেক জুলাইয়ে রক্তাক্ত হন, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—আমরা কি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগোচ্ছি, নাকি পুরোনো সহিংসতার চক্রেই আবার ফিরে যাচ্ছি?
হবিগঞ্জের ঘটনাটি শুধু একটি দলের ওপর হামলা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। কারণ ইতিহাস বারবার বলে—রাজনৈতিক সহিংসতা কখনো এক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আজ যার ওপর হামলা হচ্ছে, কাল সেই একই বাস্তবতা অন্য কারও দরজায় কড়া নাড়তে পারে।
Author