
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগকে শুধু একটি কোটা আন্দোলনের পরিণতি হিসেবে দেখলে ঘটনাটির পূর্ণ চিত্র ধরা পড়ে না। এটি ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচনী বৈধতা নিয়ে বিতর্ক, অর্থনৈতিক চাপ, তরুণদের হতাশা, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন এবং শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে অবস্থানের পরিবর্তনের সম্মিলিত ফল।
জুলাই-আগস্টের মাত্র ৩৬ দিনের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। শুরুতে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলন ধীরে ধীরে সরকারের জবাবদিহি, প্রাণহানির বিচার এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের পদত্যাগের দাবিতে রূপ নেয়। আন্দোলন যত বিস্তৃত হয়, রাষ্ট্রের কঠোর পদক্ষেপও তত বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে সরকার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন।
রাজনৈতিক সংকটের পটভূমি
২০২৪ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল তীব্রভাবে মেরুকৃত। ৭ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি। তাদের দাবি ছিল, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। সরকার সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচন সম্পন্ন করে এবং আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থবার ক্ষমতায় আসে।

নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রশ্ন ওঠে। বিরোধী দলের বর্জন এবং ভোটার উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক সরকারের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে দুর্বল করে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, কর্মসংস্থানের সংকট এবং শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা সামাজিক অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে।
এই পটভূমিতেই সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা নতুন করে আলোচনায় আসে।
কোটা আন্দোলনের সূচনা
২০২৪ সালের জুনে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। তাদের দাবি ছিল, সরকারি চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যমূলক কোটা সংস্কার করা।

শুরুতে আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ ও বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি এবং বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। তখনও আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল কেবল কোটা নীতির পরিবর্তন।
কিন্তু জুলাইয়ের মাঝামাঝি পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে।
১৪ জুলাই: আন্দোলনের মোড় পরিবর্তন
১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়। 'রাজাকার' শব্দের ব্যবহার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একাংশ অপমানজনক হিসেবে দেখেন। এর প্রতিবাদে 'তুমি কে, আমি কে—রাজাকার, রাজাকার' স্লোগান দ্রুত আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে।

এ ঘটনার পর আন্দোলন আর কেবল কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরও বিস্তৃত হয় এবং আন্দোলন নতুন রাজনৈতিক মাত্রা পেতে শুরু করে।
১৫–১৬ জুলাই: সহিংসতার সূচনা
১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষ হয়। পরদিন পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
১৬ জুলাই রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদের নিহত হওয়ার ঘটনা আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তাঁর মৃত্যুর ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সারা দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
এই ঘটনার পর আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায়। কোটা সংস্কারের দাবির পাশাপাশি নিহতদের বিচার, দমন-পীড়নের অবসান এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহির দাবি সামনে আসে। ছাত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও সংহতি প্রকাশ করতে শুরু করেন।
রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও আন্দোলনের বিস্তার
জুলাইয়ের দ্বিতীয়ার্ধে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন, ইন্টারনেট সেবা সীমিতকরণ, কারফিউ এবং ব্যাপক গ্রেপ্তারের মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
সরকারের ভাষ্য ছিল, সহিংসতা ও নাশকতা দমন করতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রতিবেদনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচার গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং মতপ্রকাশ ও সমাবেশের অধিকারে গুরুতর সীমাবদ্ধতার অভিযোগ তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে প্রাণহানির ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানানো হয়।
প্রতিটি প্রাণহানি আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থন আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে জেলা শহর, পেশাজীবী মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে।
আদালতের রায়েও থামেনি আন্দোলন
২১ জুলাই আপিল বিভাগ সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। অধিকাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এতে আন্দোলনের মূল দাবির একটি বড় অংশ বাস্তবায়িত হলেও পরিস্থিতি আর আগের অবস্থায় ফেরেনি।
ততদিনে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল নিহতদের বিচার, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার এবং দমন-পীড়নের দায় নির্ধারণ।
ফলে কোটা সংস্কারের আন্দোলন কার্যত সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
'এক দফা'র ঘোষণা
জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে আন্দোলনের নেতৃত্ব নতুন রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করতে শুরু করে। ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সরকার পদত্যাগের 'এক দফা' দাবি উত্থাপন করা হয়।
এটি ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কারণ এরপর আর আলোচনার বিষয় ছিল না কোটা; আন্দোলনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে সরকারের পদত্যাগ।

একই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং পেশাজীবী মহলের সমর্থন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করে। ফলে ছাত্রদের ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন দ্রুত একটি বৃহত্তর গণআন্দোলনের রূপ লাভ করে।
শেষ ৭২ ঘণ্টা:
সেনাবাহিনীর অবস্থান, ঢাকামুখী জনস্রোত এবং শেখ হাসিনার দেশত্যাগ
৩ আগস্ট থেকে ৫ আগস্ট—এই তিন দিনেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ বদলে যায়। এর আগেই আন্দোলন সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু এই সময়ের ঘটনাগুলো শেখ হাসিনা সরকারের সামনে ক্ষমতা ধরে রাখার বাস্তব সম্ভাবনাকে দ্রুত সংকুচিত করে।
৩ আগস্ট: 'এক দফা' এবং সেনাপ্রধানের বৈঠক
৩ আগস্ট আন্দোলনকারীরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সরকারের পদত্যাগের 'এক দফা' দাবি ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়ে আন্দোলনের লক্ষ্য আনুষ্ঠানিকভাবে কোটা সংস্কার থেকে সরকার পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয়।
একই দিন সেনাসদরের হেলমেট অডিটোরিয়ামে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বিভিন্ন পর্যায়ের সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে 'অফিসার্স অ্যাড্রেস' করেন। সেখানে তিনি দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, জনগণের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা এবং সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও একাধিক সূত্রের বর্ণনায় উঠে আসে, ওই সময় সেনাবাহিনীর ভেতরে বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের বিষয়ে অনীহা তৈরি হচ্ছিল। যদিও বৈঠকের বিস্তারিত আলোচনার সরকারি পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি, তবু ঘটনাপ্রবাহে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়।
৪ আগস্ট: সংঘর্ষে উত্তাল দেশ
৪ আগস্ট দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার নতুন করে কারফিউ জারি করে এবং রাজধানীসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

কিন্তু একই সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৫ আগস্ট 'লং মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচি ঘোষণা করে। এতে স্পষ্ট হয়ে যায়, আন্দোলন আর বিচ্ছিন্ন কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্ত কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল
৪ আগস্ট রাতে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই বৈঠকে বেসামরিক মানুষের ওপর গুলি চালিয়ে কারফিউ কার্যকর না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে এই অবস্থান সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েও জানিয়ে দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করে।

এই সিদ্ধান্ত ছিল সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোর একটি। কারণ যে কোনো রাজনৈতিক সংকটে সরকারের ক্ষমতা ধরে রাখার অন্যতম ভিত্তি হলো নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যকর সমর্থন। যখন সেনাবাহিনী আরও প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ থেকে সরে আসে, তখন সরকারের সামনে রাজনৈতিক বিকল্প দ্রুত সীমিত হয়ে পড়ে।
সরকারের অভ্যন্তরে অনিশ্চয়তা
আওয়ামী লীগের একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, ৩ ও ৪ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের পর সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ মহলে পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়।
পরিবারের নিরাপত্তা, সম্ভাব্য দেশত্যাগ এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরিবারের সদস্যদের বিদেশে পাঠানোর সময় ও পদ্ধতি সম্পর্কে প্রকাশ্যে স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত তথ্য সীমিত।
তবে এটুকু নিশ্চিত যে, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা। অন্যদিকে ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন।
৫ আগস্ট: ভেঙে পড়ে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ
৫ আগস্ট সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোতে জনসমাগম বাড়তে থাকে।
সরকারের সামনে তখন তিনটি বড় বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
আন্দোলনের ব্যাপকতা দ্রুত বাড়ছিল।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
সেনাবাহিনী বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে আরও প্রাণঘাতী ব্যবস্থা নিতে অনাগ্রহী ছিল।

এই বাস্তবতার মধ্যে শেখ হাসিনার সামনে ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হয়ে যায়।
দুপুরের দিকে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং দেশ ত্যাগ করেন।
কেন ভারত?
দেশ ছাড়ার পর শেখ হাসিনা সামরিক বিমানে ভারতের উত্তর প্রদেশের হিন্দন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান। সেখানে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের খবর ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
ভারতকে গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ ছিল।
প্রথমত, ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব ছিল।
দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল।
তৃতীয়ত, নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতিতে দ্রুত আশ্রয়ের জন্য ভারতই ছিল সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্প।
তবে তিনি রাজনৈতিক সফরে নয়, ক্ষমতা হারানোর পর নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতিতে ভারতে আশ্রয় নেন—ঘটনাপ্রবাহে এটিই প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা।
যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের চেষ্টা?
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের আগে যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ আশ্রয়ের সম্ভাবনা নিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা হয়েছিল—এমন দাবি আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র করেছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে বিষয়টি অনানুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধান করেছিলেন।
তবে এই দাবির পক্ষে প্রকাশ্য সরকারি নথি বা যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ নেই। পরবর্তীতে মার্কিন দূতাবাসও শেখ হাসিনার ভিসা বা সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। ফলে বিষয়টি নিশ্চিত তথ্য নয়; বরং বিভিন্ন সূত্রের দাবি হিসেবেই বিবেচিত হয়।
নতুন অধ্যায়ের সূচনা
৫ আগস্ট বিকেলে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানান।
পরদিন রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেন। ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণ করে।
এর মধ্য দিয়ে টানা দেড় দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের অবসান ঘটে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
পতনের ছয় কারণ, ভারতে দুই বছর এবং শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন
৫ আগস্ট ২০২৪-এর ঘটনাকে শুধু একটি ছাত্র আন্দোলনের সফলতা বা একটি সরকারের পতন হিসেবে ব্যাখ্যা করলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষের বিস্ফোরণ, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়।
পতনের ছয়টি প্রধান কারণ
১. রাজনৈতিক বৈধতার সংকট
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ছিল শেখ হাসিনা সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর বর্জনের কারণে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল না। আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও নির্বাচনকে ঘিরে দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
২. তরুণদের ক্ষোভ
চাকরির সীমিত সুযোগ, মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে অসন্তোষ তরুণদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই জমছিল। কোটা আন্দোলন সেই ক্ষোভকে সংগঠিত হওয়ার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে।
৩. রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অভিযোগ
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে প্রাণহানি, ব্যাপক গ্রেপ্তার, কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থন বাড়িয়ে দেয়। আন্দোলন দমনের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত উল্টো সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ আরও বিস্তৃত করে।
৪. আন্দোলনের রাজনৈতিক রূপান্তর
প্রথমে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আন্দোলনের লক্ষ্য বদলে যায়। নিহতদের বিচার, দমন-পীড়নের জবাবদিহি এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের পদত্যাগই আন্দোলনের মূল দাবিতে পরিণত হয়।
৫. বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন
যদিও আন্দোলনের সূচনা ছিল শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে, পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষ এতে যুক্ত হন। ফলে এটি একটি জাতীয় গণআন্দোলনের রূপ পায়।
৬. নিরাপত্তা কাঠামোর অবস্থানের পরিবর্তন
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতরের অবস্থান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সেনাবাহিনী বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে আরও প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারে অনাগ্রহী ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান সরকারের ক্ষমতা ধরে রাখার সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়।
৫ আগস্টের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর ৬ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
এরপর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে, দলের অনেক নেতা গ্রেপ্তার হন, কেউ আত্মগোপনে যান, আবার অনেকে দেশ ছেড়ে চলে যান। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা ও বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।
ভারতে দুই বছর
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারত যাওয়ার পর শেখ হাসিনা সেখানেই অবস্থান করছেন। ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে—এমন ঘোষণা না দিলেও তিনি ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ সময় তিনি সরাসরি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেননি। তবে সময়ে সময়ে অডিও বার্তা, বিবৃতি এবং বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন।
দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা
২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান, তিনি দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার বা হত্যার ঝুঁকিও থাকতে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান স্পষ্ট—তিনি দেশে ফিরলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
ফলে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও সেই প্রত্যাবর্তনের পথ এখনো রাজনৈতিক ও আইনি—উভয় দিক থেকেই জটিল।
ভারতের জন্যও কঠিন সমীকরণ
শেখ হাসিনার উপস্থিতি ভারতের জন্যও একটি সংবেদনশীল কূটনৈতিক বিষয়।
একদিকে তিনি ভারতের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ অংশীদার ছিলেন। অন্যদিকে ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখাও নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত ইতোমধ্যে জানিয়েছে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে যেকোনো আইনি অনুরোধ প্রযোজ্য আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে দিল্লি এটিও স্পষ্ট করেছে যে, শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল রাজনৈতিক কর্মসূচি ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়।
এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, ভারত একদিকে তাঁকে নিরাপত্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে অপ্রয়োজনীয় চাপের মুখে ফেলতে চায় না।
তিনি কি ফিরতে পারবেন?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।
তাঁর প্রত্যাবর্তন নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর—
তাঁর বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতি।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ।
ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে ফিরে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া শেখ হাসিনার জন্য সহজ হবে না। তবে তিনি নিজে একাধিকবার জানিয়েছেন, রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি সর্বাত্মক সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে পরিণত হয়। প্রাণহানি, দমন-পীড়ন, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং নিরাপত্তা কাঠামোর অবস্থানের পরিবর্তন—সব মিলিয়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পথ তৈরি হয়।
এরপর বাংলাদেশের রাজনীতি এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ গড়ে ওঠে এবং শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান শুরু করেন। দুই বছর পরও তিনি দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন, কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনের পথ এখনো আইনি, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
৫ আগস্ট শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দিন নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং গণআন্দোলনের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড়। ভবিষ্যতে শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে পারবেন কি না, আওয়ামী লীগ আবার রাজনৈতিক পরিসরে ফিরবে কি না, কিংবা ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক কোন পথে এগোবে—এসব প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু বছর ধরে গবেষণা, বিশ্লেষণ ও বিতর্কের বিষয় হয়ে থাকবে।
Author