
৫ আগস্ট সরকার পতনের মাত্র ১৩ দিন আগে, শীর্ষ ব্যবসায়ীদের মতবিনিময় সভায় বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান আন্দোলন দমনে জোরালো বক্তব্য দেন এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও সমর্থন প্রকাশ করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বেশি সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম ছিল বসুন্ধরা গ্রুপ।
বিএনপিবিরোধী এই ব্যবসায়ী গ্রুপকে এখন বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জ্বালানি খাতে মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যে নতুন নীতিমালার খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ, যার মাধ্যমে বসুন্ধরা গ্রুপকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার পথ তৈরি হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেল আমদানির একক এখতিয়ার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)। আর আমদানি করা জ্বালানি তেল বিতরণ করে বিপিসির অধীন তিনটি প্রতিষ্ঠান—পদ্মা অয়েল, যমুনা অয়েল ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম। তবে বিপিসির এই একক এখতিয়ার এখন খর্ব হতে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে ৬ আগস্ট জারি করা এক চিঠিতে ১০ আগস্টের মধ্যে বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানির নীতিমালার খসড়া জ্বালানি বিভাগে পাঠাতে বলা হয়েছে।
এর আগে গত ২৪ মে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান সায়েম সোবহান আনভীর স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, বিক্রি ও বিপণনের অনুমতি চাওয়া হয়।
তবে সরকারের এমন উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছে জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন গুরুত্বপূর্ণ এই খাত ধীরে ধীরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, অভিযোগ রয়েছে, এসব ঝুঁকি ও আপত্তি আমলে না নিয়েই জ্বালানি বিভাগ তড়িঘড়ি করে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
তড়িঘড়ি নীতিমালার বিরোধিতা, সরিয়ে দেওয়া হলো বিপিসি চেয়ারম্যানকে?
তড়িঘড়ি করে নতুন নীতিমালার খসড়া প্রণয়নের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান—এমন অভিযোগ রয়েছে। এরপর তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
তাহলে কি নির্দিষ্ট একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অবস্থানকেও পাশ কাটানো হচ্ছে?
বসুন্ধরাকে এমন সুবিধা দেওয়ার অভিযোগের বিরুদ্ধে বিএনপিপন্থী লেখক, বুদ্ধিজীবী ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের একটি অংশও স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। তাদের প্রশ্ন—যে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে নানা সুবিধা পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের সঙ্গে নতুন সরকারের এত ঘনিষ্ঠতা কেন?
বসুন্ধরা আর এস আলাম প্রীতি—এতে দলের কী লাভ?
বিএনপিপন্থী লেখক ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ফাহাম আবদুস সালাম তার ফেসবুক পোস্টে এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন—
“ক্ষমতায় আসলে বিএনপির এক পলিটিকাল অ্যামনেশিয়া হয়ে যায়। তারা মনে করে যে উন্নয়নই (আর অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) রাজনীতি। আমি বুঝে পাই না, আপনার দলের তিন-চারজন নেতার এই যে এত বসুন্ধরা আর এস আলাম প্রীতি—এতে আপনাদের দলের কী লাভ? কোন আক্কেলে আপনারা এদেরকে নরমালাইজ করতেছেন?
আপনাদের কি হুঁশ আছে যে হাসিনার এই ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাকারদের বিএনপির নেতাকর্মীরা কী মনে করে? কয়েকজন নেতা মালপানি কামাইতে পারে—কিন্তু আপনারা নিজের পার্টিম্যানদের সামনে কেমনে মুখ দেখাবেন? পার্টির পলিটিক্সটা তো ঠিক রাখতে হবে।
প্রতিটা জায়গায় এরা আপনাদের বিপদে ফেলবে। বড়লোকের একটা ছ্যাঁচড়া, ক্লাসলেস ওয়ানাবি প্লেবয়কে স্পেস দিতে গিয়ে আপনার নিজের দলের রাজনীতি যে খোয়ায় ফেলতেছেন—এই হুঁশ কি আপনাদের আছে?
বসুন্ধরা, এস আলম জাস্ট আপনাদের তিন-চারজন নেতার ভালো করবে। আর পুরো পার্টির রাজনীতি করবে কম্প্রোমাইজ। দেশের প্রয়োজনে এদেরকে টলারেট করতে হবে—ঠিক আছে; কিন্তু এত পিরিতি কেন? মেরিটোক্রেসির ওপর আস্থা রাখেন। এই দেশের নতুন জেনারেশনের লেজিট ব্যবসায়ী আসবে, যারা এইসব বাটপার আর ভূমিদস্যুদের থেকে তিনগুণ বড় ব্যবসায়ী হবে। একটু সবর করেন।
একটা কথা বলি ভাই আপনাদের! যখন বিএনপির কথা ভাববেন—যেই চেহারাটা সামনে ভাসাবেন, সেইটা যেন পাটক্ষেতে, ধানক্ষেতে ঘুমানো যুবদল কর্মীটা হয়। আমার তাই ভাসে।
ছাত্রদলের সেই ছেলে, যার জীবন জেলে পচছে, বাপের মৃত্যুশয্যায় পার্টিসিপেট করতে পারে নাই, কিন্তু হাসিনার এগেন্সটে দাঁড়ায় গেছে। ছাত্রদলের সেই মামলা খাওয়া ছেলেটা আমার ভাই। দুর্দিনে সেই ছেলেটারেই পাবেন—ট্রাই-স্টেট এলাকার বড়লোকরা আসবে না ভাই। তারা ১৫ বছর কী করছে—আমি দেখছি।
শুধু নিজেরে জিজ্ঞেশ করবেন—ঐ মামলা খাওয়া, পার্টির জন্য জীবন নষ্ট করা ছেলেটারে কেমনে মুখ দেখাবেন?
এস আলম, বসুন্ধরার মতো বাটপার আর হাসিনার দালালদের আপনারা যে নরমালাইজ করতেছেন—আপনারা ছাত্রদল, যুবদল, বিএনপির অগণিত নেতাকর্মীর ত্যাগরে পানিতে ফালায় দিতেছেন।”
ওয়াদার রিপোর্ট
লন্ডনভিত্তিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদক এবং বিএনপি ঘরানার লেখক জুলকারনাইন সায়ের দৈনিক ওয়াদায় প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিএনপি সরকারের আমলে বসুন্ধরা গ্রুপকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। প্রতিবেদনে তিনি এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন সরকারি নথি এবং বসুন্ধরা গ্রুপের করা আবেদনের লিখিত প্রমাণপত্র উপস্থাপন করেছেন।
ওয়াদার প্রতিবেদটিতে বলা হয়: “সরকারি নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, বসুন্ধরা গ্রুপের জ্বালানি ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রস্তাবটি অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। গত ২৪ মে বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান সায়েম সোবহান আনভীর সরকারের কাছে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিক্রি ও বিপণনের অনুমতি চান। প্রস্তাবে বছরে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টন ডিজেল, ২ লাখ টন অকটেন, দেড় লাখ টন পেট্রোল এবং ১০ লাখ টন পর্যন্ত ফার্নেস অয়েল আমদানির সক্ষমতার কথা বলা হয়। ২ জুলাই জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ আবেদনটি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে পাঠায়।
এরপর মাত্র ১২ দিনের মধ্যে, ১৪ জুলাই বিপিসি ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কমিটিকে শুধু বসুন্ধরার সক্ষমতা নয়; প্রস্তাবটির আইনগত প্রভাব, বিপুল আমদানি, রাষ্ট্রীয় তিন বিপণন কোম্পানির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব, সরকারি রাজস্ব, সংরক্ষণ ও বিতরণ সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাজারে প্রতিযোগিতা—সবকিছু পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হলেও সুপারিশ দিতে সময় দেওয়া হয় মাত্র দুই কার্যদিবস।
এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ২৬ জুলাই রাতে তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। তার অপসারণের সঙ্গে বসুন্ধরার প্রস্তাবের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনো সরকারি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের সুযোগ এবং সম্ভাব্য সরবরাহকারীদের তালিকা নিয়ে তিনি চাপের মুখে ছিলেন।
২ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জিয়াউল হককে বিপিসির অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মাত্র চার দিন পর বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য ‘Private-Sector Refined Fuel Import, Storage, Transportation, Distribution and Marketing Policy 2026’-এর খসড়া তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয় এবং সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় ১০ আগস্ট। অর্থাৎ দেশের অন্যতম কৌশলগত ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বাজারের কাঠামো পরিবর্তনের জন্য বিপিসিকে কার্যত মাত্র কয়েক দিন সময় দেওয়া হয়েছে।
বসুন্ধরার এই উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। প্রায় এক দশক ধরে প্রতিষ্ঠানটি দেশের জ্বালানি বাজারে বড় পরিসরে প্রবেশের চেষ্টা করে আসছে। ২০১৭ সালেই তারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জ্বালানি বিক্রির অনুমতি চেয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৩ সালে বেসরকারি খাতে আমদানি করা অপরিশোধিত তেল পরিশোধন ও বাজারজাতকরণের যে কাঠামো তৈরি হয়, সেটিও বসুন্ধরার প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল—এমন দাবি করেছেন সাবেক এক বিপিসি কর্মকর্তা।
২০২৪ সালের জুনে শেখ হাসিনা সরকারের শেষ সময়ে বসুন্ধরাকে অপরিশোধিত তেল আমদানি, পরিশোধন এবং নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎপাদিত জ্বালানি সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রির অনুমতিও দেওয়া হয়েছিল বলে সরকারি নথির বরাতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেই অনুমতিতে ৩৭টি শর্ত ছিল। ফলে বর্তমান প্রস্তাবটি কেবল পুরোনো কোনো আবেদন পুনরুজ্জীবন নয়; বরং পরিশোধিত জ্বালানি সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানি করে সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত জ্বালানি বাজারে বেসরকারি অংশগ্রহণের পরিধি আরও বড় করার উদ্যোগ।
এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে জ্বালানি নিরাপত্তা, বাজার প্রতিযোগিতা এবং একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে কৌশলগত পণ্যের উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বার্ষিক জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টনের কাছাকাছি থাকলেও বসুন্ধরার প্রস্তাবিত সর্বোচ্চ আমদানি পরিমাণ একাই কয়েক মিলিয়ন টনে পৌঁছাতে পারে।
জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে এ উদ্যোগের বিরোধিতা করে বলেছে, এতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন গুরুত্বপূর্ণ খাত ধীরে ধীরে একটি বেসরকারি গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে বসুন্ধরা গ্রুপ ও সোবহান পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঋণ অনিয়ম ও অর্থপাচারের অভিযোগে চলমান বিভিন্ন মামলাও নতুন করে ‘ডিউ ডিলিজেন্স’-এর প্রশ্ন সামনে এনেছে। এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত নয় এবং কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই একই গ্রুপের অন্য কোম্পানিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্য বলা যায় না।
তবে এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বেসরকারি খাতে উন্মুক্ত করার আগে আর্থিক সক্ষমতা, মালিকানা কাঠামো, প্রতিযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং স্বার্থের সংঘাত—সবকিছু কতটা গভীরভাবে যাচাই করা হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
Author